আধুনিক ভারতের নির্বাচনে কেন আড়াই হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যের আধিপত্য?

একজন ভারতীয় শিল্পী রামের সজ্জায়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

রামায়ণের প্রধান চরিত্র রামকে অনেক হিন্দু ধর্মানুসারী দেখেন 'নায়ক' হিসেবে

ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ২৫০০ বছর আগের হিন্দু পৌরাণিক মহাকাব্য আবারো উঠে এসেছে পাদপ্রদীপের আলোয়। বিগত নির্বাচনের মতই, এবারের নির্বাচনেও হিন্দু ধর্মের বহু কট্টরপন্থীদের কথায় ফিরে এসেছে রামায়ণ এবং বিশেষ করে তার নায়ক রাম-এর প্রসঙ্গ।

রামের জন্মস্থান বলে পরিচিত ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহর অযোধ্যায় দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী রাম মন্দির নির্মাণের কথা আবারো উচ্চকণ্ঠে তোলা হচ্ছে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে।

যে বিষয়টি নিয়ে বহুদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে দেশটির হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে।

১৯৯২ সালে এই স্থানেই ১৬শ শতকে নির্মিত বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলেছিল উগ্র হিন্দুত্ব-বাদীরা। তাদের বিশ্বাস এখানেই ছিল একসময় রাম মন্দির। কোনও এক মুসলিম সম্রাট সেটি ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করেছিল। তাই বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার পর সেখানে রাম মন্দির আবারো প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় তারা।

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি- বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আবারো রামমন্দির পুন:প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এর আগের বারের নির্বাচনের মতো এবারো এতে করে বেশকিছু ভোট তাদের বাড়বে বলে মনে করছে বিজেপি।

আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Heritage Images/Getty

ছবির ক্যাপশান,

রাবণের সাথে রাম তার সর্বশেষ জয়লাভ করা যুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র ছুড়ছেন

১২ই এপ্রিল রাজধানী দিল্লীর কেন্দ্রস্থলে 'রাম লীলা ময়দানে' উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠনের আয়োজনে রামের জন্মদিনে এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

বর্ণিল পোশাক ও খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বহু মানুষ সেখানে 'জয় শ্রী রাম' বলে চিৎকার করে। একই সাথে রাম মন্দির তৈরির স্লোগানও দেয়।

রামায়ণে রাম-এর বীরত্ব এবং ধর্মপরায়ণতা অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর কাছে তাকে আত্মত্যাগ ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

আর সে কারণেই মহাকাব্যটি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং প্রভাব বিস্তার করছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস-এর মতো শক্তিশালী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের নেতৃত্বে এই রাম মন্দির নির্মাণের যে আন্দোলন চলছে, তা কৌশলে ভারতজুড়ে একটি যৌথ হিন্দু পরিচয় প্রকাশে সহায়তা করছে।

১৯৮০ এর দশকে বেশকিছু ঘটনা ঘটেছিল।

প্রথমত, রামায়ণের ঘটনা নিয়ে নির্মিত একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক অন্তত ৮০ মিলিয়ন দর্শকের মাঝে মহাকাব্যটিকে আবারো স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তার নায়কের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।

রামায়ণের বহু কাহিনীর মধ্য থেকে সিরিয়ালটিতে বাছাই করা কিছু অংশ নেয়া হয়েছিল। পুরাণটির বহু সংস্করণের মধ্যে সংস্কৃত কবি বাল্মিকী রচিত অংশকেই ইতিহাসবিদেরা বেশি স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।

কিন্তু প্রায় ২২টি ভাষায় প্রায় ৩ হাজার প্রচলিত গল্পের মধ্যে কোথাও কোথাও রাবণের প্রশংসাও করা হয়েছে, আবার কোথাও বলা হয়েছে রাম-এর ভাই লক্ষণের কাছে পরাজিত হয় দৈত্যরাজ।

কিন্তু সে সময়ে প্রচারিত টিভি সিরিয়ালটিতে একটিমাত্র কাহিনীকেই তুলে ধরা হয়, সেটি দেশটির একটিমাত্র ধর্মকেও তুলে ধরে।

