মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা কতটা?

  • ১৬ জুন ২০১৯
নৌকায় ইরানের সেনারা টহল দিচ্ছে ছবির কপিরাইট ATTA KENARE
Image caption ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল হরমুজ প্রণালীতে 'ন্যাশনাল পার্সিয়ান গালপ ডে' তে অংশ নিয়েছে ইরানের সেনারা

ওমান উপসাগরে দুটি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরান জড়িত থাকার প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য দেয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সংকট জোরদার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই তথ্য প্রমাণ করে যে, বৃহস্পতিবারের হামলায় জড়িত ছিল ইরান।

ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এতেই বেশ পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেমন হতে যাচ্ছে পরবর্তী পরিস্থিতি? যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে? কিংবা কতটা মারাত্মক হতে পারে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পূর্ণ-মাত্রার বিমান ও নৌ সংঘর্ষ?

এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেছেন বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস।

পেন্টাগনের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার হামলার শিকার তেল ট্যাংকার দুটির একটি থেকে অবিস্ফোরিত একটি লিমপেট মাইন সরিয়ে নিচ্ছে ইরানি একটি ছোট তরীর ক্রুরা।

যাকে এই যুদ্ধে প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠার প্রথম শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ইরান এবং ট্রাম্প প্রশাসন- উভয় পক্ষের সমালোচনাই বিষাক্ত।

গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে চারটি লিমপেট মাইন হামলার মতোই শুরু থেকেই এ ঘটনার সাথেও সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। তবে দুটো ঘটনার জন্যই তেহরানকে দোষারোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, এই বাকযুদ্ধ শেষ মেষ সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

আরো পড়ুন:

হরমুজ প্রণালী ইরানের কাছে কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

তেলের ট্যাংকারে হামলার পেছনে ইরানের হাত?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাতঙ্ক, মক্কায় হবে জরুরী বৈঠক

ছবির কপিরাইট ERIC BARADAT
Image caption ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখছেন পম্পেও

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও দ্রুত ও স্পষ্টভাবেই ইরানের দিকে আঙুল তুলেছেন।

তিনি বলেন, "এই মূল্যায়ন" গোয়েন্দা তথ্য, ব্যবহৃত অস্ত্র, অভিযান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে ইরানের হামলা এবং যেহেতু ওই এলাকায় থাকা কোন প্রক্সি গ্রুপের এ ধরণের সূক্ষ্ম অভিযান পরিচালনার মতো সক্ষমতা না থাকার ভিত্তিতে করা হয়েছে।

এ অভিযোগ দ্রুতই নাকচ করেছে ইরান। উল্টো এই ঘটনা সাজানো উল্লেখ করে পাল্টা দোষারোপ করেছে দেশটি।

ইরানের এক কর্মকর্তা বলেন, "কেউ" ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক খারাপ করতে চাইছে।

অস্বাভাবিক কালক্রম?

সাধারণভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর ভিডিওটি বিশ্বাসযোগ্যই বটে। কিন্তু এর পরও আসলে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।

মার্কিনীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিস্ফোরণের কিছু সময় পর এটি রেকর্ড করা হয়েছিলো, যখন কিনা ইরানিরা প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলো।

তবে এই হামলার কালক্রম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হওয়া দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কখন এই মাইনগুলো জাহাজে স্থাপন করা হয়েছিলো?

ওই এলাকায় শক্তিশালী মার্কিন নৌ উপস্থিতি থাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের বেশ সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাই আরও তথ্য সামনে আসা উচিত। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর ময়না তদন্তও আরও তথ্য উদঘাটন করবে।

যাইহোক, মার্কিন এই দাবির প্রভাব আরও অনেক সুদূরপ্রসারী। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ইরান ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

মিস্টার পম্পেও এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, "পুরো ঘটনা আমলে নিলে বোঝা যায়, এ ধরণের উস্কানিহীন হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষার প্রতি হুমকি, নৌ চলাচলের স্বাধীনতার উপর আক্রমণ এবং উত্তেজনা বাড়ানোর অগ্রহণযোগ্য প্রচারণা।"

এসব স্থূল অভিযোগের পর প্রশ্ন আসে, এগুলো ঠেকাতে কি ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের?

সমন্বিত কুটনৈতিক তৎপরতা হতে পারে এক ধরণের উদ্যোগ, যাতে আন্তর্জাতিক মিলিত নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে আরও কোণঠাসা করা যায়।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

মুখ্যমন্ত্রী দাবী মানার পরও ধর্মঘটে অনড় ডাক্তাররা

ঈদের মৌসুমে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে কেন?

ভাগ্নে অপহৃত, ফেসবুকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আল্টিমেটাম

বিয়ের রাতে এক নারীর দুর্বিষহ যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ইরানের ইসলামিক রেভ্যূলিউশনারি গার্ডের ১৫০,০০০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে

তবে এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই যে, ভুল কিংবা সঠিক, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা তেহরানের উপর চাপ প্রয়োগ করে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রেভ্যূলিউশনারি গার্ড কর্পসের মতো স্বাধীন নৌ-শক্তি পরিচালনাকারী গ্রুপগুলো হয়তো পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তাহলে এখন কি হবে? যুক্তরাষ্ট্র কি শাস্তিস্বরূপ সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করছে?

