জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি: ব্যবহারে পুরুষের দায়িত্ব কতটা?

অনেক পুরুষ কনডম ব্যবহার করতে চান না। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption অনেক পুরুষ কনডম ব্যবহার করতে চান না।

বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব পদ্ধতি রয়েছে তার মধ্যে মোটে ৭ শতাংশ রয়েছে কনডমের ব্যবহার। দেশে যত ধরনের পদ্ধতি রয়েছে তার দুটি ছাড়া সবই নারীদের জন্য। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রচার প্রচারণাতেও নারীদেরই টার্গেট করা হচ্ছে।

কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দায়ভার কি শুধু নারীর?

বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের কতটা উৎসাহিত করা হচ্ছে?

পুরুষরা কি বলছেন?

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন কিনা বা কি ব্যবহার করেন? এরকম কিছু প্রশ্ন নিয়ে ঢাকায় আজ বেশ কিছু পুরুষদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম।

নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে চাইলেন না বেশিরভাগই। বনানী এলাকায় একজন গাড়ি চালকের সাথে কথা হচ্ছিলো।

তিনি বলছেন, "আমার ওয়াইফ তো ই খায়, কি যেনও বলে, বড়ি খায়। আর আমার কোন পদ্ধতি নাই। আমি কোন পদ্ধতি নেই নাই। আমার ওয়াইফই ব্যবহার করে।"

আরও কয়েকজনের সাথে কথা হচ্ছিলো। যাদের বেশিরভাগই বললেন জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের মুল দায়িত্ব নারীদেরই।

ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে সকলেই কিছুটা সংকোচ বোধ করছিলেন।

মুখের ভাব বা কণ্ঠ শুনলেই সেটি বোঝা যাচ্ছিলো। কেন নারীদের দায়িত্ব বেশি তার পরিষ্কার ব্যাখ্যাও তারা দিতে পারলেন না।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে ৭ শতাংশ রয়েছে কনডমের ব্যবহার।

একজন নারীর অভিজ্ঞতা

কিন্তু যে গুরুদায়িত্ব নারীরা পালন করছেন সে সম্পর্কে কথা বলছিলেন কিছুদিন আগে কপার টি ব্যাবহার শুরু করেছেন এমন একজন।

তিনি বলছেন, "এটা পরার সময় কষ্ট হয়। পরার পরে প্রতি পরিয়ডের সময় পেটে ব্যথা হয়। খুব বেশিই হয়। সেটা কমাতে আমার পেইন কিলার খেতে হয়। আগে ব্যথাটা এতটা ছিল না। আরেকটা যেটা হল পিরিয়ড চলাকালীন ব্লিডিংটা বেশি হয়।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নারীও। তিনি বলছেন, স্বামীর কনডম ব্যাবহারে অনিচ্ছার কারণেই তাকে কপার টি নিতে হয়েছে।

"বেশিরভাগ সময় কনডম পরতে চায়না বলেই আমার এই অবস্থা।

কিছু সময় আছে ব্যবহার করতে একটুও চাইবে না। কিছু সময় আমার কথা শুনে বাধ্য হয়।"

সরকারের পরিকল্পনা কি?

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের হিসেবে দেশে সক্ষম দম্পতিদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যাবহার করেন।

প্রজননের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

কিন্তু দেশে পাওয়া যায় এমন যেসব পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করেন দম্পতিরা তার দুটি ছাড়া সবই নারীদের জন্য। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আশরাফুন্নেসা বলছেন পুরুষদেরও এর দায়িত্ব নিতে হবে।

Image caption এসব হারই বলে দেয়া পরিবার পরিকল্পনা পুরুষদের অংশগ্রহণ কতটা।

তিনি বলছেন, "পরিবারে পুরুষ প্রধানকেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করা উচিৎ কারণ একজন নারী বাচ্চা বহন করে, বাচ্চা লালন পালন করে, ব্রেষ্ট ফিডিং করে। সে কিন্তু এসব ভূমিকা ইতিমধ্যেই পালন করছে। এখন জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যদি পুরুষরা এগিয়ে আসে তাহলে আমার মনে হয় নারী আরও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এবং কর্মক্ষেত্রেও কিন্তু নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যাবে।"

তিনি নিজেই বলছেন, "পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার কম। আমরা এখন জোর দিচ্ছি শুধু নারী নয়, নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও জন্মনিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে হবে।"

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যাবহারে পুরুষদের হার কতটা?

কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা কোন কিছুতেই তার কথার প্রতিফলন দেখা যায় না।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রচার প্রচারণাতেও নারীদেরই টার্গেট করা হচ্ছে।

আরো পড়ুন:

পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি: কেন আজও বাজারে আসেনি?

