পুলিশ কেন 'আইএস' হামলার লক্ষ্যবস্তু?

পুলিশের ওপর এ নিয়ে দ্বিতীয় হামলা হলো ছবির কপিরাইট UNK
Image caption পুলিশের ওপর এ নিয়ে দ্বিতীয় হামলা হল। (ফাইল ছবি)

ঢাকার মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনায় একটি ভিন্ন ধরনের ককটেল ব্যবহার করা হয়েছে যা ছুড়ে মারা হয়নি বরং আগে থেকেই গাড়িতে রাখা হয়েছিলো বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে পুলিশ।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, "প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিস্ফোরণটি হয়েছে সেটি কোন ধরনের বিস্ফোরণ। সেক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আমরা যা জানতে পেরেছি যে এটা একটি ককটেল কিন্তু ইমপ্রোভাইজড এবং সাধারণ ককটেলের চেয়ে এটি শক্তিশালী।"

কথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের উপর নজর রাখে, এমন সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স জানাচ্ছে, রোবাবার রাতের সেই হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস।

আরো পড়তে পারেন:

ডাকসু ভিপি নূরুল হকের সাথে ছাত্রলীগের সমস্যা কোথায়?

যাত্রীদের নিরাপত্তায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো কী করছে?

ক্রিকেট বিশ্বকাপের যে তিনটি বিষয়ে উদ্বিগ্ন আইসিসি

এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল ঢাকার গুলিস্তানে একটি পুলিশ বক্সে একই ধরনের হামলা হয়েছিলো।

সেই হামলার দায়ও স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী।

মালিবাগে যে গাড়িতে বিস্ফোরণটি ঘটেছে সেটি পুলিশের বিশেষ শাখা এসবি'র একটি পিক-আপ ভ্যান।

যেখানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তার পাশেই রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি ও এসবির প্রধান কার্যালয়।

পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া বলছেন, "পুলিশই নির্দিষ্ট করে এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কিনা সেটি এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ।"

তবে তার ভাষায়, একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার অপচেষ্টা এটি।

ছবির কপিরাইট GOOGLE MAPS
Image caption বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, তার পাশেই রয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বিশেষ শাখার কার্যালয় (এসবি) প্রধান কার্যালয়

তিনি বলছেন, "আমার কাছে মনে হচ্ছে জনমনে ভীতি প্রদর্শন করে, পুলিশের গাড়ি অথবা পুলিশ বক্সে হামলা করে পুলিশের নৈতিকতা বা মোরালকে ডাউন করে দেয়ার চেষ্টা এটি।"

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক-দুই প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে জঙ্গি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড দমনে বেশ কঠোর অভিযান চালিয়েছে পুলিশ।

মি. আসাদুজ্জামান মিয়া বলছেন, জঙ্গিবাদের একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব আছে এবং বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক প্রভাবের বাইরে নয়।

২০১৬ সাল থেকে সফল অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদকে দমন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, "একটা অপচেষ্টা আছে। একটা অপ-তৎপরতা আমরা লক্ষ করছি।"

তিনি সাম্প্রতিক সময় নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা এবং শ্রীলংকার গির্জায় হামলা এই দুটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন যে, মালিবাগ ও গুলিস্তানের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থার সাথে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

তবে তিনি এও বলেছেন দেশের ভেতরের কোন শক্তি দেশের বাইরে বসে কিছু করছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে পুলিশ সম্পর্ক সাধারণ মানুষের একটা নেতিবাচক ধারনা আছে বলে মনে করেন জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ তাসনিম খলিল

কিন্তু পুলিশ কেন লক্ষ্যবস্তু?

সুইডেন ভিত্তিক জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ তাসনিম খলিল বলছেন, তার মনে হয়েছে নতুন একটি গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে আগে যাদের কর্মকাণ্ড ছিল না এমন কোন গোষ্ঠী পুলিশের উপরে হামলার জন্য দায়ী বলে তার মনে হচ্ছে।

তিনি বলছেন হামলার দায় স্বীকার করার ধরণে কিছুটা পার্থক্য তিনি দেখতে পাচ্ছেন।

তার বিশ্লেষণ হল, "তারা অফিসিয়ালি আইসিসের কাছ থেকে কোন স্টেটমেন্ট আসার আগেই বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে যেভাবে তারা এটি প্রচার করেছে এবং বিভিন্ন ছবি তারা শেয়ার করেছে - আইসিসের দায় স্বীকার করার যে চেইনটা আছে, আমার কাছে মনে হয় এই ঘটনার ক্ষেত্রে সেটি মেইনটেইন হয়নি। কিছু নতুন এলিমেন্ট এই ঘটনায় রয়েছে।"

বার্তা আদান প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রাম জঙ্গি গোষ্ঠীরা ব্যবহার করে থাকেন বলে নানা সময়ে শোনা গেছে। তিনি বলছেন, পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীকে যে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে সেটি মার্চ থেকেই খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিলো আইসিসের একটি প্রকাশনার সূত্রে।

এর আগেও কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলার লক্ষবস্তু হয়েছে। ২০১৭ সালে মার্চেই দুটি হামলা হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের বাইরে পুলিশের একটি চেক পোস্টের কাছে বোমা বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলো। যিনি নিহত হয়েছেন তিনি নিজেই সেই বোমা বহন করছিলেন বলে এটিকে সেসময় আত্মঘাতী হামলাও বলা হয়েছে। সেই সময় আইএস দাবি করেছে যে, তারা এই 'হামলাটি' চালিয়েছে।

আইএস পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট 'আমাক' থেকে এই দায় স্বীকার করা হয়েছিলো। একই মাসে র‍্যাবের একটি অস্থায়ী সদরদপ্তরের নির্মাণকাজ চলাকালীন এক যুবক তার সাথে বহন করা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।

তাসনিম খলিল বলছেন, "বাংলাদেশে পুলিশ সম্পর্ক সাধারণ মানুষের একটা নেতিবাচক ধারনা আছে। পুলিশ খুব সহজ টার্গেট। তারা রাস্তাঘাটে অ্যাক্টিভ থাকেন। তাদের উপর হামলা করাটা সহজ।"

তিনি বলছেন, "জিহাদিরা পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীকে তারা যেভাবে দেখে, তারা তাদের একটা সেক্যুলার রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখে। তাদের জন্যে লোভনীয় টার্গেট পুলিশ। তারা আদর্শিক-ভাবে এটাকে একটা বড় অর্জন বলে মনে করে।"

আইএস'এর দায় স্বীকার সম্পর্কে পুলিশ কী বলছে?

এই হামলায় আইএসএর সম্পৃক্ততার বিষয় সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে।

তারা বলছে, হামলার বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আইএস'এর দায় স্বীকারের বিষয়টিও পুলিশের দৃষ্টিতে এসেছে।

তবে এখন পর্যন্ত ঘটনার সাথে আইএস'এর কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।