বিদ্যুৎ থেকে বাসা বাড়িতে আগুন লাগছে কেন?

চকবাজারের আগুনের ছবি ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption চকবাজারের আগুনের ছবি

ঢাকার বাসাবোর শওকত আরা ও তার পরিবার ১৯৯৫ সালে প্রথম নিজেদের বাড়ি করেন। এরপর সাথেই পাঁচতলা একটি ভবনও নির্মাণ করেছেন।

তারা বলছিলেন, "নতুন ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা আমরা পুরনোটার সাথেই করতে চেয়েছিলাম কিন্তু ইঞ্জিনিয়াররা না বলেছেন, কারণ লোড নিতে পারবে না।"

শওকত আরা বলছেন, "আমরা কখনো পুরনো বিল্ডিংটার তার বা বিদ্যুতের অন্যান্য বিষয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করি নাই। এতদিন তো কোন সমস্যা আল্লাহর রহমতে হয়নি।"

কিন্তু ইদানীং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো সম্পর্কে খবরে নানা তথ্য বের হচ্ছে। তাতে তিনি ভিন্নভাবে চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন।

ঢাকার বড় মগবাজারে একটি ফ্ল্যাটের মালিক মাফরুহা খানম ও তার স্বামী।

তিনি বলছেন, "আসলে আপনার কথা থেকে আমি এখন বুঝতে পারছি আমি নিজে ওভাবে ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে কিভাবে অগ্নিকাণ্ড হয় সেসব নিয়ে খুব একটা জানিনা বা গুরুত্বও দেই না। কারেন্টের তার তো আছে কিন্তু তা থেকে যে আগুন লাগতে পারে সেটি ওইভাবে মাথায় কাজ করে না। শর্ট সার্কিট সম্পর্কে শুনেছি শুধু।"

কিন্তু তিনি বারান্দায় গিয়ে দেখালেন রাস্তার খুঁটি থেকে বিদ্যুতের তার বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন ভবনের দিকে কিভাবে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে গেছে।

তার বাড়িতে প্রবেশের পথ এতটাই সরু যে সেখানে দমকল বাহিনীর কোন গাড়ি পৌঁছাতে পারবে না। তার ভবনের অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে তিনি কতদূর পৌঁছাতে পারবেন সেনিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন তিনি।

বনানীর আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি হওয়ার যে কারণ

আবাসিক ভবনে অগ্নি নিরাপত্তায় যা ভুলবেন না

ছবিতে পুরনো ঢাকার চকবাজারের আগুন

ছবির কপিরাইট আবু সুফিয়ান জুয়েল
Image caption ওভারলোডিং, শর্ট সার্কিট ও আর্কিং থেকে বাসা বাড়িতে বেশি আগুন লাগে,বলছে ফায়ার সার্ভিস

কিভাবে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটে

বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে ২০১৮ সালে সারা দেশে ১৭ হাজারের মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই সাড়ে চার হাজারের মতো অগ্নিকাণ্ড হয়েছে।

দমকল বাহিনী আরও বলছে শহরে অগ্নি দুর্ঘটনার ৭৫ শতাংশই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় নানা সমস্যার কারণে হয়ে থাকে।

কিন্তু কি কারণে এমনটা ঘটছে?

ওভারলোডিং, শর্টসার্কিট ও আর্কিং।

এই তিনটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে জানালেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অপারেশন্স ও মেইনটেন্যান্স বিষয়ক পরিচালক মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ।

তিনি বলছেন, "বেশির ভাগ মানুষ টাকা বাঁচানোর চিন্তা করে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বা ব্যবসায়িক বিষয় যাদের মাথায় বেশি থাকে, তারা টাকা বাঁচাতে গিয়ে কম দামি জিনিসপত্র কেনে। কিন্তু বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত তার, সকেট, সার্কিট ব্রেকার এসব কিছুই সস্তা কথাটা মাথায় রেখে কেনা উচিৎ না। এটা হতে হবে বাজারের এক নম্বর।"

অগ্নি দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেন বুয়েটের অধ্যাপক মাকসুদ হেলালি।

তিনি বলছেন, "বেশির ভাগ ভবন যখন তৈরি হয় প্রথম পর্যায়ে তারা এক ধরনের লোড ক্যালকুলেটর করে। তখন সব কিছু ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু আস্তে আস্তে সেই ভবন যারা ভাড়া নেন তারা নতুন অনেক অ্যাপ্লায়ান্স লাগাতে থাকেন।''