বাল্মিকীর রামায়ণকে সংস্কৃত থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এমন একজন ড. আর্শিয়া সাত্তার বলেন, "সেখানে ভারতকে প্রকাশ করার আরও বহু উপায় ছিল।"

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

আহমেদাবাদে লোকজন রাস্তায় বসে টেলিভিশন সিরিজ রামায়ণ দেখছে

আর দ্বিতীয় ব্যাপার ঘটে আশির দশকের শেষ দিকে এসে, যখন কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন রাজীব গান্ধী।

দলটি সবসময়ে ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত হলেও সেসময় তারা ডানপন্থী দল হিসেবে পরিচিত 'বিশ্ব হিন্দু পরিষদ' (ভিএইচপি)-এর সহায়তায় অযোধ্যায় মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময়ের নির্বাচনে হিন্দু ভোট টানতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

কিন্তু কংগ্রেসের সে পরিকল্পনা কাজে আসেনি, বিপরীতে সে সময়ের অপেক্ষাকৃত নবীন দল বিজেপি সুযোগটি হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে কাজে লাগায়।

১৯৮৯ এর সেপ্টেম্বরে দলটির সভাপতি এল কে আদভানি রামমন্দিরের জন্যে দেশব্যাপী এক পদযাত্রার ডাক দেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্যে পুরো ভারত থেকে ইট নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। এই প্রচারণা সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকে উসকে দিতে সফল হয়েছিল।

ফলাফল বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব হয় আর দেশব্যাপী শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

হিন্দু এই মহাকাব্যে রাম দশ-মাথা বিশিষ্ট দৈত্য রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেন।

সেই সময় থেকেই বিজেপি হয়ে ওঠে ভারতের রাজনীতিতে একটি হেভি-ওয়েট দল। আর তাই বিজেপি'র জন্যে অযোধ্যা ইস্যু ভোট বাড়ানোর একটি উপায় হয়ে ওঠে।

এখন 'বিজয়ী রাম'এর কাহিনীই সবার কাছে সুপরিচিত। অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলোও রামের গুণকীর্তন করে সমাবেশের সুযোগ নেয়। আর মহাকাব্যটির অন্য সংস্করণগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১১ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি ও রামায়ণ বিশেষজ্ঞ এ কে রামানুজানকে বাধ্য করা হয়েছিল মহাকাব্যটির আরও ভিন্ন সংস্করণের বিদ্যমানতা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে একটি প্রবন্ধ লিখতে। এটি করেছিল একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন ও সমমনা কিছু দল।

কিন্তু উগ্রবাদী হিন্দুদের কাছে পৌরাণিক কাহিনীটির অন্য সংস্করণগুলো হারিয়ে যাওয়াটা খুব সাধারণ একটি ক্ষতি।

তারা বিশ্বাস করে, মহাকাব্যটিকে ঘিরে একটি হিন্দুত্ব-বাদের পুনর্জাগরণ ঘটানো যেতে পারে। যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একত্রিত করবে এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

হিন্দু কট্টর জাতীয়তাবাদীরা রামমন্দির নির্মাণের দাবি করে আসছেন।

যেমনটি দেখা গেছে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে, উত্তরাখণ্ডের একজন প্রতিমন্ত্রী ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার খরচের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রামায়ণে বর্ণিত পৌরাণিক ভেষজ ঔষধি 'সঞ্জীবনী' উদ্ভাবন করার জন্যে।

পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয় রাম এবং লক্ষণকে মৃত্যু থেকে ফিরিয়ে এনেছিল এই অন্ধকারে জন্ম নেয়া আশ্চর্য ঔষধি।

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন যে, রামায়ণের সময়ের বিজ্ঞান এতটাই উন্নত ছিল যে, সীতা ছিল প্রকৃত অর্থে টেস্ট-টিউব শিশু। আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দাবি করেছিলেন, রাবণের একটি বিমান ছিল।

ভারতীয় রাজনৈতিক ও পণ্ডিতদের কাছ থেকে এ ধরনের উদাহরণ পৌরাণিক মহাকাব্যটিকে আরও গৌরবান্বিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।