"লাখ লাখ ডলারের ব্যবসার কথা গোপন রেখেছিলাম আমি," বলছিলেন সফটওয়্যার ব্যবসায়ী মার্চিন ক্লেজনস্কি

মাত্র ১৪ বছর বয়সে অ্যান্টিভাইরাস তৈরি শুরু করেন মার্চিন ছবির কপিরাইট DARAGH MC SWEENEY/PROVISION
Image caption মাত্র ১৪ বছর বয়সে অ্যান্টিভাইরাস তৈরি শুরু করেন মার্চিন

বহু উদ্যোক্তারই জীবনে কিছু 'মুহূর্ত' আসে। আর সেই মুহূর্ত তাদের ভাবতে শেখায় যে তাদের বিশেষ কিছু করার আছে।

মার্চিন ক্লেজনস্কি-র ক্ষেত্রে এই সময়টি আসে যখন সে ছাত্র অবস্থাতেই অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়ার ব্যবসা নিয়ে কাজ করছে।

মার্চিন এর বয়স তখন ১৮, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়েই তার স্টার্ট-আপ কোম্পানি চালানোর ঝুঁকি নিয়েছিল।

২০০৮ এর শেষ দিকে তার কোম্পানি ম্যালওয়্যারবাইট-এর বয়স এক বছরেরও কম- তখনই সাইবার নিরাপত্তার জগতে সুনাম অর্জন করে ফেলে।

সে বলছিল, "আমি কিছু সত্যিকার সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম তখনকার সবশেষ কম্পিউটার ভাইরাসটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। হঠাৎই আমার কম্পিউটার স্ক্রিন সাদা একটি পৃষ্ঠা ভেসে আসে আর সেখানে বলা হয় যে, খারাপ কাজের জন্যে স্কুল নেটওয়ার্ক থেকে আমাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।"

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাধাগুলো কী?

অ্যালার্জির কারণে আজ আমি বিউটি ফার্মের মালিক

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিতেও সাহারা

ছবির কপিরাইট MARCIN KLECZYNSKI
Image caption শিক্ষার্থী থাকার সময়ে ইউনিভার্সিটিতে ব্রুমবল খেলার সময় বন্ধুর সাথে মার্চিন(বামে)

"বুঝলাম এটি ভাইরাসের আক্রমণ। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি হেল্প লাইনে যোগাযোগ করলাম। তারা আমার চেয়েও বয়সে ছোট একজনকে পাঠালো বিষয়টি ঠিক করার জন্যে। সে পুরো বিষয়টি দেখে জানালো যে, আমি বেশ ঝামেলাতেই পরেছি।"

এরপর ঠিক আমার সামনে বসেই সে আমার প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে গিয়ে ম্যালওয়্যারবাইট ডাউনলোড করলো।"

মার্চিন বলে চললো, "আমি তাকে কিছুই বলিনি। ছেলেটির পেছনে দাঁড়িয়ে দেখে গেলাম যে সে আমার সফটওয়্যার দিয়েই আমার কম্পিউটারের সমস্যা সমাধান করে দিলো। আমি তাকে জানতে দেইনি আমার পরিচয়। কিন্তু আমি আজ সেই মুহুর্তটিকে পছন্দ করি।"

২০১২ সালে মার্চিন ক্লেজনস্কি কম্পিউটার সায়েন্সে তার স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে। কয়েক বছরের মধ্যেই সে তার ম্যালওয়্যারবাইট-কে কয়েক মিলিয়ন ডলার উপার্জনকারী একটি ব্যবসায় উন্নীত করে।

বর্তমানে তার কোম্পানির বার্ষিক আয় ১২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর এর গ্রাহক ছড়িয়ে আছে পুরো বিশ্বব্যাপী।

ছবির কপিরাইট MALWAREBYTES
Image caption বর্তমানে ৭৫০ জন কর্মী রয়েছে ম্যালওয়্যারবাইট কোম্পানীতে

