বাংলাদেশের সমাজে বখাটেপনা দূর করতে ছেলেদের চুলের ছাঁট নিয়ন্ত্রণ কতোটা জরুরি

ছাঁট ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption দেশি বিদেশি তারকাদের অনুকরণে এখন অনেক তরুণই চুলে ফ্যাশনেবল ছাঁট দিয়ে থাকেন।

বখাটেপনা দূর করতে ছাত্র ও তরুণদের ফ্যাশনেবল চুল কাটা ও দাড়ি গোঁফ কামানোর ওপর সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা প্রশাসন।

গত সোমবার উপজেলার সব সেলুন ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক বৈঠকে বলা হয়, কেউ যদি এই নির্দেশ অমান্য করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এর আগে টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকার সাভার, মাগুরা এবং ঝালকাঠিতেও পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি না হলে নরসুন্দর কর্তৃপক্ষ এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

পর পর এমন কয়েকটি ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, চুল ছাঁটা নিয়ন্ত্রণ করলেই কি সমাজ থেকে বখাটেপনা দূর হয়ে যাবে? এ ধরণের নিয়ন্ত্রণ আরোপের এখতিয়ার কি পুলিশ বা প্রশাসনের আছে?

"বাংলাদেশ পুলিশ এমন নির্দেশ দেয়নি"

সবশেষ বাঘা উপজেলার নির্দেশনাটি ইউএনও-এর পক্ষ থেকে দেয়া হলেও বাকি সব নির্দেশনা এসেছে পুলিশের থেকে।

সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক সোহেল রানা বিবিসি বাংলাকে জানান যে সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি প্রচার মাধ্যমে তিনি এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হতে দেখেছেন।

সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে চুল-দাড়ি-গোঁফ ছাঁটার ব্যাপারে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ধরণের নির্দেশনা দেয়া হয়নি এবং এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই বলে জানান মি: রানা।

" কে কিভাবে চুল কাটবে এটা সম্পূর্ণ ওই ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। এ নিয়ে পুলিশের কিছু বলতে পারবেনা করতেও পারবেনা। যে নির্দেশনা এসেছে, সেগুলো কারও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়ে থাকতে পারে। আমরা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি", বলেন মিঃ রানা।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption চুলে কোন ফ্যাশনেবল ছাঁট দেয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় কড়া নির্দেশ জারি করা হয়

চুল-দাড়ি ছাঁটার ওপর যতো নির্দেশনা

ইভ টিজিং প্রতিরোধে ফ্যাশনেবল চুল-দাড়ি ছাটার ওপর নির্দেশনা প্রথম এসেছিল গত মার্চে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায়।

সেখানে স্টাইল করে চুল-দাড়ি কাটার ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান রেখে নোটিশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শীল সমিতি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হেয়ার স্টাইলের কোনও ক্যাটালগ দোকানে প্রদর্শনও করা যাবে না।

এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে উপজেলা শীল সমিতি পরে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল।

Image caption টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় নোটিশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শীল সমিতি।

অন্যদিকে জেলার সখিপুরে, স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্রদের এ ধরণের স্টাইলে চুল কাটা এবং চুলে রঙ না করার জন্য শীল সমিতির নেতাদের থানায় ডেকে সতর্ক করে পুলিশ।

সিলেটের কানাইঘাট বাজারের সেলুন ব্যবসায়ীদের নিয়ে এক বৈঠকে একই ধরণের নির্দেশনা দিয়ে পুলিশ বলে, কেউ তা অমান্য করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া ঝালকাঠি, ঢাকার সাভার এবং মাগুরা জেলা পুলিশও সেলুন মালিকদের বখাটে স্টাইলে চুল কাটা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে মাগুরায় মাইকিংও করা হয়।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পুলিশের জারি করা নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

চুল-দাড়ি-গোঁফের ছাঁট নিয়ন্ত্রণ করলেই সমাজে শৃঙ্খলা ফিরবে?

আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা যখন বিভিন্ন মহলে সমালোচিত তখন শুধু চুল-দাড়ির স্টাইলে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়টি আসলেও কতোটা আইনসঙ্গত, এমন প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনে।

আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন মনে করেন এ ধরণের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বেআইনী।

তিনি জানান, কারও ব্যক্তিগত চুল ও দাড়ির ছাঁটে কোন ধরণের নিষেধাজ্ঞা জারির কথা আইনে বলা নেই।

"বাংলাদেশের সংবিধানে, আইনে, বিধি-বিধান কোন কিছুতেই ব্যক্তির বেশ ভূষার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে কিছু বলা নেই। পুলিশ, প্রশাসন কাউকে এমন অধিকার দেয়া হয়নি। এটা যার যার স্বাধীনতা। এখানে বাধা দিতে গেলে সেটি হবে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। বরং ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে আইন আছে" বলেন মিসেস নাসরিন।