উপসাগরীয় অঞ্চল এবং তার বাইরে মিত্রদেশগুলো কি চিন্তা করবে? আর সামরিক পদক্ষেপের পরিণতিই বা কি হবে?

ভয়ংকর সময়

বাস্তবিকপক্ষেই বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে যে, হামলার শিকার হলে ইরান সরাসরি বা তার মিত্র দেশগুলোর সহায়তায় হাইব্রিড যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। জাহাজ পরিচালনা ও অন্যান্য টার্গেটে ব্যাপকহারে হামলা শুরু করতে পারে, বাড়তে পারে তেল ও বীমার দাম। যা আসলে আরও শাস্তিমূলক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে।

তবে কোন পক্ষই এ ধরণের বিপজ্জনক সংঘাতের শঙ্কার বিষয়ে আগ্রহী হবে না। অবশ্য কেউ ভাবে না যে, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র, দুপক্ষই পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু করতে চায়।

আমেরিকানদের জন্য, পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি থাকা সত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে বিমান ও নৌ হামলা সব ধরনের বিপদ ডেকে আনবে।

এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, অনেক সময় অনেক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেও বিদেশে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ধৈর্যশীল ছিলেন। তার শাসনামলে সিরিয়ায় বিমান হামলা ছিলো মূলত প্রতীকী।

এখন শঙ্কা হচ্ছে, পরিস্থিতি না বুঝে হলেও, মার্কিন প্রশাসনে একটা শোরগোল তুলেছে ইরান যা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে উস্কে দিতে পারে।

আসল বিপদ হচ্ছে, পরিকল্পিত নয় বরং দুর্ঘটনা বশত যুদ্ধের সূচনা।

তেহরান ও ওয়াশিংটন দুপক্ষই সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দিলেও কেউই তা সঠিকভাবে গ্রহণ করছে না।

উদাহরণস্বরূপ, উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন অবকাঠামোকে হুমকি হিসেবে দেখতে পারে ইরান। আর নিজেদের দোরগোড়ায় এ ধরণের হুমকি কখনোই সহ্য করবে না তারা।

ধরা যাক, এই বার্তাকে ভুল ভাবে নিতে পারে ইরানের রেভ্যূলিউশনারি গার্ড কর্পস।

ছবির কপিরাইট ATTA KENARE
Image caption হরমুজ প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ

তারা ভাবতে পারে যে, উপসাগরের জলসীমায় মার্কিনীদের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা ভোগের অধিকার রয়েছে তাদের। যা মানে না আমেরিকানরা।

অন্য কথায় বলতে গেলে, তারা ভাবতে পারে যে, তাদেরকে "জোর করে খামে ঢুকানোর" চেষ্টা চলছে। যার জন্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের শাস্তি পেতেই হবে। এটা উদ্দেশ্যমূলক ও উদ্দেশ্যহীন যেকোনো ধরণের সংঘাত উস্কে দেয়ার রেসিপি। এগুলো খুবই খারাপ সময়।

জার্মানি আর ফ্রান্সের মতো ওয়াশিংটনের মিত্ররা এরইমধ্যে সাবধানতার আহ্বান জানিয়েছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে। তবে এক্ষেত্রে নিজের উপসংহার নিজে টানতে চায় তারা।

"আমরা আমাদের আলাদা মূল্যায়ন করবো, এ বিষয়ে আমাদের নিজেদের প্রক্রিয়া রয়েছে", বিবিসির টুডে অনুষ্ঠানকে বলেন জেরেমি হান্ট।

তিনি বলেন, "আমেরিকার মূল্যায়ন বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই। কারণ তারা আমাদের নিকটতম মিত্র।"

তবে যেকোনো পদক্ষেপ মিস্টার ট্রাম্পের হিসাব করেই নেয়া উচিত।

তিনি যখন প্রথমে ক্ষমতায় আসেন তখন হোয়াইট হাউসে অনেক এমনকি রিপাবলিকান বিদেশ নীতি বিশেষজ্ঞ ছিলেন যারা তার প্রশাসনের সাথে কাজ করতে চাননি। তাদের অভিযোগ, বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ট্রাম্পের মারাত্মক ও অনিশ্চিত পদ্ধতি সংকট ডেকে আনবে।

আর অনেক সময় মনে হয়েছে উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়ার সাথে সংকট তৈরি হবে। তবে শেষমেশ তা আর হয়নি।

এখন হোয়াইট হাউসের উপর নতুন করে সংকট আগত।

এর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী মারাত্মক প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে পরবে না বরং গালফ ও অন্যান্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী অংশীদার ও মিত্রদের উপর পরবে। যাদের অনেকেই জানেন না যে এই প্রেসিডেন্ট ও তার অনন্য কূটনৈতিক ধারার সাথে কিভাবে মানিয়ে নিতে হবে।