ভারতের নতুন লোকসভাতে কেন বিজেপির একজনও মুসলিম এমপি নেই?

আহমেদাবাদে বিজেপির জনসভায় দলের সমর্থক এক মুসলিম তরুণী ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আহমেদাবাদে বিজেপির জনসভায় দলের সমর্থক এক মুসলিম তরুণী

ভারতে সদ্যনির্বাচিত নতুন লোকসভায় বিজেপির একজনও মুসলিম এমপি না-থাকায় প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে দেশের সবাইকে নিয়ে চলার কথা বলছেন তা শাসক দল আদৌ কতটা রক্ষা করতে পারবে।

ভারতের জনসংখ্যার প্রায় পনেরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর হলেও পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘকাল ধরেই চার শতাংশেরও কম ।

আর এই নিয়ে পরপর দুটো নির্বাচনে লোকসভায় বিজেপি একার শক্তিতে গরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও তাদের একজনও মুসলিম এমপি রইলেন না।

অ্যাক্টিভিস্টরা অনেকেই বলছেন, এই পটভূমিতে ভারতের সংখ্যালঘু শ্রেণীর বিজেপির কথায় ভরসা রাখা খুব কঠিন হবে - যদিও বিজেপি পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে তারা কখনও ধর্মের ভিত্তিতে প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয় না।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পার্লামেন্টে বিজেপির নতুন এমপি প্রজ্ঞা ঠাকুর, যে হিন্দু সাধ্বী মালেগাঁও বিস্ফোরণে অভিযুক্ত

ভারতের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে সারা দেশে বিজেপি মাত্র ছজন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিল - কাশ্মীরে তিনজন, পশ্চিমবঙ্গে দুজন আর লাক্ষাদ্বীপে একজন।

শেষ পর্যন্ত তাদের তিনশোরও বেশি প্রার্থী জিতে পার্লামেন্টে গেলেও এই ছজনের কেউই জয়ের মুখ দেখেননি, ফলে লোকসভায় বিজেপি এবারেও মুসলিমবিহীনই রয়ে যাচ্ছে।

এরপর সেন্ট্রাল হলে তার প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তার 'সবকা সাথ, সব কা বিকাশ' স্লোগানের সাথে এবারে 'সব কা বিশ্বাস' শব্দটাও জুড়ে দিয়েছেন।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী ফারা নকভি মনে করছেন যে বিজেপি মুসলিমদের একেবারেই বিশ্বাস করতে পারেনি, সেই দলের ওপর মুসলিমদের পক্ষেও ভরসা রাখা ভীষণ মুশকিল।

ছবির কপিরাইট ফারাহ নকভি / ফেসবুক
Image caption অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখিকা ফারাহ নকভি

মিস নকভি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "মি মোদী তার ভাষণে সংখ্যালঘুদের মিথ্যা ভয় দূর করার কথা বলেছেন সেটা ভাল কথা, স্বাগত।"

"কিন্তু যেভাবে তার দল এই নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী প্রচার করেছে, গত পাঁচ বছরে যেভাবে মুসলিমরা হামলা ও গণপিটুনির শিকার হয়েছে এবং মুসলিমদের টিকিট দেওয়ারও যোগ্য মনে করেনি, তারপর তারা কীভাবে এই কথাগুলো বিশ্বাস করবেন?"

"বলছি না যে বিজেপির কয়েকজন মুসলিম এমপি থাকলেই ছবিটা অন্যরকম হত - কিন্তু তাতে হয়তো দেশের সংখ্যালঘু ও দলিতদের সঙ্গে বেশি ন্যায় নিশ্চিত করা যেত, তারা এই মহান গণতন্ত্রের সমান ভাগীদার হতে পারতেন।"

প্রধানমন্ত্রী মোদী যে 'ইনক্লুসিভ ইন্ডিয়া' বা সবাইকে নিয়ে ভারত গড়ার কথা বলছেন - তার সঙ্গে বিজেপির মুসলিম এমপি না-থাকার অবশ্য বিন্দুমাত্র বিরোধিতা নেই বলেই দাবি করছেন দলের তাত্ত্বিক নেতা ও পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলি।

ছবির কপিরাইট অনির্বাণ গাঙ্গুলি / টুইটার
Image caption বিজেপি নেতা অনির্বাণ গাঙ্গুলি

