কেনিয়ার সমকামীদের জীবন যেভাবে কাটে

আফ্রিকার অনেকে দেশে সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও অনেক দেশে তারা এখনো হুমকির মুখে রয়েছেন ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আফ্রিকার অনেকে দেশে সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও অনেক দেশে তারা এখনো হুমকির মুখে রয়েছেন

''প্রথম যেদিন আমার বাবা-মাকে আমি জানালাম যে, আমি একজন সমকামী, সেদিন থেকেই তারা আমাকে অস্বীকার করতে শুরু করলো। তারা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো এবং আমার সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো।'' বলছেন কেনিয়ার নাইরোবির বাসিন্দা অ্যালেক্স, যদিও এটি তার সত্যিকারের নাম নয়।

এটা ছিল আসলে তার সমস্যার সবে শুরু মাত্র।

একটি আবাসনের সন্ধানে

''আমার যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না। আমি বিশাল এক অবসাদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার কোন কোন বন্ধু আমাকে তাদের বাসায় থাকতে দিতে চাইছিল, কিন্তু তাদের পরিবারের আপত্তির কারণে তারা পারছিল না।''

''অন্য কয়েকজন আমাকে থাকতে সুযোগ করে দিতে চাইছিল, কিন্তু সেজন্য তারা আবার আমাকে তাদের বিছানায় পেতে চাইতো।''

সাতাশ বছরের এই সমকামী যুবক নিজেকে 'নারী' ভূমিকায় দেখতে ভালোবাসেন। সেই সময় তিনি যার সঙ্গে ডেটিং করছিলেন, সেই বয়ফ্রেন্ড তখন তাকে সাহায্য করেন।

''প্রকাশ্য যেকোনো স্থানে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হতো। অনেক রেস্তোরায় আমাকে খাবার দেয়া হতো না, জনসমাগমের স্থানগুলোয় লোকজন আমাকে এড়িয়ে চলতো।''

কেনিয়ার পুরুষ বা নারী সমকামী, বাইসেক্সুয়াল বা ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের আরো অনেক সদস্যের মতো অ্যালেক্সও হাইকোর্টের দিকে অধীর হয়ে তাকিয়ে ছিল যে, সেখান থেকে ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা আইনটির বাতিল হবে, যেখানে সমকামিতাকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

তবে কেনিয়ার উচ্চ আদালত ওই আইন বহাল থাকার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।

আরো পড়ুন:

সমকাম বিদ্বেষের কী কোন চিকিৎসা রয়েছে?

কেনিয়ার নারীবেশী পুরুষদের গোপন জীবন

নারী সমকামীরা কীভাবে গোপন ভাষায় কথা বলে?

'সমকামী বলে আমি এখন পরিবারের বিষফোঁড়া'

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption নাইরোবির একজন সমকামী আন্দোলনকর্মী

কটু মন্তব্য

সমকামিতার বিরুদ্ধে কেনিয়ায় মানুষের মনোভাব অত্যন্ত কঠোর। ফলে অ্যালেক্সের মতো মানুষদের প্রতিদিনকার জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে ওঠে।

বিদ্যালয়ে তাকে যেমন নানা ধরণের কটু মন্তব্যের শিকার হতে হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও অনেক নিগ্রহের মধ্যে পড়েন।

''যখন আমাদের বাড়িওয়ালা জানতে পারলেন যে, আমি এবং আমার ছেলে বন্ধু সমকামী, তখন তিনি আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।''

আন্দোলনকারীরা যখন কেনিয়ায় সমকামিতাকে বৈধতা দেয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে দাবি করে আসছেন, তখন খৃষ্টান ও মুসলিম গ্রুপগুলো তার বিরোধিতা করে আসছে।

এর বিরুদ্ধে থাকা অনেকে এমনকি বলছেন, সমকামিতাকে আইনগত বৈধতা দেয়া হলে তা আফ্রিকান সংস্কৃতির বাইরে চলে যাবে। তারা বলছেন, এমনকি অনেক আফ্রিকান ভাষায় সমকামিতার জন্য কোন শব্দ পর্যন্ত নেই।

মেনে নিতে অস্বীকৃতি

এখন একটি অ্যাডভোকেসি গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেন অ্যালেক্স। তিনি বলছেন, মানুষের মনোভাব আস্তে আস্তে বদলাচ্ছে।

''আমার দুই বোন ও এক ভাই রয়েছে। তারা আমার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে আমার বোনরা। কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, সেই আশঙ্কায় তারা আমাকে মানতে রাজি হননা।''

''তাদের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই। আমি শুধু চাই, কোন একদিন তারা আমাকে মেনে নেবেন।''

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সমকামিতা আইন নিয়ে কেনিয়ার হাইকোর্টে শুনানির সময় নিয়মিত হাজির থাকতেন এলজিবিটি সম্প্রদায়ের লোকজন

পরিবার বিচ্ছিন্নতা

ক্রিসমাসের মতো বিশেষ উৎসবগুলোয় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান অ্যালেক্স।

''আমরা আমাদের পরিবারের বাইরে বসবাস করি। কিন্তু আমরা পরিবারের মধ্যেই বাস করতে চাই।''

তবে শিল্পী ও সমঅধিকারের পক্ষে আন্দোলনকারী কায়িরা মাউরিশি ব্যক্তিগতভাবে কোন হয়রানির শিকার হননি। বরং তারা পিতা-মাতা তাকে মেনে নিয়েছেন এবং তার নিজের জীবনযাপনে উৎসাহ দিয়েছেন।

