অ্যালেক্সেই নাভালনি: বারবার গ্রেফতার হওয়ার পর এখন তিনি ভুগছেন অদ্ভুত এক অ্যালার্জির সমস্যায় - তার ব্যাপারে আর কি জানার আছে?

অ্যালেক্সেই নাভালনি। ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption শিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশিষ্ট সমালোচক অ্যালেক্সেই নাভালনি।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশিষ্ট সমালোচক, সরকার বিরোধী ব্যক্তিত্ব, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকর্মী অ্যালেক্সেই নাভালনিকে, মস্কো হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।

তার প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্ট থেকে জানা গেছে যে তিনি একটি তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ায় ভুগছিলেন।

যার কারণে তার মুখ ফুলে যায়, চোখ থেকে ক্রমাগত পানি পড়ছে, এছাড়া ঘাড়ে পিঠে, বুকে এবং কবজিতে প্রচুর র‍্যাশ হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে মস্কোতে শনিবারের বিক্ষোভের ডাক দেয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে অ্যালার্জি হলে তাকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

নাভালনির চিকিৎসক বলছেন, তার এমন শারীরিক অবস্থাকে শুধুমাত্র অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হিসেবে চিহ্নিত করা অযৌক্তিক। তিনি সন্দেহ করছেন যে নাভালনিকে হয়তো কোন "বিষাক্ত এজেন্ট"-এর সংস্পর্শে আনা হয়েছে।

এমন অবস্থায় নাভালনিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়ারও বিরোধিতা করেছেন তিনি।

কিন্তু নাভালনিকে এখন পুনরায় জেলে স্থানান্তর করা হবে।

স্থানীয় নির্বাচন থেকে বিরোধী প্রার্থীদের বর্জনের বিরুদ্ধে শনিবারের অনুমোদনহীন বিক্ষোভের ডাক দেয়ার কারণে গত সপ্তাহে নাভালনিকে ৩০ দিনের জন্য কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

এই ঘটনার জেরে এ পর্যন্ত ১৪০০জনকে আটকের খবর পাওয়া গেছে।

নাভালনি তার গ্রেফতারের দিন একটি ইন্সটাগ্রাম ভিডিও পোস্ট করে বলেন যে, যখন তিনি তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে জগিংয়ের জন্য এবং তার স্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে ফুল কিনতে বের হন, তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৪৩ বছর বয়সী এই আন্দোলনকর্মীকে এর আগেও অনেকবার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এই বিশিষ্ট সমালোচক ও বিরোধী ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে আর কী কী জানার আছে?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০১৭ সালের মার্চে মস্কোর একটি আদালতের আপিল শুনানিতে নাভালনি।

"চুরি এবং জালিয়াতি"

মিস্টার পুতিনের দলকে "জালিয়াতি ও চুরির" আখড়া বলে আখ্যা দিয়েছেন নাভালনি।

এই প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাকে "রাশিয়ার রক্তকে চুষে খাওয়ার" সঙ্গে তুলনা দেন তিনি।

এছাড়া তার ভাষ্যমতে যে "সামন্তবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়েছে তা ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন নাভালনি।

তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু তিনি সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। আর সেটা হল, ব্যালট বক্সে পুতিনকে চ্যালেঞ্জ করা।

২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর প্রার্থিতা কর্তৃপক্ষ বাতিল করে দিয়েছিল।

আরও পড়তে পারেন:

ভ্লাদিমির পুতিন: গোয়েন্দা থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট

সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মস্কোতে বিক্ষোভ

নাভালনি কি পুতিনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন?

কেননা সে সময় রাশিয়ার একটি আদালত তাকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে।

কিন্তু নাভালনি কঠোরভাবে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার অভিযোগ, পুতিনের বিরুদ্ধে তার কঠোর সমালোচনার কারণেই ক্রেমলিন প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে তাকে এমন আইনি প্যাচে ফেলেছে।

রাশিয়ার রাজনীতিতে একটি শক্তি হিসাবে নাভালনির উত্থান হয়েছিল ২০০৮ সালের শুরুর দিকে।

তখন তিনি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বড় বড় কর্পোরেশনের কথিত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ব্লগিং শুরু করেছিলেন।

তার কৌশলগুলির মধ্যে একটি ছিল প্রধান তেল সংস্থা, ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়গুলোর অংশীদার হয়ে রাষ্ট্রীয় আর্থিক অবস্থার ছিদ্রান্বেষণ করে অদ্ভুত সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা।

নিজ বার্তাগুলো প্রচারে নাভালনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতেন। যেটা তার রাজনৈতিক ধরণের অংশ।

এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি নবীনদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তীক্ষ্ণ ভাষা এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠার উপহাস তাকে এই পরিচিতি দেয়।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়ার জন্য কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন মিস্টার নাভালনি।