১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডে তার জন্ম। ৩ বছর বয়সে পরিবারের সাথে সে চলে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং শিকাগোতে বসবাস করতে থাকে।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে ২০০৮এর জানুয়ারি মাসে ম্যালওয়্যারবাইট চালু করে মার্চিন। আর তখন সেটি এত দ্রুত প্রসার লাভ করছিল যে সে ঠিক করেছিল সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন এটিকে ধীর গতির করে তুলবে। অবশ্য তার মায়ের চিন্তাভাবনা ছিল ভিন্ন।

"ব্যবসাটি এতটাই চালু হয়ে উঠছিল- আমি আমার মায়ের কাছে ভেঙ্গে বললাম যে, আমি আর পড়ালেখার জন্যে স্কুলে যেতে চাই না," বলছিল মার্চিন।

"তবে এর ১৫ সেকেন্ডের মাথায় ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে স্কুলের দিকে যেতে হয়েছিল।"

আসলে যেটি মার্চিন-এর মা কে সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলেছিল সেটি তার ব্যবসার অংশীদারকে নিয়ে। তার বয়স ছিল ৩৫ বছর যেখানে মার্চিন তখন মাত্র ১৭।

দীর্ঘ দিন ধরেই তারা কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি নিয়ে একসাথে কাজ করছিল। তার নাম ছিল ব্রুস হ্যারিসন।

মার্চিন এবং ব্রুসের মধ্যে তখন সামনা সামনি দেখা হয়নি। ব্রুস কম্পিউটার সারাইয়ের কাজ করতেন ম্যাসাচুসেটসে। আর মার্চিন শিকাগোতে। এমনকি ম্যালওয়্যারবাইট প্রতিষ্ঠার প্রথম ১২ মাসের মধ্যেও তাদের সাক্ষাত ঘটেনি।

ছবির কপিরাইট MARCIN KLECZYNSKI
Image caption মার্চিন একজন যোগ্য পাইলট আর অবসরে বিমান চালাতে পছন্দ করেন তিনি

আর আজও, ব্রুস যিনি প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের প্রধান, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। সেখানে মার্চিন থাকছেন সিলিকন ভ্যালিতে এর প্রধান কার্যালয়ে।

এ মুহূর্তে প্রতি মাসে ১৮৭ মিলিয়ন ভাইরাস স্ক্যান করে ম্যালওয়্যারবাইট। আর প্রতিদিন ২৪৭০০০ এর বেশি বার ডাউন লোড করা হয় এটি। অন্য অনেক অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানির মতোই এটি 'ফ্রিমিয়াম' ব্যবসা মডেলে চলে, যার অর্থ মূল সংস্করণ গ্রাহক পাবে বিনামূল্যে তবে সেটির আরো উন্নত সংস্করণের জন্যে পয়সা খরচ হবে।

যখন কোম্পানিটি খুব চমৎকারভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মার্চিন কিছু কঠিন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষালাভ করে। ২০১৪ সালে ব্যবসার সবচেয়ে খারাপ সময়টি আসে।

"আমরা একধরনের ভ্রান্তির মধ্যে ছিলাম, একটি ক্ষতিকর সফটওয়ার নিয়ে কাজ করছিলাম যেটি আসলে সেরকম ছিলনা," বলছিল সে।

"আমাদের ভুলে হাজার হাজার কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়। ৯১১ এর জরুরি সেন্টার বন্ধ হয়, হাসপাতালের কাজ বন্ধ হয়, সেটি আসলেই খুবই খারাপ অবস্থা ছিল। আর এমনটি প্রায় প্রতিটি অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানির ক্ষেত্রেই ঘটে। আর এরফলে প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কেননা আপনি আসলে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারেন।"

মার্চিন বলে যে, তারা এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়।

এখনো ২৯ বছর বয়সী মার্চিন তার এই কম বয়সকে সুবিধা বলেই মনে করে। কেননা সে অন্যসব তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জন্যে নিজেদের ব্যবসা শুরু করার জন্যে উৎসাহিত করতে পারে।