ধর্মকে আঘাত করলে আইনানুগ ব্যবস্থার হুমকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছবির কপিরাইট Google Map
Image caption জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ধর্মীয় বিষয়ে লেখনী নিয়ে শিক্ষক-ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন লেখা থেকে বিরত থাকতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাইকে আহ্বান করা হয়েছে।

কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে 'বিধি মোতাবেক আইনানুগ ব্যবস্থা' নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোঃ ওহিদুজ্জামান বলছেন, আইনানুগ ব্যবস্থা বলতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনানুগ ব্যবস্থা বুঝিয়েছেন তারা।

"কারও মতামত প্রকাশের জন্য তো আমরা ব্যবস্থা নিতে পারিনা। তবে সেটি যদি আইন লঙ্ঘন করে, যেমন ধরুন আইসিটি অ্যাক্ট আছে সেই অ্যাক্টের আওতায় যদি কেউ পড়ে যায় তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাতে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাধা দেবেনা। বরং সহযোগিতা করবে। এটিই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে বোঝাতো চেয়েছি।"

কিন্তু ধর্ম, রাজনীতি কিংবা এ ধরণের বিষয়ের আলোচনা কিংবা সমালোচনা করে মত প্রকাশ করাকে এভাবে আলাদা করে দেখা হচ্ছে কেনো? কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কেনো সমালোচনা করাকে সহনশীল ভাবে দেখা হবেনা?

এসব প্রশ্নের জবাবে মিস্টার ওহিদুজ্জামান বলেন, "আসলে একটি ছেলের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে নিয়ে কিছুটা ঝামেলা হয়েছিলো। পরে উপাচার্য বললেন এ ধরণের বিজ্ঞপ্তি দিতে। সেজন্য আমরা দিয়েছি।"

"যাতে করে কেউ অন্য কাউকে আঘাত না করে। আমাদের তো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কেউ আইনত দোষী প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।"

বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে

'ধর্ম অবমাননা', তোপের মুখে অস্ট্রিয়া প্রবাসী ব্লগার

সৌদি আরবের সাথে সামরিক চুক্তি: বাংলাদেশের কী লাভ?

ভুয়া খবর ঘিরে বাংলাদেশে পাঁচটি বড় ঘটনা

কী আছে বিজ্ঞপ্তিতে

বিজ্ঞপ্তিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিয়েছিলো গত ২৫শে এপ্রিল কিন্তু সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয় আরও কয়েকদিন পর।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কোনো ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন/আঘাত করে বক্তব্য প্রদান করা দেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্ট সকলকে ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন/আঘাত করে কোন প্রকার বক্তব্য, লেখা, লিফলেট, পোস্টার, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি) ছাপানো/ স্ট্যাটাস প্রদান করার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হলো।"

"কারো দ্বারা এরূপ কোন কার্যাদি সম্পাদনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে," বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়।

Image caption বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে যা লেখা ছিল।

ঘটনার সূত্রপাত

সম্প্রতি ব্রুনেইতে ইসলামের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে একটি সরকারি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও প্রকাশ পায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী তার ফেসবুক পাতায় সেটি নিয়ে একটি মন্তব্য করেন।

তার জের ধরে তার সহপাঠী কয়েকজনের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং এরপর ধর্মভিত্তিক একটি সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী ক্যাম্পাসে ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মিছিল বের করে।

এর ধারাবাহিকতায় ওই শিক্ষার্থীকে 'নাস্তিক' আখ্যা দেয়া শুরু হয় এবং তাকে বহিষ্কারের দাবি করে কয়েকজন বিক্ষোভ মিছিল করতে শুরু করে।

পরে বিষয়টি পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে আটক করে।

শুরুতে ওই শিক্ষার্থীর পক্ষে তার সহপাঠীসহ অনেকে থাকলেও পরে তারা সরে পড়ে।

ওই বিভাগেরই একজন শিক্ষার্থী বিবিসিকে বলেন, "সে আসলে এমন কিছুই বলেনি যে তার জন্য ফাঁসি দাবি করতে হবে। নিজের সার্কেলের লোকজনের মধ্যকার বিরোধের শিকার হয়েছে ছেলেটি।"

বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার অবশ্য বলছেন, ঘটনাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখেছে ও পরে আইসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা ওই শিক্ষার্থীকে আটক করে ব্যবস্থা নিয়েছে।

"ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের সাথে দেখা করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। তখন উপাচার্য তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন ব্যবস্থা নেওয়ার। এরপর উপাচার্যের নির্দেশে আমরা সতর্ক নির্দেশনাটি জারি করি।"

কী বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ?

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে কয়েকজন শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও অধিকাংশ শিক্ষকই স্বনামে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি।

বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, "জগন্নাথে যা ঘটেছে সেটা রাষ্ট্রীয় নীতির একটা বহিঃপ্রকাশ। রাষ্ট্রও যেমন এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতার বদলে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে এখানেও তাই ঘটছে।"

তিনিও তার নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি।

তবে ওই বিভাগেরই একজন শিক্ষার্থী সাদ্দাম হোসেন বলেন, "যে শিক্ষার্থীকে নিয়ে এগুলো করা হচ্ছে তিনি কী বলেছেন বা আদৌ অবমাননাকর কিছু বলেছেন কি-না, সেটি কেউ যাচাই করেনি।"

তিনি বলেন, আসলে তার নিজের পরিচিত কিছু লোকজন এটা করেছে নিজেদের মধ্যে সমস্যার জের ধরে।

মিস্টার হোসেন বলেন, ওই শিক্ষার্থী নিজেই গিয়েছিলো পুলিশের কাছে; কারণ তাকে বলা হয়েছিলো ঘটনা মিটমাট করে দেওয়া হবে। কিন্তু এজন্য পুলিশের কাছে যাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের সাথে রাস্তায় নেমে আলোচনায় এসেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসির আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তীব্র সমালোচনাসহ নানা কারণে আলোচনায় থাকা এই শিক্ষককে সম্প্রতি চাকরিচ্যুত করেছে জগন্নাথ কর্তৃপক্ষ।

মিস্টার আহমেদ বলছেন, "...একটা বিশ্ববিদ্যালয় এটা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এভাবে বলতে পারেনা। কারণ তাহলে অনেক বিভাগে ধর্ম বিষয়ক বা ধর্ম তত্ত্বের অনেক দিক পড়ানো হয়। যেখানে ইতিবাচক-নেতিবাচক অনেক কিছু পড়তে হয়, সেগুলো কী বন্ধ করে দেওয়া হবে?"

তিনি বলেন, সিলেবাসে অনেক বিষয় আছে সেগুলো ধর্ম সম্পর্কিত এবং শিক্ষার্থীরা সব পড়েই ঠিক করবে কোনটি তারা নেবে আর কোনটি নেবেনা।