তথ্যপ্রযুক্তি ফ্রিল্যান্সিং: বাংলাদেশের নারীরা যেভাবে ঘরে বসেই আয় করতে পারেন

আউটসোর্সিং ছবির কপিরাইট AFP
Image caption স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ থাকায় আউটসোর্সিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তথ্য প্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিং এবং এই পেশায় নারীদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। কারণ এটি একটি স্বাধীন পেশা, যেখানে সময় বেঁধে কাজ করতে হয় না।

তেমনি নিজের সুবিধা মতো ঘরে বসেও আয় করা যায়।

বর্তমানে বিদেশি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা উদাহরণ সৃষ্টি করায় একে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

এই খাতে কেউ তার ক্যারিয়ার শুরু করতে চাইলে কি কি করতে হবে? ফ্রিল্যান্সার জয়ীতা ব্যানার্জি এ নিয়ে বেশ কয়েকটি টিপস দিয়েছেন।

ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে কি কি প্রয়োজন:

এই খাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানে কাজ করার জন্য বড় ধরণের বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই।

ভাল মানের একটি ল্যাপটপ, প্রয়োজন অনুসারে সফটওয়্যার, নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং বৈদেশিক অর্থ লেনদেনের জন্য অ্যাকাউন্ট থাকলেই চলবে।

এছাড়া আউটসোর্সিংয়ে যে বিষয়ে কাজ করতে চান সে বিষয়ে পারদর্শীতা, ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও লেখার দক্ষতা এবং কম্পিউটার চালনার জ্ঞান থাকতে হবে।

আরও পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং: বিকাশে বাধা কোথায়?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে মেয়েরা কেন পিছিয়ে?

পে-প্যাল, স্ক্রি-প্যাল কি আসছে বাংলাদেশে?

নির্বাচনের প্রভাব: ক্ষতি হয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের

ছবির কপিরাইট INDRANIL MUKHERJEE
Image caption যেকোন স্থান থেকেই ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব।

কোন্ কোন বিষয়ে দক্ষ হওয়া প্রয়োজন এবং দক্ষ হতে কোথায় যাবেন?

আউটসোর্সিং-এর কাজগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরির হয়ে থাকে। যেমন - ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, নেটওয়ার্কিং, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং,ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সাপোর্ট, বিজনেস সার্ভিস, ডাটা এন্ট্রি, রাইটিং অ্যান্ড ট্রান্সলেশন, প্রুফ রিডিং ইত্যাদি।

এর মধ্যে আপনি পছন্দ করেন এমন একটি বা একাধিক সেক্টর নির্বাচন করতে হবে, যেটা আন্তর্জাতিক মার্কেট প্লেসে উপস্থাপন করার উপযোগী।

নিজের পছন্দের বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে অনলাইন বা অফলাইন দুইভাবে প্রশিক্ষণ নেয়া যায়।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কয়েকটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

এছাড়া, অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করেও এ বিষয়ে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের সাথে কাজ করলে এবং তাদের কাজের নিয়ম ফলো করলেও দ্রুত উন্নতি করা যায়।

ছবির কপিরাইট Education Images
Image caption দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের সাথে কাজ করলে দ্রুত উন্নতি করা যায়

কোথায় কাজ খুঁজবেন?

আপনার দক্ষতা অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে আছে পছন্দের মার্কেটপ্লেস। বাংলাদেশে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসগুলোর মধ্যে রয়েছে আপওয়ার্ক, ফাইবার, ইল্যান্স, ফ্রিল্যান্সার, পিপল পার আওয়ার ইত্যাদি।

এরপর সাইটের নিয়মানুযায়ী নিজের বিস্তারিত পরিচয় দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে।

সেখানে অবশ্যই আপনার প্রোফাইলটি অনেক সুন্দর করে সাজাতে হবে। আগের কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সেগুলোকে শক্তিশালী শিরোনাম দিয়ে সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখতে হবে।

প্রোফাইল যতো আকর্ষনীয় হবে ভাল কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে।

ওয়েবসাইটের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন, সুযোগ সুবিধা ও কাজের ধরণ ভালো করে পড়ে নেয়ার পর বিড করা শুরু করতে হবে।

