কৃষি শ্রমিক: বাংলাদেশের গ্রামে একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরী একমণ ধানের দামের চেয়েও বেশি

ছবির কপিরাইট Majority World
Image caption ধান চাষ করে এখন আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছেন না অনেক কৃষক।

গোপালগঞ্জ এবং বাগেরহাট সীমান্তে মহাসড়কের কাছেই ধান মাড়াইয়ের কাজ করছিলেন কৃষক আশুতোষ কুমার মজুমদার।

ধানের দাম নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাঁর চোখে মুখে চরম হতাশা জেগে ওঠে।

কারণ একটাই, ধান চাষ করে এখন আর পোষাতে পারছেন না তিনি।

"ধানের মণ ৪৮০ টাকা। কৃষাণ একটা ৭০০ টাকা। এজন্যি আমরা ধান আর করবো না। ধানের জন্য ভারি কষ্ট পাচ্ছি। এহন কৃষাণই পাওয়া যায়না," বলছিলেন আশুতোষ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, যদি ধানের মণ ৮০০ টাকাও হতো তাহলে কৃষকেরা বাঁচতো।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption ধান মাড়াইয়ের কাজ করছেন কৃষক আশুতোষ কুমার মজুমদার।

বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে যে চিত্র পাওয়া গেল সেটি হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট।

ফলে শ্রমিকের মজুরী বেড়ে এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কৃষকদের ধান উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।

মাঠে কাজ করার জন্য কৃষি শ্রমিক জোগাড় করতে ভীষণ কষ্ট হয় কৃষকদের।

যদি বা পাওয়াও যায় - তাহলে একজন কৃষি শ্রমিকের মজুরি দৈনিক অন্তত ৭০০ টাকা। এই টাকার অতিরিক্ত একজন কৃষি শ্রমিককে দুপুরে খাবারও দিতে হয়।

এই হিসেব করলে দেখা যায়, বর্তমানে একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরী এক মণ ধানের চেয়েও বেশি।

অথচ বাজারে ধান বিক্রি করে সে দাম মিলছে না কৃষকদের ।

ছবির কপিরাইট SOPA Images
Image caption কৃষি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণও কম নয়।

গোপালগঞ্জের কৃষক সাজেদা বেগমের নিজের জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তিনি ধান চাষ করেন।

বলছিলেন, এখন তিনি ধান বিক্রি করে আর লাভের আশা করেন না। শুধু ভাতের জোগান হলেই হলো।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, "খরচ ওঠে কেম্বে? ... বাজার খাবো? না কাপড়-চোপড় কিনবো, না ছেলে-মেয়েরে কোন খাবার খাওয়াবো?"

কৃষকরা বলছেন, গত কয়েক বছর যাবত ধানের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু অনেকেই গত মওসুমে উৎপাদিত ধানও এখনো বিক্রি করতে পারেননি।

ধান বিক্রি করতে বাড়ি থেকে বাজার পর্যন্ত যে পরিবহন খরচ দিতে হয় - সেটি বেড়েছে।

কৃষক তালিম শেখ বলছেন, তিনি এক বিঘা জমি চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ২২ মণের মতো। প্রতি মণ ৫০০ টাকা বিক্রি করলে তাঁর আয় হবে ১১ হাজার টাকা।

অথচ তালিম শেখের খরচ হয়েছে ১৩ হাজার টাকা।

বিবিসি বাংলায় আরো খবর:

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ আরও জোরদার

গাজীপুরের গ্রামে কংকাল চুরি, ঠেকাতে কবর পাহারা

কঠোর ইসলামি আইনের দেশ ব্রুনেই আসলে কেমন?

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption উৎপাদিত ধান মেপে দেখছেন কৃষক তালিম শেখ।

একদিকে কৃষকরা দাম পাচ্ছেন না , আবার অন্যদিকে কৃষকরা যাদের কাছে ধার বিক্রি করেন সেই চাতাল মালিকরাও লোকসানের কথাই বলছেন।

ধানের দাম কম হলেও খুচরা বাজারে চালের দামের কমতি নেই।

ফরিদপুরের রঘুয়াপাড়ার চাতাল মালিক রাশেদ শেখ ১০ বছর যাবত ধান-চালের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় থেকে শুরু করে চাতালে প্রতি কেজি চাল উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩১-৩২ টাকা।

কিন্তু পাইকারি দামে চাল বিক্রি করে সেটি পুষিয়ে নিতে পারছেন না বলে দাবি করেন রাশেদ শেখ।

"খুচরা বাজারে ঠিকই ৪০-৪৫ টাকার নিচে চাল খাওয়া যায়না। ফরিদপুরে অনেক বড়-বড় আড়ৎদাররা আছে। তারা আমার কাছ থেকে অনেক কম দামে কিনে। কিন্তু এরা যখন লোকাল মার্কেটে বিক্রি করে, তখন বেশি দাম নেয়। লোকা মার্কেট যারা চাল বিক্রি করে তারা বেশি লাভ করে," বলছিলেন রাশেদ শেখ।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption কৃষি কাজে শ্রমিক এখন বড় সংকটঅ
ছবির কপিরাইট Anadolu Agency
Image caption এখন কৃষি কাজের জন্য একজন শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ৭০০ টাকা।

রাশেদ শেখের ভাষ্য অনুযায়ী কৃষকরা ধানের দাম কম পাবার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে ঘন-ঘন ধানের বাজার ওঠা-নামা করা।

ধানের দাম প্রায়শই ওঠা-নামা করার কারণে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে ধান ক্রয় করছেন না।

রাশেদ শেখ বলেন, "দাম আরো বাড়তো যদি ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়তা পাইতো যে ছয় মাস দাম এভাবে থাকবে। তাহলে ধান অতিরিক্ত কিনলে বাজারে দাম বাড়তো। এখন আমরা কেউ ধান কিনতেছি না। আমাগো যতটুকু দরকার একদিনে ততটুকুই কিনতেছি।"

ধান চাষ করে কৃষকরা লাভ করতে পারছেন না, আবার চাষ না করলে বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনে খেতে হবে।

সেজন্য ধান চাষ নিয়ে কৃষকরা এখন উভয় সংকটে আছেন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে নতুন দুটি ধানের জাত উদ্ভাবন

অতিবৃষ্টিতে বোরো ধান নিয়ে চিন্তিত চাষীরা

ধান কাটার শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নয়া উদ্যোগ!

গোল্ডেন রাইস: ভালো না খারাপ?

সম্পর্কিত বিষয়