শ্রীলংকা হামলা: ঢাকায় শোকস্তব্ধ শ্রীলংকানদের প্রশ্ন - 'এটা কি হলো'

  • শাহনাজ পারভীন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ছবির ক্যাপশান,

শ্রীলংকার একটি চার্চে নিহতদের স্মরণে প্রার্থনারত এক নারী

ঢাকায় থাকেন যে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রীলংকান নাগরিক, রোববার তাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে মেসেজের পর মেসেজ আসছিল।

কলম্বোতে ঘটে গেছে নারকীয় হামলা। শ্রীলংকার আরও অনেক শহর সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত। ঘটনার অল্পক্ষণের মধ্যেই খবর আসতে শুরু করলো।

একটি নয়, দুটি নয়, মোট আটটি হামলা। ঘটনার ভয়াবহতা উপলব্ধি করার পর ঢাকায় বসবাসকারী উদ্বিগ্ন শ্রীলংকান নাগরিকেরা অনেকেই সেদিন একত্রিত হয়েছিলেন।

কর্মসূত্রে অনেকদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন সিলভারিন ডি সিলভা।

তিনি বলছিলেন রোববার দিনভর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন তারা।

"আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, খবরটা শোনার পর আমার মাথাটা যেন একেবারে খালি হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু যখন আরও খবর পেতে শুরু করলাম, ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পারলাম, আমাদের বুকটা কষ্টে ভারী হয়ে গিয়েছিলো।"

"নিজেদের অসহায় মনে হচ্ছিলো। এরকম সময়ে আমরা যেটা করেছিলাম, আমরা সবাই একত্রিত হয়ে প্রার্থনা শুরু করেছিলাম।"

আশির দশকের শুরুর দিক থেকে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলেছিল শ্রীলংকায়। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের রক্তাক্ত সমাপ্তির পর অবশেষে দেশটিতে শান্তি ফিরে আসে। মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহালিজ ও সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বী তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল সেই সংঘাত।

ছবির ক্যাপশান,

প্রিয়জনকে কবর দিয়ে স্বজনদের আহাজারি

এই মে মাসেই সেই যুদ্ধ অবসানের দশ বছর পূর্তি হবে।

কিন্তু এবারের এই হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের দিনে মূলত খ্রীষ্টানদেরই টার্গেট করা হয়েছে।

কলম্বোর আদি বাসিন্দা দীপ্ত প্রিয়ান্ত কুমারা সেনারত্নে প্রায় তিরিশ বছর ধরে বাংলাদেশে বাস করছেন। পোশাক খাতে কর্মরত মি. সেনারত্নে দীর্ঘ দিনে খুব ভালো বাংলা রপ্ত করে ফেলেছেন।

তিনি বলছেন, খ্রীষ্টানদের ওপর কেন হামলা করা হল তাতে অবাক হয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন:

মি. সেনারত্নে বলছেন, "আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। অনেক সিরিয়াস অবস্থা ছিল দশ বছর আগে। পরে সমাধান হয়েছে। সবাই খুশিতেই তাদের দিন চালাত। কিন্তু হঠাৎ এটা শোনার পরে আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। এটা কি হল। কে এগুলো করছে, কেন করছে - শুনে খুব অবাক লাগছে।"

শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে রোববারের এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সাথে ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত নামে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত একটি জঙ্গি গোষ্ঠীর জড়িত থাকার কথা ইতিমধ্যেই শোনা গেছে।

২০১৮ সালে সেখানে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে একটি দাঙ্গা হয়েছিলো।

কিন্তু এর বাইরে মুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবেই এতদিন বসবাস করেছেন সবাই।

ছবির ক্যাপশান,

এই হামলা স্তম্ভিত করেছে শ্রীলংকার জনগণকে

এখন এই হামলার পর শ্রীলংকার মুসলিমরা অনেকেই আতঙ্কের পাশাপাশি, তারা লজ্জিত এবং দুঃখিত বলে জানিয়েছেন।

সিলভারিন ডি সিলভা বলছেন, তিনি কারো দিকে আঙুল তুলতে চাননা ।

তিনি বলছেন, "আমরা এই মুহূর্তে কারোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করতে পারি না। আমরা জানি না হামলার উদ্দেশ্য কি। এখন আমাদের কোন ধরনের জল্পনা কল্পনা করা ঠিক হবে না। আমি বলবো সেটা না করে বরং সরকারকে তাদের কাজ করতে দেয়া উচিৎ যাতে তারা দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে করতে পারে। যাতে করে আমরা শান্তিতে শ্রীলংকায় বসবাস করতে পারি।"

কিন্তু শ্রীলংকার সরকার ইতিমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। হামলা সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে এমন ঘটনা ঘটলো - সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

ছবির ক্যাপশান,

সিলভারিন ডি সিলভা: 'সবাই একত্রিত হয়ে প্রার্থনা শুরু করেছিলাম'

নিয়ানাভতী কডিকারাগে'র জন্ম শ্রীলংকার উত্তর পশ্চিমের কুরুনেগালা শহরে। বাংলাদেশে প্রথম এসেছিলেন ১৯৭৮ সালে, আমেরিকান মিশনারি বাবা মায়ের দত্তক সন্তান হিসেবে। এরপর বাংলাদেশেই বিয়ে করেছেন এবং সেই থেকে এখানেই রয়ে গেছেন।

তিনি বলছেন, শ্রীলংকায় কোন স্বজনের খোঁজ তার আর জানা নেই। কিন্তু তবু দেশের এই ভয়াবহ খবরে বিমর্ষ বোধ করছেন তিনি। নিয়ানাভতি কডিকারাগে প্রশ্ন তুলছেন আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি।

তিনি বলছেন, "আমার এরকম ঘটনা কখনো মনে পড়ে না। কেন একটা বিশেষ উৎসবের দিনে খ্রীষ্টানদের টার্গেট করা হয়েছে। আমি যতদূর বুঝেছে, সরকারের কাছে তথ্য দেয়া হয়েছিলো। আমি খুবই অবাক হচ্ছি যে কেনও তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি, এরকম একটি ঘটনা ঠেকাতে তারা কেন কোন প্রস্তুতি নেয়নি।"

এই প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলায় মৃতের সংখ্যা আজও বেড়েছে। অনুষ্ঠিত হয়েছে নিহত অনেকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের আটকের চেষ্টা চলছে। এসব কিছুর মাঝেই শোকে কাতর শ্রীলংকানরা ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলছেন।