ওসামা বিন লাদেন: মৃত্যুর আট বছর পর আল-কায়েদা এখন কোথায়?

২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের হত্যার পর পাকিস্তানে আমেরিকান-বিরোধী বিক্ষোভ।
Image caption ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনের হত্যার পর পাকিস্তানে আমেরিকান-বিরোধী বিক্ষোভ।

আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন আট বছর আগে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরে মার্কিন বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।

তিনি যে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন তাকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিহাদি দল বলে বিবেচনা করা হতো। এক সময় এই সংগঠনে হাজার হাজার যোদ্ধা ছিল।

এক সময় এই সংগঠন আর্থিক ক্ষমতার দিক দিয়ে ছিল অনেক শক্তিশালী।

কিন্তু এর দল-নেতার মৃত্যু আর ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর উত্থানের সাথে সাথে আল-কায়েদার ক্ষমতা এবং প্রভাব অনেকখানি কমে গিয়েছে বলে মনে করা হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো এই দলটি এখন কত প্রভাবশালী? বিশ্ব নিরাপত্তার প্রতি আল-কায়েদা এখন কত বড় হুমকি?

নি:শব্দ প্রত্যাবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আইএস সংবাদের শিরোনাম দখল করে রাখলেও, আল-কায়েদা গোপনে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে এবং সমমনা আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলির সাথে জোট তৈরি করছে।

ইউএস ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স জোট তার সর্ব-সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলছে, "আল-কায়েদার শীর্ষ নেতারা এই সংগঠনের বিশ্বব্যাপী কাঠামো জোরদার করছে এবং পশ্চিমা দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে।"

Image caption যেসব দেশে তৎপর আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন।

বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের হুমকির ওপর জাতিসংঘ এ বছরের গোড়ার দিকে তার একটি রিপোর্টে বলছে, আল-কায়েদা "আগের চেয়েও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে …সংগঠনটি এখনও অনেক অঞ্চলে তৎপর রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটা নিজেকে আরও বেশি করে পরিচিত করতে চাইছে।''

গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটেনের গোয়েন্দা প্রধান অ্যালেক্স ইয়াংও আল-কায়েদার পুনরুত্থানের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি জানিয়েছিলেন।

সহযোগী দলগুলোর নেটওয়ার্ক

মার্কিন বাহিনীর ক্রমাগত ড্রোন হামলা, এর শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জ - এসব কারণে আল-কায়েদাকে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে।

আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এবং পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এটা সফলভাবে কতগুলো 'শাখা' বা সহযোগী সংগঠনের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।

এই সহযোগী সংগঠনগুলো হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু জঙ্গি দল যারা কোন দেশের মধ্যে গোপনে তৎপর এবং যারা আল-কায়েদার নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।

আইএস যেমনটা করছে, আল-কায়েদা কখনই স্থানীয় জনগণের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করেনি।

এর নতুন একটি কৌশল হচ্ছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে আত্মনিয়োগ করা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আল-কায়েদার অনুগত আল-শাবাব সোমালিয়ায় নিয়মিতভাবে হামলা চালায়।

আরো পড়তে পারেন:

আইএস জঙ্গিরা কি বাংলাদেশে ফেরত আসছে?

নিরাপদ পানি: গণশুনানিতে ওয়াসা এমডির পদত্যাগ দাবি

ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ ঠেকানোর পথ খুঁজছে রেলওয়ে

গত ২০১৩ সালে আল-কায়েদা যে ''জিহাদের সাধারণ নিয়মাবলী'' প্রকাশ করেছিল তাতে সংগঠনের মধ্যে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল।

অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ঐ দলিলে আরও বেশি সংযত আচরণের কথা বলা হয়েছিল এবং সমাজকে সাথে নিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল।

তাদের যোদ্ধাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তারা এমন কিছু যেন না করে "যাতে তাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়।"

"আল-কায়েদা এখন দুর্নীতি আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার মতো বিষয়ের দিকে নজর দিচ্ছে," বলছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পেমব্রোক কলেজের শিক্ষক ড. এলিজাবেথ কেনডাল, "বিশ্বব্যাপী জিহাদের এজেন্ডায় তারা এসব বিষয় ঢুকিয়ে দিয়েছে।"

"এর মধ্য দিয়ে তারা স্থানীয়ভাবে মানুষের সামনে 'উদ্ধারকর্তা' হিসেবে হাজির হচ্ছে এবং আইএস-এর নিষ্ঠুরতার বিপরীতে 'ভাল জিহাদি' হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।"

আল-কায়েদা তার শাখাগুলোর মাধ্যমে তাদের হামলার সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আল-কায়েদা তার সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের নানা দেশে মোট ৩১৬টি হামলা পরিচালনা করেছিল।

আল-কায়েদার সাথে সম্পর্কিত গোষ্ঠীর হামলার সংখ্যা

জানুয়ারি ২০১৭ থেকে এপ্রিল ২০১৯

সূত্র: এসিএলইডি

আল-কায়েদার শাখা

আল-কায়েদা ইন দ্যা ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৬ সালে। আলজেরিয়া-ভিত্তিক একটি জঙ্গি দল এটা চালু করে। আলজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে এটি সাহেল এবং পশ্চিম আফ্রিকার দিকে সরে যায়।

আল-কায়েদা ইন দ্যা অ্যারাবিক পেনিনসুলা (একিউএপি) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। ইয়েমেন এবং সৌদি আরবে তৎপর দুটি আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক এক হয়ে এই সংগঠনটির জন্ম দেয়।

আল-কায়েদা ইন দ্যা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশে তৎপর। এটি ২০১৪ সালে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়।

জামায়াত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) আল-কায়েদার একটি সহযোগী সংগঠন। মালি এবং পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন মিলে এটি তৈরি করেছে।

আল-শাবাব সোমালিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকাতে তৎপর। এটি ২০১২ সালে আল-কায়েদার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেছে।

হায়াত তাহ্‌রির আল-শাম (এইচটিএস) তৈরি হয়েছে সিরিয়ার কয়েকটি জঙ্গি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে। এইচটিএস এখন উত্তর সিরিয়ার ইডলিব প্রদেশ নিয়ন্ত্রণ করছে।

আল-কায়েদা ইন ইজিপ্ট মিশরের সিনাই মালভূমিতে সক্রিয়। আল-কায়েদার সমর্থক বেশ কয়েকটি দল মিলে এই গোষ্ঠীটি তৈরি হয়েছে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption হামজা বিন লাদেনের অবস্থান কেউ জানে না।

ভবিষ্যতের নেতৃত্ব?

গত ২০১৫ সালে আল-কায়েদার বর্তমান নেতা আইমান আল-জোয়াহিরি এক তরুণকে বিন-লাদেনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের গোষ্ঠী থেকে আসা ''একটি সিংহ'' হিসেবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।

ঐ তরুণের নাম হামজা বিন লাদেন। তিনি ওসামা বিন লাদেনের এক ছেলে। মনে করা হচ্ছে তিনিই আল-কায়েদার ভবিষ্যৎ নেতা।

মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হামজাকে বিশ্ব সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করেছে।

আল-কায়েদাপন্থী ওয়েবসাইটগুলোতে ৩০-বছর বয়সী হামজা বিন লাদেনকে উঠতি তারকা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

লন্ডনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের লিনা খতিবের মতে, "আইএস খিলাফতের পতনের পর আল-কায়েদা তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে।"

"তারা এখন বেশি নির্ভর করছে এমন এক নেতার ওপর যিনি কৌশলে দক্ষ। আল-কায়েদার নেতার পদে তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে এটা হামজাকে বেশ সাহায্য করছে।"