''যেমন একটা অফিস বিল্ডিং এ একটার পর একটা এসি লাগানো হয়। তখন যে ব্যবস্থা তারা শুরুতে লাগিয়েছিল সেটি তার লোড টানার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ছোট খাট পরিবর্তন হলেও প্রধান ডিস্ট্রিবিউশন লাইন পরিবর্তন করে না প্রায় কেউই। এতে তারগুলো গরম হতে থাকে, ডিস্ট্রিবিউশন বক্সে স্পার্ক করতে পারে। বেশি লোড তৈরি করা অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ"

মেজর নেওয়াজ আরও কয়েকটি কারণের মধ্যে উল্লেখ করলেন 'আর্কিং' বলে একটি বিষয়।

তিনি বলছেন, এটি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থেকে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ। বিদ্যুতের তারের সাথে কোনভাবে আর্দ্রতা বা স্যাঁতসেঁতে অবস্থার সংযোগ হলে এটি ঘটে। অনেকদিন ধরে রোদে বৃষ্টিতে থাকা ক্ষয় হয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারে প্রায়ই এটি ঘটে থাকে। এর ফলে যে বিস্ফোরণ হয় তা অত্যন্ত উচ্চ তাপ সম্পন্ন। এতে আশপাশের অনেক কিছুতে আগুন ধরে যেতে পারে।

তিনি আরও বলছেন, কোন বিদ্যুৎ বিষয়ক প্রকৌশলীদের কাছে না যাওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে বাংলাদেশে। লাইসেন্স নেই কিন্তু অন্য কারো কাছে প্রশিক্ষণ নেয়া বিদ্যুতের মিস্ত্রিকে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করানোর ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছেন তিনি।

বাড়ি থেকে বের হলে বা এমনকি এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে গেলেও বিভিন্ন টেলিভিশন, ফ্যান বা কম্পিউটারের মতো যন্ত্রপাতি বন্ধ করে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন মেজর নেওয়াজ।

Image caption অনেক বাড়ির সাথে এভাবে জড়িয়ে থাকে বিদ্যুত সংযোগের তার

ঠেকাতে কী করনীয়

বড় ব্যবসায়িক ভবনে ফায়ার স্টপার লাগানো যেতে পারে। সকল ভবন বা বাসাবাড়িতে একটা ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন মেজর নেওয়াজ।

"নিয়মিত সেটির মেয়াদ পরীক্ষা করা উচিত। বিদ্যুৎ বিষয়ক অগ্নিকাণ্ডের জন্য কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে তৈরি ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যাবহার করতে বলছেন তিনি। কিন্তু সেটি ব্যবহারের আগে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করে নিতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে সময়মত খবর দিতে হবে। কোন বাড়তি তার জোড়া লাগিয়ে কোন কিছুর সংযোগ প্রদান থেকে বিরত থাকা উচিত। মাল্টি প্লাগ দিয়ে অনেক যন্ত্র না চালানোই উচিৎ"।

মাল্টি-প্লাগ অস্থায়ীভাবেই ব্যবহার করা উচিৎ। কোনকিছু যন্ত্র চালানোর স্থায়ী সংযোগ এটি হওয়া উচিত নয়। এগুলোর ক্ষমতা এর গায়েই লেখা থাকে। সেটি মেনে চলা উচিৎ।

প্রতি ছয় মাস অন্তর বাড়ির তার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। বাড়িতে কিছুটা প্রশিক্ষণ থাকা জরুরী।

শাকিল নেওয়াজ বলছেন, "আগুন কিন্তু শুরুতেই বড় হয়না। ছোট থাকতেই সেটি যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটিই সবচাইতে উত্তম পন্থা। অনেকেই আগুন দেখেই বের হয়ে যান। এমনকি ফায়ার সার্ভিসকেও খবর দেন না। তাই আগুন বড় হয়ে যায়।"

আর শুরুতেই যেগুলো উল্লেখ করা হচ্ছিলো সেই মোতাবেক মান সম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করা, ভবনে যতটুকু ব্যবস্থা তার বাইরে বাড়তি চাপ না দেয়া এবং প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ব্যবহার করা। এসব মেনে চললে অনেকটাই বিপদ মুক্ত থাকা যায়।

সম্পর্কিত বিষয়