আই এস বা ইসলামিক স্টেট: বিশ্বের কোথায় কোথায় এখনও তৎপর

বলা হচ্ছে, ফিলিপিন্সে সম্প্রতি আইএসের তৎপরতা বেড়েছে। ছবির কপিরাইট EPA
Image caption বলা হচ্ছে, ফিলিপিন্সে সম্প্রতি আইএসের তৎপরতা বেড়েছে।

কয়েক মাস ধরে টানা যুদ্ধ করার পর শেষ পর্যন্ত গতমাসে সিরিয়ার বাঘুজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট।

দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় এই গ্রামটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আইএসের স্বঘোষিত খেলাফতের অবসান ঘটলো বলে বলা হচ্ছে।

চরমপন্থী এই গ্রুপটির জন্যে এটা বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা বিশ্বের আর কোথাও বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাতে সক্ষম নয়।

আইএস এবং তার সহযোগীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও সক্রিয়। অনলাইনে তাদের যেসব মাধ্যম আছে সেখানে তারা প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর দাবি করছে।

বিবিসি মনিটরিং যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সিরিয়া এবং ইরাকের যে বিস্তৃত অঞ্চলে আই এস নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেগুলো হারিয়ে ফেলা পরও গত বছর তারা সারা বিশ্বে ৩,৬৭০টি হামলা চালিয়েছে।

তার মানে গড়ে প্রত্যেক দিনে ১১টি করে হামলা করেছে তারা।

এবছরের প্রথম দুমাসেও আই এস ৫০২টি হামলা করেছে।

আরো পড়তে পারেন:

বাঘুসের পতন দিয়ে আইএসের 'খিলাফতের' অবসান

বিন লাদেনের ছেলে হচ্ছেন আল কায়েদার নতুন নেতা?

শামীমাকে নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে চান তার স্বামী

শেষ ঘাঁটিগুলো ছেড়ে পালাচ্ছে আইএস যোদ্ধারা

দেখা গেছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আই এসের হামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স বা এসডিএফ আই এসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হাজিন ও বাঘুজ পুনর্দখলের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করার পর জঙ্গিদের হামলা বেড়ে গিয়েছিল।

ওই অভিযানে জবাবে জিহাদি গ্রুপটি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাদের হামলা বাড়িয়ে দেয়। বলা হচ্ছে, মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোই ছিল তাদের লক্ষ্য।

তবে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে সিরিয়া ও ইরাকে। আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ফিলিপিন্স, নাইজেরিয়া এবং মিশরেও আই এসের জঙ্গিরা হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আই এসকে পরাজিত করার যে ঘোষণা দিয়েছেন তাকে আই এসের নেতারা ব্যঙ্গ করে বলেছে, তাদের সেই স্বপ্ন এখনও বহু দূরে।

ইরাকের মসুল এবং সিরিয়ার রাকা ইসলামিক স্টেটের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর তাদের খেলাফতের মডেল ২০১৭ সালের শেষের দিকে শেষ হয়ে যায়।

ইসলামিক স্টেট যেসব দেশ ও এলাকায় সক্রিয় আছে বলে ঘোষণা করেছে সেগুলো হচ্ছে: ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, খোরাসান (আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চল), ককেশাস, পূর্ব এশিয়া (মূলত ফিলিপিন্সে), সোমালিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকা ( মূলত নাইজেরিয়া)।

গ্রুপটি সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে যে তিউনিসিয়াতে তারা তাদের তৎপরতা জোরদার করতে যাচ্ছে।

এর আগে ২০১৫ সালে তারা একটি যাদুঘর ও সমুদ্র সৈকতে হামলা চালানোর কৃতিত্ব দাবী করেছিল। কিন্তু এরপরে তারা সেখানে আর তেমন কিছু করতে পারেনি।

এছাড়াও আই এস এই প্রথম বুরকিনা ফাসোতে তাদের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছে।

এই দুটো ঘোষণা থেকে একটা জিনিস প্রমাণ হয়- আই এসের যে বিশেষ শ্লোগান "থাকা ও বিস্তৃত করা" এই নীতিতে তারা এখনও অটল।

তবে আইএসের জন্যে এখনও সবচেয়ে বড় রণক্ষেত্র হচ্ছে সিরিয়া ও ইরাক।

আইএস গত বছর সারা বিশ্বে যে ৩,৬৭০টি হামলা চালানোর দাবি করেছে, তার ৪৮% (১,৭৬৭টি) হামলা হয়েছে ইরাকে এবং ৩১% হামলা হয়েছে (১,১২৪টি) সিরিয়াতে।

তবে গত বছর আইএসের বিভিন্ন শাখার তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাক ও সিরিয়াতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার পর তারা যেন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এর মাধ্যমে তারা লোকজনকে এটাও জানাতে চাইছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তারা তৎপর রয়েছে।

আইএস ২০১৮ সালে আফগানিস্তানে ৩১৬, মিশরের সিনাই উপদ্বীপে ১৮১, সোমালিয়ায় ৭৩, নাইজেরিয়ায় ৪৪, ইয়েমেনে ৪১, এবং ফিলিপিন্সে ২৭টি হামলা চালিয়েছে।

এবছরেরই প্রথম তিনমাসে আইএস নাইজেরিয়াতে ৪৪টি হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। এই হামলার সংখ্যা গত বছরে চালানো হামলার প্রায় সমান।

ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স থেকে আইএস গত জানুয়ারি মাসে একটা প্রচারণা ভিডিওতে মুসলমানদেরকে সেখানে গিয়ে তাদের সাথে যোগ দেওয়ার আহবান জানিয়েছে।

এমনকি তারা বিদেশি যোদ্ধাদেরকে রিক্রুট করারও ইঙ্গিত দিয়েছে।

গত মাসে ওয়েস্ট আফ্রিকান প্রভিন্সের আইএস প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছে যে বুরকিনা ফাসোতেও তাদের উপস্থিতি আছে।

ইসলামিক স্টেটের প্রতিদ্বন্দ্বী আল কায়দা এর আগেই দেশটিতে বেশ কয়েকটি হামলা চালানোর কথা দাবি করেছে।

ফিলিপিন্সেও হামলার সংখ্যা বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আইএস সেখানে স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে তারা ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গত কয়েক দশক ধরে তারা যুদ্ধ করে আসছে। তবে তাদের বেশিরভাগ হামলাই ছিল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, এবং বিচ্ছিন্ন।

এর আগের বছর আইএস যুক্তরাজ্যে চারটি, স্পেনের বার্সেলোনায়, যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে হামলা চালানোর কথা দাবি করেছে।

কিন্তু এসবের পক্ষে আইএস কোন তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেনি।

২০১৮ সালে আইএস পশ্চিমা দেশগুলোতে সাতটি হামলা চালানোর কথা দাবি করে। তার মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সে ছুরি হামলা। এছাড়াও তারা বেলজিয়াম, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতেও হামলা চালানোর কথা দাবি করেছে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
যে কোন সময় 'ফিরে আসতে পারে' আইএস

আরো পড়তে পারেন:

ক্রাইস্টচার্চ হামলাকারীর মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা

জলবায়ু পরিবর্তন: বলি হচ্ছে দুই কোটি বাংলাদেশী শিশু

বিমানটি পড়ে যাওয়া থামাতে পারেননি পাইলটরা