অভিবাসনের গোপন মাশুল: শিশুদের একটা গোটা প্রজন্ম বড় হচ্ছে বাবা-মা ছাড়াই

শিল্পীর আঁকা: শিশুদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন বাবা এবং মা

গত বছর বসন্তকালে কানিবেক এবং তার স্ত্রী নুরসুলু উত্তর কিরঘিজস্তানে তাদের গ্রাম গ্রিগোরিয়েফকা ছেড়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন কাজের খোঁজে। তাদের পরিকল্পনাটা ছিল সাদামাটা: সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করা এবং গ্রামে তাদের বাড়ির নির্মাণকাজটা শেষ করা। তাদের চার সন্তানের বয়স ছিল চার, পাঁচ, আট এবং এগারো। বাচ্চাদের তারা রেখে যান তাদের ৫৪ বছর বয়সী দাদীর কাছে।

এটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। কিরঘিজস্তানে প্রতি আটজনের মধ্যে একজন দেশের বাইরে থাকেন কাজের সুবাদে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জিডিপির (বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির) এক তৃতীয়াংশই আসে এইসব অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটান্স থেকে। এ হিসেব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।

ধারণা করা হচ্ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে অর্থের এই প্রবাহ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে রেমিটান্সের পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।

কিন্তু অভিবাসীদের উপার্জনের এই বিশাল অঙ্কের একটা চড়া মাশুল দিচ্ছে শিশুরা। একটা গোটা প্রজন্মের শিশুরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় হয়ে উঠছে আত্মীয়দের তত্ত্বাবধানে এবং প্রায়শই অবহেলা, বঞ্চনা এবং অনেক সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে।

''একমাত্র পথ''

কানিবেক আর নুরসুলু মস্কোতে পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন। তারা একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন যেখানে খাট গুটিয়ে রাখতে হতো এত ছোট ছিল সেই বাসা। আয়ের যেটুকু তারা বাঁচাতে পারতেন তা দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে ঘটে গেল একটা দুর্ঘটনা।

তাদের আট বছরের মেয়ে মেদিনা পড়ে গিয়ে মারা গেল। এবং সন্তানের শেষকৃত্যের জন্য ওই দম্পতিকে দেশ ফিরে যেতে হল। তারা এর জন্য দাদীকে দায়ী করেননি। তবে তারা কাছে থাকলে হয়ত আরও দ্রুত মেয়ের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারতেন। তারা নিজেদের এই বলে সান্ত্বনা দিলেন যে দুর্ঘটনা যে কারো জীবনে যে কোন সময়ে ঘটতে পারে।

মেয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে তারা ফিরে গেলেন মস্কোয়। মায়ের মন ভেঙে গেল। কিন্তু তাদের আর অন্য কোন উপায় ছিল না।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

'সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে'

মধ্যপ্রাচ্যের পথে নেপালে গ্রেফতার ৩৮ বাংলাদেশি

সৌদিতে নারী শ্রমিক নির্যাতনের কেন সুরাহা নেই?

মেদিনার মৃত্যু গত বছর কিরঘিজস্তানে এধরনের যত ঘটনা ঘটেছে তার একটি। পরপর বেশ অনেকগুলো এরকম ঘটনা ঘটেছে সেখানে। যেমন দেশের উত্তরে দুবছরেরএক শিশুকে তার চাচী পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল কারণ সে প্রস্রাব করে নিজেকে ভিজিয়ে ফেলত। নারিন নামে দেশের মধ্যাঞ্চলে এক এলাকায় চার বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। একইসঙ্গে খুন করা হয়েছিল তার সাত বছরের ভাই এবং তাদের দাদীকে।

একথা সত্যি যে নির্যাতন, সহিংসতা আর দুর্ঘটনার শিকার শুধু অভিবাসী পরিবারের সদস্যরাই হয় না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাবামার অনুপস্থিতি শিশুদের অবস্থা অনেক বেশি নাজুক করে তোলে।

সমাজবিজ্ঞানী গুলনারা ইব্রাইভা বলছেন কাজের সন্ধানে বিদেশ যাওয়াটা যে পরিবারের জন্য একটা নেতিবাচক বিষয় এমনটা নয়। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে অভিবাসী কর্মী হয়ে যারা বিদেশে কাজ করতে যান, সেইসব দেশ অভিবাসীরা ছেলেপুলে সঙ্গে নিয়ে যাক সেটা চায় না। ''এমনকী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী ও স্ত্রীকে আলাদা থাকতে হচ্ছে। অন্যান্য অভিবাসী শ্রমিকদের সাথে, কর্মস্থলের কাছাকাছি। ফলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যেও দেখা-সাক্ষাতের সুযোগও খুবই কম থাকে,'' বলছেন ইব্রাইভা।

''উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন"

ঝাযগুল মাদাগাজিমোভের বয়স এখন ২৯। তার মা কাজ করতে রাশিয়া চলে যান যখন তার বয়স ১৩। কিরঘিজস্তানের অভিবাসী কর্মীদের প্রায় ৪৫ শাতংশই নারী।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওম বলছে নারী অভিবাসী কর্মীরা নির্যাতন সহিংসতার শিকার হন বেশি এবং সামাজিকভাবে তাদের একঘরে হয়ে পড়ার প্রবণতা পুরুষ কর্মীদের তুলনায় বেশি। এটা যে শুধু তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে ঘটে তাই নয়, তাদের পরিবার ও সন্তানদের ক্ষেত্রেও এটা বেশি ঘটে থাকে। মা চলে যাবার পর ঝাযগুলের ওপর ঘরের সব কাজকর্মের দায়িত্ব এসে পড়ে।

তিন বছর পর, তার বাবাও চলে যায় দেশের বাইরে। এর বছর দশেক পর তারা ফিরে আসেন। তারা বিদেশে যে রোজগার করেছিলেন তা দিয়ে তারা ঋন শোধ করেন, তাদের বাড়ি তৈরি করেন এবং ওই অর্থ দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করান। তাদের গল্পটা সাফল্যের হলেও তারা সন্তানদের বেড়ে ওঠার মুহূর্তগুলো হারিয়েছেন যা আর ফিরে পাওয়া যায় না।

ঝাযগুল তার বাপমাকে দোষারোপ করেন না। সে জানে তাদের আর কোন উপায় ছিল না। ওটাই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। ''সব অভিবাসীই 'উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন' দেখে- তারা স্বপ্ন দেখে নিজেদের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, বিয়ে হবে, সন্তান হবে। ধূমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান হবে, সন্তানদের ভাল স্কুলে পড়াবে,'' বলছেন তিনি। ''কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হতে বেশিরভাগ সময়ই গড়িয়ে যায় বছরের পর বছর, যখন লক্ষ্য অর্জন হয় তখন তারা দেখে সন্তানরা শৈশব, কৈশোর পার হয়ে প্রাপ্ত বয়সে পৌঁছে গেছে। হারিয়ে যায় জীবনের অমূল্য বছরগুলো।''

র্শীর্ষ রেমিটান্স আয়ের দেশ

মার্কিন ডলার বিলিয়নে, ২০১৮

উচ্চ আয়ের যেসব দেশে রেমিটান্স জিডিপির নগণ্য অংশ সেসব দেশ তালিকার অন্তর্ভূক্ত নয়।
সূত্র: আইএমএফ; বিশ্ব উন্নয়ন সূচক; বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব

শীর্ষ রেমিটান্স আয়ের দেশ

জিডিপির কত শতাংশ, ২০১৮

সূত্র: আইএমএফ; বিশ্ব উন্নয়ন সূচক; বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব

সম্পর্কিত বিষয়