সরাসরি বিরোধীতা

দুর্নীতির বিরুদ্ধে মিস্টার নাভালনির প্রচারাভিযান শুরুতে কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে হলেও পরে সরাসরি ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়ার বিরুদ্ধে যায়।

২০১১ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে, তিনি কোন প্রার্থী হিসাবে যুদ্ধ করেননি, তিনি তার ব্লগের পাঠকদের ইউনাইটেড রাশিয়াকে বাদ দিয়ে যেকোনো দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সেখানে তিনি ইউনাইটেড রাশিয়াকে "জালিয়াতি ও চোরদের দল" বলে অভিহিত করেছিলেন।

কিন্তু সেবার ইউনাইটেড রাশিয়া নির্বাচনে জয়লাভ করে, কিন্তু আগের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না তারা।

এই বিজয়ের পেছনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে মস্কো এবং অন্য কিছু বড় শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

২০১৫ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রথম প্রতিবাদের পর ১৫ দিনের জন্য মিস্টার নাভালনিকে গ্রেফতার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ২৪ ডিসেম্বরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী সবচেয়ে বড় সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন, এতে ১ লাখ ২০ হাজার জন উপস্থিত ছিলেন।

মিস্টার পুতিন পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে পুন:নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং রাশিয়ার শক্তিশালী তদন্ত কমিটি নাভালনির অতীত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্ত শুরু করেন, এমনকি আইনজীবী হিসাবে তার প্রমাণাদি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

কিরভ শহরে জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে তাকে অল্প সময়ের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়। তখন তার বিরুদ্ধে দেয়া পাঁচ বছরের কারাদণ্ডকে রাজনৈতিক রায় হিসাবে দেখা হয়েছিল।

তবে অপ্রত্যাশিতভাবে মস্কো মেয়র নির্বাচনের প্রচারণার জন্য তাকে কারাগার থেকে বের হওয়ার অনুমোদন দেয়া হয়।

সেখানে তিনি ২৭% ভোট নিয়ে পুতিনের সহযোগী সের্গেই সোবিয়ানিনের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।

একে একটি নাটকীয় সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কেননা তার রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রবেশাধিকার ছিল না, কেবলমাত্র ইন্টারনেট এবং মুখের উপর নির্ভর করেই হয়েছে তার সব প্রচার প্রচারণা।

ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত রায় দেয় যে, নাভালনির সঙ্গে ন্যায্য বিচার করা হয়নি। এই ঘোষণার পর রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট নাভালনির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেয়।

তারপর, ২০১৭ সালে পুন:বিচারে, তাকে দ্বিতীয়বারের মতো দোষী সাব্যস্ত করে পুনরায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তিনি এই রায়কে প্রহসনমূলক দাবি করে বলেন, যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাকে প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়েছে।

ছবির কপিরাইট @Navalny
Image caption সবুজ রং ঢেলে হামলা চালানো হয় নাভালনির ওপর।

রং দিয়ে নির্যাতন

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে, নাভালনির মুখে অ্যান্টিসেপটিক সবুজ রঙ ছিটকে ফেলা হলে তাকে মস্কোর একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে এ ধরণের জেলোন্নাকা (ইংরেজিতে "উজ্জ্বল সবুজ")হামলা দ্বিতীয়বারের মতো হয়।

এই রং রাশিয়ার একটি প্রচলিত অ্যান্টিসেপটিক বা জীবাণুনাশক এবং ইউক্রেনের বিক্ষোভে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

"এটাকে হাস্যকর মনে হলেও এটির যন্ত্রণা নরকের মতো", মিঃ নাভালনি টুইট করেন।

এই হামলায় তার ডান চোখের রাসায়নিক দহনের শিকার হয়।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption নাভালনিকে তার প্রথম বিচার কাজের জন্য কিরভে পৌঁছাতে ১২ ঘণ্টা ট্রেন ভ্রমন করতে হয়েছিল।

বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি

সবচেয়ে সাম্প্রতিক গ্রেফতারের পর নাভালনির হঠাৎ এমন অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ খুঁজতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন ডাক্তাররা।

প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে তিনি তীব্র অ্যালার্জিক রিয়্যাকশনের শিকার হয়েছেন। যার ফলে তার মুখ ফুলে গেছে, চোখের সমস্যা হচ্ছে। আর সারা শরীরে র‍্যাশ উঠেছে।

তবে নাভালনির ব্যক্তিগত ডাক্তার রোববার জানান তিনি তিনি এর আগে কখনও এমন অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হননি।

তার ওপরে বিষাক্ত কোন উপাদান প্রয়োগের কারণে এমনটা হতে পারে বলে নাভালনির চিকিৎসক ধারণা করছেন।

নাভালনির মেডিকেল টিম জানান, তারা সোমবার নাভালনির সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন এবং তার চুল এবং টি-শার্টের নমুনা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেছেন।