বিশ্বকাপ ক্রিকেট: ভারতে বেআইনি বাজি খেলায় শত কোটি ডলারের লেন-দেন হয় যেভাবে

ভারতের ক্রিকেট নিয়ে বেআইনি বাজি খেলায় হাত বদল হয় হাজার হাজার কোটি রুপি। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতের ক্রিকেট নিয়ে বেআইনি বাজি খেলায় হাত বদল হয় হাজার হাজার কোটি রুপি।

ভারতের যাদুকরী ব্যাটসম্যান এম এস ধোনি তখনো দৌড় শেষ করে অন্যপ্রান্তে পৌঁছাতে পারেননি। কিন্তু কয়েক সেন্টিমিটার বাকী থাকতে বল এসে সোজা হিট করলো স্ট্যাম্পে। সেই সঙ্গে উবে গেল ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

ধোনি যখন আউট হলেন, তখন কোটি কোটি ভারত সমর্থক চরম হতাশায় ভেঙ্গে পড়েছেন। কিন্তু একজন ভারতীয়ের উল্লাস তখন দেখার মতো।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল একটি রাজ্যের এই লোকটির নাম ধরা যাক আরিয়ান। কারণ তিনি তার আসল নাম প্রকাশ করতে চান না। তিনি একজন পেশাদার বাজিকর বা 'বুকি', ক্রিকেট খেলা নিয়ে বড় অংকের বাজি বা 'বেটিং'এর এক বেআইনি চক্র চালান।

তার যারা খদ্দের, তাদের বেশিরভাগই বাজি ধরেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত জিতবে বলে। এদের বেশিরভাগই স্থানীয় ব্যবসায়ী। কিন্তু তারা সবাই হেরেছেন।

আর তাদের দুর্ভাগ্য থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান আরিয়ান। সেদিন তার আয় ছিল ভারতীয় মূদ্রায় প্রায় পাঁচ লাখ রুপি বা সাত হাজার মার্কিন ডলার।

আরও দুজন বুকি বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে রাজী হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের অভিযানের মুখে তারা শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসে। শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেট টেলিফোন কলের মাধ্যমে একমাত্র আরিয়ানই কথা বলেছেন বিবিসির সঙ্গে।

ভারতে খেলা নিয়ে বাজি ধরা যদিও নিষিদ্ধ, কিন্তু অনেক রাজ্যেই এরকম বেটিং খুবই জনপ্রিয়। আরিয়ানের বয়স এখনো মাত্র বিশের কোঠায়, কিন্তু এই কাজ করছেন তিনি গত দশ বছর ধরে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট এই বুকিদের জন্য যেন রীতিমত একটি উৎসব। তবে আরিয়ান মনে করেন না, এই উৎসব খুব সহসা শেষ হয়ে যাবে।

তবে ধরা পড়ার আতংকে থাকতে হয় তাদের। তবে ধরা পড়লেও ছাড়াও পেয়ে যান তাড়াতাড়ি।

"আমরা সবসময় কয়েকদিনের মধ্যেই জামিন পেতে যেতে পারি। গত আইপিএলের সময় আমার কিছু বন্ধু ধরা পড়েছিল। কিন্তু তারা সবাই দশ-বারো দিনের মধ্যেই জামিন নিয়ে ফিরে আসলো, দ্বিগুণ উৎসাহে ব্যবসা শুরু করলো।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মোবাইল ফোনের অ্যাপেই এখন বেশি বাজি খেলা হয়।

আরিয়ান যেসব কথা বলেছেন, সে ব্যাপারে মুম্বাই পুলিশ বা ভারতের আইন মন্ত্রণালয় কোন মন্তব্য করতে চায়নি।

আরিয়ান জানান, তিনি কারও সুপারিশ ছাড়া কখনো কোন নতুন খদ্দের নেন না।

"এই ব্যবসা চলে আস্থা-বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। আপনার সঙ্গে যখন একজন মানুষের যোগাযোগ হয় এবং তার সঙ্গে আপনার লেন-দেন, অর্থবিনিময় হয় সততার ভিত্তিতে, তখন সেই লোক আপনাকে অন্য অনেক মানুষের কাছে সুপারিশ করবে।"

"ধীরে ধীরে আপনার একটা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। প্রথমে হয়তো পাঁচজন, তারপর দশজন, তারপর পনের... এভাবে আপনার একটা চেইন গড়ে উঠবে।"

আরিয়ান অবশ্য এখন পুরোপুরি অনলাইনে চালান তার ব্যবসা। নানা ধরণের মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করেন তিনি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে এখন নাকি ভারতে রীতিমত বাজি খেলার উৎসব চলছে।

অনলাইনে তার বাজির ব্যবসা চালানোর ফলে গড়পড়তা বাজির অংকটা অনেক কমে এসেছে। আগে যখন সামনাসামনি বাজি ধরা হতো, তখন সর্বোচ্চ দুই লাখ ডলারও বাজি ধরতেন অনেকে। কিন্তু এখন বাজির অংক কমে আসলেও ব্যবসা কিন্তু রমরমা।

ভারতের এই বেআইনি বাজির ব্যবসা কত বড় তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোন অনুমান করা কঠিন। কারও কারও মতে এটি সাড়ে চার হাজার কোটি ডলার থেকে শুরু করে পনের হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

কোন কোন রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ভারত যখন কোন ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলে, তখন উনিশ কোটি ডলারের বেশি লেন-দেন হয় বেআইনি বাজিতে।

তবে আসল অংকটা যাই হোক, এটা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই যে, ভারতে খেলাধূলা নিয়ে যে বাজি ধরা হয়, সেটা বিশ্বে সবচেয়ে বড় বাজির ব্যবসা। এমনকি ব্রিটেনের মতো দেশে, যেখানে খেলা নিয়ে বাজি ধরা আইনসিদ্ধ, তার চেয়েও বড়।

ভারতে যেহেতু বাজিকরদের কোন কর দিতে হয় না, তাই অনেকেই এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।

ভারতের কোন পেশাদার ক্রিকেটার বা খেলার সঙ্গে জড়িত ঘনিষ্ঠ কেউ কখনো তার সঙ্গে বাজি ধরেছে কীনা, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানালেন আরিয়ান।

তবে ভারতে আইপিএলে স্পট ফিক্সিং এর অভিযোগ অনেক দিনের। সেখানে যে এরকম অনেক কিছু ঘটছে, তার অনেক প্রমাণ আছে।

২০১৩ সালে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে এতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। মুম্বাই পুলিশ তখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্মকর্তার এক আত্মীয়কে গ্রেফতার করেছিল, যার সঙ্গে বুকিদের সম্পর্ক ছিল।

পরবর্তীকালে বিচারকদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি প্রমাণ পেয়েছিল যে আইপিএলে ম্যাচ ফিক্সিং এবং বেআইনি বাজি ধরায় জড়িত আইপিএলের অনেক কর্মকর্তা।

'স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া'র পরিচালনা পরিষদের একজন সদস্য সিদ্ধার্থ উপাধ্যায় মনে করেন বাজি যদি আইনসিদ্ধ করে দেয়া হয়, তখন সবকিছুই অনেক স্বচ্ছতার মধ্যে হবে।

"তখন সবাই জানবে কে বাজি খেলছে, কে খেলছে না", বলছেন তিনি।

আর এ থেকে সরকারও অনেক কর আদায় করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এর মধ্যে প্রায় নয়শো কোটি ডলার বাজি ধরা হয়ে গেছে।

সম্পর্কিত বিষয়