পুলিশের সাথে 'বন্দুকযুদ্ধে' ৩ রোহিঙ্গা নিহত

রোহিঙ্গা শিশু। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption রোহিঙ্গা শিশু।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে পুলিশের সাথে কথিত 'বন্দুকযুদ্ধে' একটি অপহরণ মামলায় গ্রেফতার থাকা তিনজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে বলে বলছে স্থানীয় পুলিশ।

একটি শিশু অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে গ্রেফতার ছিলেন ঐ তিনজন রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে গ্রেফতারকৃতদের সাথে পুলিশের কথিত 'বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে' নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সাথে এমন বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা বিরল।

শনিবার ভোরে টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় মুছনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাছে পাহাড়ে গ্রেফতারকৃত ঐ রোহিঙ্গাদের 'সহযোগীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধ' হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন।

তিনি বলছেন, "নিহত এই রোহিঙ্গারা ঐ এলাকায় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল। তাদের কাজ ছিল অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি করে পাহাড়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকা।"

মি. হোসেন বলছেন, "তারা সম্প্রতি একটি শিশুকে অপহরণ করে তার বাবার কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে টাকা পয়সা নিয়েছে। শিশুটিও রোহিঙ্গা পরিবারের। এরপর তারা শিশুটিকে ছেড়ে দিয়েছে। আমরা পরে এটা জানতে পেরে তাদের মধ্যে থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করি। গ্রেফতার করার পর তাদের সহযোগীরা ঐ শিশুটি খেলতে বের হলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।"

তিন থেকে সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশুটির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি চার-পাঁচদিন আগে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

তিনি বলছেন, নিহতরা টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা। তারা অনেক আগেই বাংলাদেশে এসেছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption এসব ক্যাম্পে বাস করেন সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।

পুলিশ বলছে, রোহিঙ্গারা নানা ধরনের অপরাধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।

ক্যাম্পগুলোতে নানা ঘটনা নিয়ে মাসে অন্তত ১৫টি করে মামলা হয়। রোহিঙ্গা শিবিরে বাজারের দখল, নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মাঝে মাঝে সংঘর্ষের এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটছে বলে জানাচ্ছেন পুলিশ সুপার মি. হোসেন।

তিনি বলছেন, "আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হল শিবিরগুলো চারিদিকে কোন দেয়াল নেই। চারদিকে পাহাড়। রোহিঙ্গাদের ভিতরে যারা অপরাধ-প্রবণ তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে পাহাড়ে চলে যায়। সহজে বর্ডারও ক্রস করে চলে যায়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।"

তবে তিনি বলছেন, এসব ঘটনা যে খুব বেশি ঘটছে তা নয়। তিনি মনে করেন এতে উদ্বেগের কিছু নেই।

রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে এসব অভিযোগ নিয়ে ক্যাম্পে নেতৃস্থানীয় কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা ভয়ে কথা বলতে চাননি। কিন্তু তারা স্বীকার করছেন রোহিঙ্গাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাড়ছে।

পুলিশ বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারে আলাদা করে ৯৫০ জনের মতো পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেয়া রয়েছে।

শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের সাথে সম্পৃক্ত মামলা তদন্ত করতে সম্প্রতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে দশজন পুলিশকে।

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য কোন আইন প্রযোজ্য

রোহিঙ্গা সংকট: 'কিছু বললে দা-বটি নিয়ে তেড়ে আসে'

রোহিঙ্গা সংকট: কূটনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সাড়ে এগারো লাখের মতো রোহিঙ্গার বসবাস। যাদের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি এসেছেন ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর হাতে খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে। বাকিরা এর আগে নানা সময়ে আসা রোহিঙ্গা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption রোহিঙ্গা এই শিশুদের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ।

প্রথম ১৯৭০ এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আসা শুরু করেন। ৯০ এর দশকেও একবার বড় সংখ্যায় রোহিঙ্গারা এসেছিলেন। এরপর সবসময় ছোট ছোট সংখ্যায় রোহিঙ্গারা এসে তাদের স্বজনদের সাথে যোগ দিয়েছেন।

এখনও দুই একজন করে রোহিঙ্গা আসেন বলে কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছে।

আগে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে থাকেন।

নানা সময়ে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হলেও মিয়ানমারের দিক থেকে এই ব্যাপারে অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। তাই রোহিঙ্গারা আদৌ কবে ফিরে যেতে পারবেন সেনিয়ে আশংকা রয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে এরকম সংগঠন কোস্ট ট্রাস্ট-এর নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম বলছেন, শিক্ষা-কর্মসংস্থান-ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত একটি জনগোষ্ঠী নিয়ে তারা আগে থেকেই নানা ধরনের আশংকা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যারা একসময় তাদের খুব সহানুভূতির সাথে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তারাও ধীরে ধীরে সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছেন বলে বিবিসি সরেজমিনে দেখতে পেয়েছে।

মি করিম বলছেন, "খুব ছোট্ট একটা জায়গায় তারা গাদাগাদি করে থাকেন। দশকের পর দশক ধরে তাদের সাথে শিক্ষার কোন যোগাযোগ নেই। এদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ তরুণ বয়সী।"

"এদেরকে যদি আমরা কোন ধরনের কাজ দিতে না পারি, ভবিষ্যৎ দেখাতে না পারি এবং শুধু চালডাল আর সামান্য একটু আশ্রয় দিয়ে অন্য কোন কিছুর সুযোগ যদি তৈরি না করি তাহলে তারা হতাশ হবে এবং যেকোনো ধরনের খারাপ কাজে জড়িত হয়ে যেতে পারে।"

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
রোহিঙ্গা: কামরুর আর কখনো বাড়ি ফেরা হবে?

আরো পড়তে পারেন:

যে পোস্টারটি পাকিস্তানে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে

'চিনির কোমল পানীয় ডেকে আনতে পারে আগাম মৃত্যু'

বিশ্বের কোথায় কোথায় এখনও তৎপর ইসলামিক স্টেট