মাঠে পাকা ধান আর শ্রমিক নেই হাওরের কৃষকদের, সংকট মোকাবিলায় অভিনব উদ্যোগ

শ্রমিক সংকটে কৃষকদের ফসলের পেছনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption শ্রমিক সংকটে কৃষকদের ফসলের পেছনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

মাঠের ধান পাকতে শুরু করেছে, আর ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সুনামগঞ্জে সেই সঙ্গে রয়েছে বৃষ্টি শুরু হলে পাহাড়ি ঢল নামার বাড়তি ভয়।

তাই দেশের অনেক স্থানের মতো সুনামগঞ্জে চলছে এখন ফসল কাটার মৌসুম।

কিন্তু প্রায় সর্বত্র একই সময় ধান পেকে যাওয়ায় তারা পড়েছেন শ্রমিক সংকটে। আর এই সংকট সামলাতে নতুন একটি উপায় খুঁজে বের করেছে জেলা প্রশাসন।

সুনামগঞ্জের ধর্মশালার একজন কৃষক মামুনুর রহমান বলছেন, ''একসময় ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা থেকে লোকজন ধান কাটতে আসতো, যাদের স্থানীয়ভাবে বলা হয় 'ভাগালু'।"

"কিন্তু গত প্রায় আট-দশ বছর ধরে তাদের আসা কমে গেছে। এখন ব্রাক্ষণবাড়িয়া বা কাছাকাছি জেলাগুলো থেকে কিছু 'ভাগালু' আসলেও সংখ্যা অনেক কম।''

ফলে ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে শ্রমিক সংকটও।

আরো পড়ুন:

'যেথায় কাজ আছে, সেথাই চলি যাবো'

'চারা গাছের আকৃতি বড় করার নতুন উপায় উদ্ভাবন'

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ধান কাটায় সহায়তা করতে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

মামুনুর রহমান বলছেন, শ্রমিকের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। স্থানীয়ভাবে যে শ্রমিকদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অনেক টাকা মজুরি দিতে হয়, সেই সঙ্গে দুই বেলার খাবার। ফলে কৃষকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, হাওর এলাকায় জমিগুলোয় বছরে একবারই ফসল ওঠে। এই ফসলের ওপরেই তাদের সারা বছর নির্ভর করতে হয়।

কৃষকদের ভয়, বৃষ্টি শুরু হলে হাওরে পানি আসতে শুরু করবে। আবার ধান পাকতে শুরু করলে সময় মতো তুলতে না পারলে মাঠেই ধান ঝড়ে যেতে পারে। তাই সব কৃষক চেষ্টা করছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধান কেটে ঘরে তোলার।

এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামুনুর রহমান।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে অসময়ের বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাধ ভেঙ্গে ফসল কাটার শুরু হওয়ার আগেই হাওরাঞ্চলের বিপুল ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। সে সময় সাতটি জেলা মিলে প্রায় ৯ লাখ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যায়, যার বাজার মূল্য ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ঢাকার বছিলায় 'জঙ্গি আস্তানায়' দুইজন নিহত

মুখমণ্ডল ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করলো শ্রীলংকা

ধর্ষণে অভিযুক্ত কোচিং সেন্টার মালিক 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত

সকালের নাশতা বাদ দিয়ে কি মৃত্যু ডেকে আনছেন?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সুনামগঞ্জের কৃষিজীবী মানুষকে বছরের একটি ফসলের ওপর নির্ভর করতে হয়।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ

ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকট সামলাতে জেলার সব পাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসন।

জেলার বেশ কয়েকটি নদী থেকে পাথর তোলার কাজ করেন এই শ্রমিকরা। পাশাপাশি সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলাতেও পাথর তোলা হয়।

স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শফিউল আলম।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''মাঠে ধান পেকে গেলেও অনেকে শ্রমিক পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর গত সপ্তাহ থেকে আমরা পাথর কোয়ারির [উত্তোলনের] কাজ বন্ধ রাখার জন্য বলেছি, যাতে এখানে কাজ করা শ্রমিকরা ধান কাটার কাজে যেতে পারেন।''

তিনি বলছেন, এতে বেশ কয়েক হাজার শ্রমিক বাড়তি পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সুনামগঞ্জের কৃষকরা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত তারা অর্ধেক ধান কাটতে পেরেছেন।

যন্ত্রের সহায়তা

অনেক স্থানে ধান কাটার জন্য সরকারি ভর্তুকিতে যন্ত্র ব্যবহারের সুবিধা চালু হলেও, সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ স্থানে এখনো তা অপ্রতুল।

কৃষক মামুনুর রহমান বলছেন, ''প্রয়োজনের তুলনায় এরকম যন্ত্রের সংখ্যা অনেক কম। ইউনিয়ন প্রতি একটি করেও নেই। আবার মাঠে প্রায় বেশিরভাগ ধান পাকতে শুরু করায় একটি মেশিন দিয়ে সবার ধান কাটাও সম্ভব নয়।''

স্থানীয় সাংবাদিক খলিল রহমান বলছেন, ''এক সময় আশেপাশের অনেক জেলা থেকে ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকরা সুনামগঞ্জে এলেও সেই প্রবণতা এখন আর নেই।"

"ফলে কৃষকদের স্থানীয় শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু একই সময়ে এতো শ্রমিক পাওয়াও কঠিন। ফলে অনেকে অতিরিক্ত টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছেন না।''

তিনি জানান, আবহাওয়া ভালো থাকায় হাওর এলাকার বেশিরভাগ জমিতেই এবার ভালো ফসল হয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, গড়ে বিঘাপ্রতি ২০মণ ধান পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
বন্যা থেকে বাঁচতে ভাসমান শস্য চাষ হচ্ছে বাংলাদেশে

সম্পর্কিত বিষয়