সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব কীভাবে বন্ধ করা যাবে

বাংলাদেশে এখন বহু মানুষের হাতে রয়েছে মোবাইল, ফলে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে যাওয়ার আশংকা এখন বেশি। (ফাইল চিত্র) ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে এখন বহু মানুষের হাতে রয়েছে মোবাইল, ফলে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে যাওয়ার আশংকা এখন বেশি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা তামান্না তানজিনা কয়েকদিন আগে দেখতে পান তার ফেসবুক পাতা জুড়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজের জন্য মানুষের মাথা লাগবে এমন ভুয়া খবরে সয়লাব।

শুরুতে বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব না দিলেও এই গুজবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনায় তিনি মনে করেন বিষয়টিতে সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

"আমার ফেসবুকে প্রথমে এরকম বেশ কয়েকটা ভুয়া পোস্ট দেখি। কিন্তু এরকম একটি বানোয়াট পোস্ট এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, আমি ভাবিনি। অবাক হয়ে দেখলাম আমার বাসার ড্রাইভার, গৃহপরিচারিকা সবাই এটাকে বিশ্বাস করছে।"

"যেভাবে এই গুজবটা ছড়িয়ে যাচ্ছে, তা এখনও থেমে যায়নি। এজন্য সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।" - বলেন মিস তানজিনা।

এ ধরণের গুজব শুধু বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে তা না। ভারতজুড়ে ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে গত তিন মাসে ১৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হন।

এই গুজবগুলো মূলত ছড়িয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। পরে ভারতীয় সরকার হোয়াটসঅ্যাপকে এ ধরণের গুজব প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে বলে।

কিন্তু জবাবে হোয়াটসঅ্যাপ বলেছিল, তাদের মেসেজিং সার্ভিস পুরোপুরি এনক্রিপটেড, কাজেই কে কাকে কোন বার্তা পাঠাচ্ছে সেটির মনিটরিং তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে ভারত এই অ্যাপের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় দেশটির সরকারের চাপের মুখে তারা কয়েকটি পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। যা গুজব নিয়ন্ত্রণে বড় ধরণের ভূমিকা রেখেছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। প্রতীকি ছবি।

বিবিসি বাংলার দিল্লির সংবাদদাতা শুভজ্যোতি ঘোষ বলছেন ভারতের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের চাপের মুখে হোয়াটস অ্যাপ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

"প্রথমত, কোন কন্টেন্ট ম্যাস ফরোয়ার্ড করা বা গণহারে একসঙ্গে অনেক মানুষকে পাঠানো বন্ধ করা হয়েছে। এখন একসঙ্গে একটি বার্তা পাঁচ জনের বেশি মানুষকে পাঠানো যাবেনা। এবং কোন মেসেজ আপনার কাছে ফরোয়ার্ডেড হয়ে এসেছে কিনা এখন সেটাও বোঝা যাবে। মানে যিনি আমাকে মেসেজটি পাঠিয়েছেন, তিনি সেটা নিজে লিখেছেন নাকি অন্য কারো লেখা ফরোয়ার্ড করেছেন। সেটা জানা যাবে। এই ব্যবস্থাগুলো মোটামুটি কাজে এসেছে। কেননা এখন গুজব ছড়ানোর হারও অনেকটাই কমে গেছে।"

এদিকে বাংলাদেশে হোয়াটস অ্যাপ তেমন একটা জনপ্রিয় না হলেও ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ফেসবুক আইডি, ইউটিউব লিংক ও অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের পুলিশের মহাপরিদর্শক জাভেদ পাটোয়ারি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগার গুজব কেন?

'গণপিটুনিতে নিহত ৮ জনের কেউই ছেলেধরা ছিল না'

বাংলাদেশের মানুষ কেন নির্মম হয়ে উঠছে?

এছাড়া এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুলোয় সেই সঙ্গে হাট-বাজার, বাস স্ট্যান্ড, লোকালয় বা জনসমাগম স্থানে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর কথাও জানান তিনি।

"সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরণের বিভ্রান্তিকর পোস্টের জেরে গত কয়েকদিনের সহিংস ঘটনায় ৮ জন নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা জন সচেতনতামূলক, প্রতিরোধমূলক ও আইনগত-এই তিন ধাপে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।"

"এরইমধ্যে আমরা সন্দেহজনক ৬০টি ফেসবুক আইডি, ২৫টি ইউটিউব লিংক এবং ১০টি নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দিয়েছি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুজব রটনাকারী অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।"

এর আগে বাংলাদেশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সরাসরি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে গুজব ঠেকানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

ছবির কপিরাইট MUNIR UZ ZAMAN
Image caption পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছে

তবে ফেক নিউজ ঠেকাতে এই পদ্ধতি বেশ সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছেন আইটি বিশেষজ্ঞ মিনহার মোহসিন। চাইলে তিনটি উপায়ে সহজেই এ ধরণের গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে বলে তিনি পরামর্শ দেন।

"সাধারণত গুজব গুলো ফেসবুক নিউজ ফিডে আর ইনবক্সের মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এখন যারা এসব জায়গায় পোস্ট শেয়ার করে, তারা হয়তো ম্যানুয়ালি ঘণ্টায় ১০ হাজার মানুষের কাছে একটা মেসেজ পাঠাতে পারছে।"

"এখন সেম পোস্টের কাউন্টার পোস্ট আমরা ভাইরাল করতে পারি ডিজিটাল মার্কেটিং মেথড ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে ঘণ্টায় ১ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব কিছু না। এর মাধ্যমে একটা ইনস্ট্যান্ট রেজাল্ট পাওয়া যায়।"

"দুই নম্বর উপায় হচ্ছে এ ধরণের গুজবের পোস্ট দেখলেই সেটা নিয়ে স্ট্যাটাস না লিখে সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করে দেয়া। যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে রিপোর্ট করবে তখন অটোমেটিকেলি ফেসবুক একটা ব্যবস্থা নেবে।"

আর "তৃতীয় উপায় হল প্রি ভাইরাল অ্যাওয়ারনেস। অর্থাৎ কোনটি গুজব আর কোন ধরণের পোস্ট শেয়ার করা যাবেনা। এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা খুব জরুরি।"

এমন গুজবে কান না দিতে সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি একটি বিবৃতি প্রকাশ সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব বলে সেখানে নিশ্চিত করা হয়।