তার বক্তব্য, "প্রথম কথা হল, আগে দেখতে বলুন বিজেপির শতকরা মুসলিম ভোটের হার বেড়েছে কি না। পশ্চিমবঙ্গে সেটা কিন্তু বেড়েছে। এবং দেশের মুসলিম-গরিষ্ঠ আসনগুলোর প্রায় সবই বিজেপি পেয়েছে।"

"দ্বিতীয়ত, বিজেপি যখন কোনও আসনে প্রার্থীকে টিকিট দেয় তখন তারা তার জেতার ক্ষমতা দেখে দেয় - ধর্মীয় পরিচয় দেখে নয়। অর্থাৎ, এখানে তার 'উইনেবিলিটি'টা গুরুত্বপূর্ণ - তিনি কোন কমিউনিটির সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়!"

"তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীও ঠিক এই জায়গাটাতেই সতর্ক করে দিয়েছেন - যে সংখ্যালঘু-রাই কেবল সংখ্যালঘুদের সেবা করতে পারবেন, তা কেন? একজন হিন্দু এমপি-ও তো মুসলিমদের সার্ভ করতে পারেন?"

"কাজেই এগুলো কোনও কথাই নয়। যারা এই সব প্রশ্ন তুলছেন, তাদের বরং বলুন সংখ্যালঘুদের স্বার্থ তারা এতদিন কতটা দেখেছেন?", বলছেন ড: গাঙ্গুলি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভোটের ফল প্রকাশের পর সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জি

অন্য দিকে কংগ্রেসকে বাদ দিলে লোকসভায় এবার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলিম এমপি পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের দল তৃণমূল - তাদের মোট এমপি-র প্রায় তেইশ শতাংশ, বা পাঁচজনই মুসলিম।

ভোটের ফল বেরোনোর পর দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যেই বলেছেন, মুসলিম তোষণের অভিযোগ তিনি গ্রাহ্য করেন না।

তিনি জানিয়েছেন, "আমি কিন্তু ইফতারে যাচ্ছি। আমি তো মুসলিমদের তোষণ করি, কাজেই একশোবার যাব।''

"আর যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়াও উচিত। আমি প্রতিবারই ইফতারে যাই, নতুন কিছু নয় - হাজারবার যাব", সাফ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption জনসংখ্যার অনুপাতে ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বরাবরই কম

তার এই মন্তব্যকেও কড়া আক্রমণ করেছে বিজেপি, সেই সঙ্গেই তারা দাবি করছে নরেন্দ্র মোদী কিন্তু এবার দেশে অনেক মুসলিম ভোটও টেনেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গীপুরে হেরে যাওয়া বিজেপি প্রার্থী মাহফুজা খাতুন যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "আমাকে যেখানে দল লড়তে পাঠিয়েছিল সেই জঙ্গীপুর আসনে কিন্তু ৬৮ শতাংশ মুসলিম আর ৩২ শতাংশ হিন্দু।"

"যদিও আমি কখনওই হিন্দু বা মুসলিম ভোটার দেখে নির্বাচনী প্রচার চালাইনি। কারণ শেষ বিচারে একজন হিন্দু ভোটারের ভোটের যা দাম, একজন মুসলিম ভোটারেরও তাই।"

"তথাপি আমি যখন জঙ্গীপুরের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় প্রচারে গিয়েছি আমি কিন্তু ভীষণ ভাল সাড়া পেয়েছি।"

ছবির কপিরাইট মাহফুজা খাতুন/ফেসবুক
Image caption জঙ্গীপুর আসনে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন মাহফুজা খাতুন

"শেষ পর্যন্ত মুসলিমরা কতটা আমায় ভোট দিয়েছেন তা এখনই বলতে পারব না।"

"কিন্তু তারা সব সময় আমাকে বলেছেন ধর্মের ভিত্তিতে নয় - উন্নয়নের নিরিখেই তারা নিজেদের ভোট দেবেন", বলছিলেন মিস খাতুন।

ফলে হিন্দুত্বের এজেন্ডায় আগাগোড়া প্রচার চালানো সত্ত্বেও বিজেপি এখন দাবি করছে, উন্নয়নের ন্যারেটিভে তারা ভোটারদের ধর্মীয় পরিচয়টাকে গৌণ করে দিতে পেরেছেন।

আর এই কারণেই এত বড় একটা জাতীয় দল লোকসভায় কেন একজন মুসলিমকেও পাঠাতে পারল না, এই সমালোচনাও তারা আদপেই গায়ে মাখছেন না।