প্রথম অবস্থায় কাজ পেতে একটু দেরি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই ধৈর্য সহকারে বিড করে যেতে হবে। তবে প্রথম কয়েকটি কাজ ভালো হলে গ্রাহকরাই আপনাকে খুঁজে বের করবে।

বায়ারের রেটিং উপযুক্ত না হলে, সেইসঙ্গে পেমেন্ট মেথড ভেরিফাইড না হলে, ওই কাজে অ্যাপ্লিকেশন করা ঠিক হবে না।

অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে ঘণ্টাপ্রতি এবং ফিক্সড প্রাইস - এ দু'ধরণের কাজ পাওয়া যায়। ঘণ্টাপ্রতি কাজে পারিশ্রমিকের নিশ্চয়তা থাকে, কিন্তু সব সাইট ফিক্সড প্রাইসে অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না।

সেটা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে নিয়োগকারীর উপর। তাই শুরুতে ঘণ্টা হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দেন ফ্রিল্যান্সাররা।

ছবির কপিরাইট AAMIR QURESHI
Image caption ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অন্তত ২০ লাখ তরুণ-তরুণীকে আউটসোর্সিং খাতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুবিধা:

১. কাজের সময় নির্ধারণের স্বাধীনতা থাকে। কোন প্রাতিষ্ঠানিক বাঁধাধরা নিয়ম নেই। নিজের সুবিধা মতো যখন ইচ্ছা কাজ করা যায়।

২. এটা ভার্চুয়াল অফিস হওয়ায় কাজের স্থান নিজের মতো বেছে নেয়া। সেটা আপনার বেডরুম থেকে শুরু করে গাড়ির ভেতরে বা লাইব্রেরিতেও হতে পারে।

৩. কাজ শুরু করতে কেবল ভাল মানের ল্যাপটপ বা কম্পিউটার, কিছু সফটওয়্যার, নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং বৈদেশিক অর্থ লেনদেনের জন্য অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন।

৪. ব্যবসার ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী হওয়ায় গ্রাহক সংখ্যাও অগণিত, কাজের সুযোগ বেশি। তাই থেমে থাকতে হয় না।

৫. কার সঙ্গে কাজ করবেন আর কার সঙ্গে কাজ করবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা রয়েছে।

৬. আপনার যোগ্যতা এবং দক্ষতার মূল্য স্থানীয় বাজারের চাইতে কয়েকগুণ বেশি হবে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

পুরুষদের পাশাপাশি এখন অনেক নারী আগ্রহী হচ্ছেন এই স্বাধীন পেশার প্রতি। যাদের বেশিরভাগ সফলতা অর্জন করেছেন।

এ কারণে তথ্য প্রযু্ক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিংকে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরণের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারীদের সমিতি, বেসিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ. রহমান।

তিনি মনে করেন বেশিরভাগ নারীর বাইরে কাজ করার ব্যাপারে পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা থাকায় তাদের ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক উদাহারণ সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি জানান।

মিসেস রহমান বলেন, "বাংলাদেশে এককভাবে আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকেই সফলতার সাথে ফ্রিল্যান্সিং করছেন। এটা অনেক বড় কাজের ক্ষেত্র।"

"আমাদের ছেলেমেয়েরা ভাল পারফর্মেন্স দেখাতে পারছে বলেই এই মার্কেটে তারা টিঁকে আছে।"

ছবির কপিরাইট Smith Collection/Gado
Image caption বাংলাদেশে পে পাল না থাকায় অর্থ লেনদেনে সমস্যা পোহাতে হয়।

ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ:

বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের এই সম্ভাবনা শুধুমাত্র ঢাকা ও হাতে গোনা কয়েকটি বড় শহর কেন্দ্রিক বলে মনে করেন ফারহানা রহমান।

তাঁর মতে, ঢাকার বাইরে নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত না হওয়া, বৈদেশিক অর্থ লেনদেনে পেপাল না আসা, সেইসঙ্গে দেশজুড়ে মানসম্মত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় সম্ভাবনাময় এই খাতটিকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

খুব কম সময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় আউটসোর্সিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

তবে সেক্ষেত্রে নিজেকে আন্তজার্তিক বাজার অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং সেই দক্ষতাগুলোকে সঠিক স্থানে বিক্রি করা প্রয়োজন বলে জানান এ খাতের উদ্যোক্তারা।