''আমার মনে হয়না যে, পুরো সমাজের সমকামীদের নিয়ে বিরূপ মনোভাব রয়েছে। আমাদের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, এটা বিশাল কোন ব্যাপার না। কিন্তু অন্তত একবার রক্ষণশীল একজন নেতা কোত্থেকে এসে হুমকি তৈরি করেছিলেন।''

ধর্ষণের ভয়

কিন্তু তিনি তার বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক ভীতিকর কাহিনী শুনেছেন।

''আমি এমন অনেককে জানি, যাদের ভালো করার জন্য ধর্ষণ করা হয়েছে।''

নারী সমকামীদের ক্ষেত্রে এ ধরণের ব্যাপার প্রচলিত রয়েছে যে, তাদের যৌনতার ব্যাপারটিকে 'সুস্থ' করে তোলার জন্য, পুরুষদের দ্বারা ধর্ষণ করানো হয়।

এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ২০০৮ সালে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার ইডি সিমেলানকে গণধর্ষণ, মারধর ও হত্যার জন্য ছুরিকাঘাত করা হয়।

''যে নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তারা নিজেদের মুখ বন্ধ করে রেখেছেন, কারণ তারা যদি পুলিশের কাছে যেতেন, তাহলে হয়তো তাদের গ্রেপ্তার করা হতো বলে ভয় পাচ্ছিলেন।''

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption সম অধিকারের দাবিতে নিয়মিত আন্দোলন করে আসছেন এলজিবিটি সম্প্রদায়ের সদস্যরা

কারাদণ্ড

বর্তমান আইন অনুযায়ী, সমকামিতার দায়ে দোষী একজন ব্যক্তির ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছেন, এই আইনের খুবই কম প্রয়োগ হচ্ছে।

''গত ১০ বছরে এ রকম মাত্র দুইটি সাজা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে,'' বলছেন এই ক্যাম্পেইন গ্রুপের কর্মকর্তা নিলা ঘোষাল।

কিন্তু এলজিবিটি গ্রুপের সাথে সম্পৃক্ত মানুষজন প্রায়শ পুলিশ ও অন্যান্য গোষ্ঠীর কাছে হয়রানির শিকার হয়। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় সমকামীদের প্রতি মানুষের বিরূপ আচরণের প্রবণতা বেশি।

কেনিয়ার একটি এনজিও, ন্যাশনাল গে এন্ড লেসবিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন বলছে, ২০১৪ সাল থেকে শুধুমাত্র তাদের প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৫০০ ঘটনায় আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে।

সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক সমকামী নারী-পুরুষ দেশ থেকে পালিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোয় আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন কেনেথ মাচারিয়া, যিনি যুক্তরাজ্যে শরণার্থীর আশ্রয় চেয়েছেন।

তিনি এখন সমকামী বান্ধব ব্রিস্টল বাইসন্স রাগবি দলে খেলেন।

যেহেতু কেনিয়ার আইনে সমকামিতা অপরাধ বলে গণ্য করা হয়।

ছবির কপিরাইট EPA
Image caption নাইরোবির একটি এলজিবিটি আন্দোলনের চিত্র

পরিবর্তনশীল মনোভাব

তবে আফ্রিকার অনেক এলাকায় এখন পরিবর্তন আসছে।

শুধুমাত্র আফ্রিকায় নয়, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে ১৯৯৬ সালে সমকামী অধিকারকে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষা দিয়েছে।

অন্য অনেক দেশে এরকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে অ্যাঙ্গোলায় তাদের ঔপনিবেশিক আমলের আইনটি বাতিল করে দিয়েছে। বোতসোয়ানার হাইকোর্ট জুন মাস নাগাদ এ বিষয়ে রায় দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে চাদ হেঁটেছে উল্টো পথে। ২০১৪ সালে দেশটি বিশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখে একটি আইন অনুমোদন করেছে।

ছবির কপিরাইট AFP/Getty
Image caption ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে কঠিন বিরোধিতার মুখে পড়েছে এলজিবিটি গ্রুপগুলো

মৃত্যুদণ্ড

কেনিয়ার সঙ্গে একই সীমান্ত থাকা সোমালিয়ায় সমকামিতার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মধ্যে ৩৪টি দেশে সমকামিতার অপরাধে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশে এরকম আইন রয়েছে, যাদের অর্ধেক দেশই একসময় ব্রিটিশ কলোনি ছিল।

কেনিয়ায় এখন অনেক নারী পুরুষ নিজেদের সমকামী পরিচয়ের ব্যাপারে খোলাখুলিভাবে বলেন। কিন্তু তাদের ওপর হামলার বা সহিংসতার সম্ভাবনা এখনো কমেনি।

তরুণ প্রজন্ম

''আমি বারবার ভাবি যে, কোন কাপড় পরবো এবং আমি কি করবো। অন্য কেউ আমার সম্পর্কে কি ভাববে। আমি কখনোই জানি না যে, কার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাচ্ছি,'' বলছেন তুমাইনি, যিনি নিজের আসল নামটি প্রকাশ করতে চান না।

''মানুষজন আমার পেছনে ফিসফাস করে। এটা যদি আমার বন্ধুর ব্যাপারে করে, তাহলে সেটায় আমার আপত্তি আছে। নতুন কোন স্থানে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি।''

তিনি বলছেন, তিনি সমকামী জানার পর তার অনেক বন্ধু ও স্বজন তাকে পরিত্যাগ করেছেন।

তুমাইনি বলছেন, ''এটার ভীতিকর দিকটা অনেক বড়, সেটা পরিবর্তন করা অনেক কঠিন। তবে তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি খোলামেলা হয়েছে। এমনকি যারা সমকামিতাকে সমর্থন করেন না, তারাও আমাদের বন্ধু এবং একজন মানুষ হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা যায়।''

সম্পর্কিত বিষয়