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে পুরুষদের ভাবনা

বাংলাদেশে কীভাবে বেড়েছে গড় আয়ু?

বাংলাদেশে বাড়ছে নারী প্রধান পরিবার

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য মতে বাংলাদেশে যেসব পদ্ধতি এখন ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো হল জন্ম বিরতিকরন খাবার বড়ি, কপার টি, জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকশন, লাইগেশন, চামড়ার নিচে বসিয়ে দেয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্যাপসুল, কনডম ও ভ্যাসেকটমি।

খাবার বড়ির ব্যবহার সবগুলো পদ্ধতির মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। ইনজেকশন ১১ শতাংশ।

সেই হিসেবে পুরুষদের জন্য মোটে দুটি যে পদ্ধতির তার মধ্যে কনডমের ব্যবহার হচ্ছে মোটে ৭ শতাংশ। পুরুষদের ভ্যাসেকটমির করার হার মোটে ১ শতাংশ। এসব হারই বলে দেয়া পরিবার পরিকল্পনা পুরুষদের অংশগ্রহণ কতটা।

Image caption পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আশরাফুন্নেসা বলছেন পুরুষদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।

নারীদের জন্য যেসব পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে

যেসব পদ্ধতি নারীদের জন্য রয়েছে তার অনেকগুলোরই রয়েছে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরই তার প্রচারণায় এসব পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকে।

যেমন কপার টি ব্যবহার করলে তলপেটে ব্যথা হতে পারে, নিয়মিত ফোটা ফোট রক্তস্রাব হতে পারে।

অনেক সময় প্রদাহ হতে পারে। চামড়ার নিচে বসিয়ে দেয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্যাপসুলে মাসিক অনিয়মিত অথবা উল্টো আবার রক্তস্রাব বেশি হতে পারে।

মাথা ব্যথা হতে পারে। ওজন বেড়ে যেতে পারে। ইনজেকশনেও একই ধরনের সমস্যা হয় ব্যবহারকারী নারীদের।

খাবার বড়ি হরমোনে প্রভাব ফেলে। মাসিকের পরিমাণ কমে যায়। যোনিপথ শুষ্ক হয়ে যায়।

এসব অসুবিধা সহ্য করেই নারীদের জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায়ভার বহন করতে হয়।

জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রচারণার সময় অসুবিধাগুলো কমই জানানো হয়। বরং সুবিধাগুলোর প্রচারণাই বেশি।

পুরুষদের কিভাবে এতে উৎসাহিত করা যায়?

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা, উবিনিগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আক্তার।

তিনি বলছেন সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় নিতিমালা দুটো ক্ষেত্রেই নারীকে এই দায়ভার দিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইদানীং কিছু পরিবর্তন হলেও বিশ্বব্যাপী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কার্যকারিতা ও নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গবেষণাও হয়েছে নারীর শরীর মাথায় রেখে।

Image caption ফরিদা আক্তার বলছেন সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় নিতিমালা দুটোতেই নারীকেই দায়ভার দিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ফরিদা আক্তার বলছেন, "আপনি যদি জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলো দেখেন কনডম এবং মেল স্টেরিলাইজেশন ছাড়া বাকি বড়ি থেকে শুরু করে, আইইউডি, ইনজেকটেবল ইমপ্ল্যান্ট সব কিন্তু মহিলাদের শরীরে করা হচ্ছে। পুরুষ যদি সন্তান চায় নারীকে দিতেই হবে। আবার সরকার বা রাষ্ট্র যখন ঠিক করে যে না সন্তান বেশি নেয়া যাবে না সেটাও নারীর শরীরেই একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বন্ধ করা হয়।"

তিনি আরও বলছেন, "নারীর শরীরেই সন্তান হয় ফরে নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই দিক থেকে চিন্তা করে যেহেতু কন্ট্রাসেপটিভ তৈরি হচ্ছে সেজন্যে এটি নারীর শরীর কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।"

তার মতে, "পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে নারীকে তারা শুধু সন্তান জন্মদানের একটা মেশিন হিসেবে ভাবলে চলবে না। সন্তান ধারণে নারী ও পুরুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমতা অর্জন করা। সেটি যদি হয় তাহলে পুরুষ অবশ্যই নিজ দায়িত্বে পদ্ধতি গ্রহণ করবেন।"

তিনি বলছেন, নারীকেই সে ব্যাপারে দায়িত্ব নিতে হবে এমন চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে।

অন্যান্য খবর:

কোহলির অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন সাচিন, সৌরভের

চিনিযুক্ত পানীয় কি ক্যান্সারের কারণ?

ব্রিটিশ ট্যাংকার 'আটকের চেষ্টা চালালো ইরান'