প্রযুক্তি ব্যবহার করে কি ধানের দাম বাড়ানো যাবে?

ধানের দাম নাই। কিন্তু কৃষি খরচ বেশি। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ধানের দাম নাই। কিন্তু কৃষি খরচ বেশি।

বাজারে দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে হাহাকার পড়েছে। সরকার ভাবছে প্রযুক্তির ব্যবহার ও চাল রপ্তানির কথা।

টাঙ্গাইল জেলার ক'দিন আগে একজন কৃষক ক্ষোভ এবং হতাশা থেকে জমিতে পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে দেন।

দেশে যে বছরই ধানের ফলন ভাল হয়, তখনই ধানের দাম নিয়ে কৃষকরা হতাশায় পড়তে হয়।

এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার আদৌ কি কোন উপায় আছে - এই প্রশ্ন এখন উঠছে।

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী এলাকার মোসাম্মৎ বানেশা বেগম অন্যের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু এখন তার শ্রম এবং খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় তিনি থমকে গেছেন।

"ধানের দাম নাই। কিন্তু কৃষি খরচ বেশি। ১২০০ টাকা দিয়া এক বিঘা ধান কাটাতে কামলা নিতে হয়। পোষায় না।"

টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার বানকিনা গ্রামের একজন কৃষক আবদুল সিকদার কয়েকদিন আগে তার জমিতে পাকা ধানে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় ক্ষোভ এবং হতাশা থেকে তিনি এটা করেছিলেন বলে তার পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন।

বোরো ধান মণপ্রতি এখন কৃষকদের ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

কুড়িগ্রামের একজন কৃষক আজিজার রহমান বলছিলেন, প্রতি বছরই ধানের দাম নিয়ে তাদের হতাশায় পড়তে হচ্ছে।

"আমাদের জমিতে ধান ছাড়া অন্য ফসল করা যায় না। এটা ধানী জমি। সে কারণে বাধ্য হয়ে ধান করি।"

ধানের দাম বাড়াতে দুই উদ্যোগ - প্রযুক্তি ও রপ্তানী

সরকারও এ পরিস্থিতিটা স্বীকার করছে।

কৃষিমন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, এই বছর আমন এবং আউশের উৎপাদন বেশি হয়েছে। এখন বোরো ধানও এক কোটি ৯০ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

ফলন বেশি হওয়ায় ধানের দাম এবার আগের তুলনায় অস্বাভাবিক কম বলে তিনি মনে করেন।

আরো পড়ুন:

ধান কাটার শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নয়া উদ্যোগ!

'একমণ ধানের দামের চেয়ে একজন শ্রমিকের মজুরি বেশি'

ড: রাজ্জাক জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা সরকার নিচ্ছে।

তিনি বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য চাল রপ্তানির বিষয় সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।

"কৃষক আমন ধানও ভাল দামে বিক্রি করতে পারে নাই এই অস্বাভাবিক হারে দাম কমে গেছে। ইতিমধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হাওর থেকেও ধান কাটা হয়ে গেছে। ফলে স্পষ্ট বোঝা যায়, অনেক ধান উদ্বৃত্ত থাকবে।"

"আমরা বেশি কিনতে পারতাম। কিন্তু সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। সেজন্য আমরা ১২ লাখ টন টার্গেট করেছি। তার চেয়ে বেশি কেনা সম্ভব হবে না। আর সাড়ে তিন কোটি টন চালের মার্কেটে ১০ বা ১২ লাখ টন চাল কিনলে এর প্রভাব পড়ে না। এছাড়া কৃষকরা প্রত্যক্ষভাবে এর সুবিধাটা পায় না। ডিলাররা কিনলে তার একটা প্রভাব পড়ে।"

মন্ত্রী আরও বলেছেন, "সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চাল রপ্তানির বিষয় আমরা বিবেচনা করছি।"

তবে কৃষি বিষয়ক অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফলন ভাল হলেই ক্ষুদ্র এবং মাঝারী কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption চাতালের জায়গায় অটো রাইস মিলের উত্থান হয়েছে।

সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস-এর গবেষক ড: নাজনীন আহমেদ বলছিলেন, ধান চাল কেনার প্রচলিত পদ্ধতিতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো হলে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার জন্য দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিলে দীর্ঘমেয়াদে ভাল সমাধান হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

"সমস্যা অনেক, যেমন চাতালের জায়গায় অটো রাইস মিলের উত্থান। এর সাথে কৃষকের ফলন ধরে রাখার নিজেদের ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষককে ধান কেটেই বিক্রি করতে হয়। তখন তারা দাম কম পায়।"

"এখানে সরকার যদি তাদের চাল কেনার প্রক্রিয়া একটু আগে শুরু করে, তাহলে সেখানে ধানের দাম যেটা ঘোষণা করা হবে, সেটা ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য একটা বারগেইনিং পয়েন্ট হতে পারে। এটা এখনকার ব্যবস্থায় কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষককে প্রযুক্তির দিকে নেয়া ছাড়া বিকল্প নাই।"

সরকার অবশ্য কিছুদিন আগে ৩৬ টাকা কেজিতে চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছে। আর ধানের দাম ঘোষণা করেছে ২৬ টাকা কেজি।

সরকারের এই দাম অনুযায়ী মণপ্রতি ধানের দাম এক হাজার টাকার বেশি হয়। কিন্তু সরকারি কেনার প্রক্রিয়া মাঠ পর্যায়ে এখনও সেভাবে শুরু হয়নি।

কৃষি মন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারও স্থায়ী উপায় হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে চাইছে।

"ধান লাগানো এবং ধান কাটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সরকার কৃষককে সহযোগিতা করছে। একটি যন্ত্র কিনতে কৃষক ৫০ টাকা দিলে সরকার বাকি ৫০ টাকা দিচ্ছে। আরও কিভাবে খরচ কমানো যায়, সেই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু এটা একদিনে সম্ভব না। অনেক সময় প্রয়োজন।"

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সারাদেশের কৃষকদের তালিকা এবং তথ্য সরকারের কাছে আছে। ফলে সরকার কৃষকদের সাথে নিয়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিলে অল্প সময়েই স্থায়ী সমাধান সম্ভব হতে পারে।

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
পৃথিবী যে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে, তার একটি প্রমান হয়তো বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন আবিষ্কার।

অন্যান্য খবর:

'ইসরায়েলি' প্রযুক্তি দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে নজরদারি

কৃত্রিম মাংসের বার্গার, যা থেকে 'রক্ত' ঝরে

গির্জায় গিয়ে কেন আলোচনায় ঘানার ১০০ বছর বয়সী ইমাম

সম্পর্কিত বিষয়