সমাজ থেকে বখাটেপনা দূর করতে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করার পাশাপাশি, নারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে জনসচেতনতা বাড়ানো, তরুণদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা, যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

"কে কিভাবে চুল কাটল দাড়ি কাটল সেটা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে না। বিষয়গুলোকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিকে মনোযোগ না দিয়ে আপনারা চুল দাড়ি কাটা নিয়ে বৈঠক করছেন। হঠাৎ একদিন চুল কেটে কেউ বখাটেপনা ছেড়ে দিয়েছে এমন তো হয়েছে কখনো?" এমন প্রশ্ন রাখেন মিসেস নাসরিন।

কোন ছেলে বা মেয়ের বয়স যদি ১৮ বছরের নীচে হয়, বা তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী অথবা কর্মচারি হন তাহলে তার চুলের ছাঁট বা পোশাক আশাক সেই প্রতিষ্ঠানের কোড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের এক অধ্যাপক।

এখানে পুলিশ বা প্রশাসনের কিছু করার এখতিয়ার নেই বলে তিনি যোগ করেন।

আরও পড়তে পারেন

জোর করে শিক্ষার্থীর চুল কেটে দিয়ে বিপদে শিক্ষিকা

টাক মাথায় চুল গজানোর নতুন ওষুধ আবিষ্কার?

লম্বা চুলদাড়ি, নীল চোখ - এই কি যীশুর আসল চেহারা?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন।

"আমার সাথে সে যা করলো, সেটা তো বখাটেপনাই"

রাজশাহীর বিনোদপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা, সুরাইয়া আক্তার শেলী তার এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, শুধুমাত্র চুল-দাড়ির স্টাইল আর পোশাক আশাক দিয়েই বখাটেদের পরিচয় নির্ণয় করা সম্ভব না।

"একদিন আমি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বাড়ি ফিরছিলাম। আমার পাশে একটা ছেলে বসা ছিল। সে শুধু গান গাচ্ছে, একটু পর পর কার সাথে ফোন করার নামে আমাকে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলতেসে। মানে খুবই বিরক্তিকর। কিন্তু তার বেশ-ভুষা বা হেয়ার কাটে বিসদৃশ কিছু নেই। কিন্তু আমার সাথে সে যা করলো, সেটা তো বখাটেপনাই", বলেন মিস শেলী।

বখাটেদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তি বা জেল-জরিমানার ব্যবস্থা না করে চুল ছাটার এমন সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অর্থহীন বলে মনে করেন তিনি।

"এগুলো স্টাইল যারা করে, তারাই ইভ টিজ করে"

রাজশাহী থানার ওসি নজরুল ইসলামের মতে, যেসব উঠতি বয়সী ছেলেদের চুল ফ্যাশন করে কাটা থাকে, তারাই স্কুল কলেজের ছাত্রীদের ইভ টিজ করে।

জেলা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমবে বলেও তিনি মনে করেন।

"অনেক ছেলেরা নিজেদের ধরণকে চেঞ্জ করে নেয়। আঁকাবাঁকা করে চুল-দাড়ি কেটে ঘোরাফেরা করে। একপাশে চুল নাই, আরেকপাশে চুল লম্বা। সাধারণত এগুলো স্টাইল যারা করে, তারাই ইভ টিজ করে। যারা বখাটে হয়, তাদের ধরণটা এরকম অড লুকিং হয়।"

সমাজের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে এবং এসব তরুণদের শৃঙ্খলায় ফেরাতে চুল ছাটার নির্দেশনাকে যৌক্তিক বলে দাবি করেন তিনি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption চুল ছাটা নিয়ে এ ধরণের নির্দেশনাকে যৌক্তিক বলে মনে করেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার ইউএনও।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন রেজা, যিনি এই নির্দেশনা জারির পাশাপাশি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন- তার দাবি হল, দেশি বিদেশি তারকাদের অনুকরণে চুল, দাড়ি ও গোঁফ কাটার বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

"কিছু উঠতি বয়সী ছেলেরা আছে তাদের উদ্ভট কিছু চুলের কাট দেখে অনেকেই বিব্রত হয়। এরাই পরে বখাটেপনা করে। এজন্য অনেক অভিভাবক শিক্ষক আমাকে অভিযোগ করেছেন যে ছেলেরা তাদের কথা শুনছে না। এজন্য আমি সেলুন মালিকদের সাথে কথা বললাম যে তারা সামাজিক কৃষ্টি কালচারের সাথে মিলেনা এমন কাট যেন না দেয়। স্বাভাবিক স্টাইলে যেন চুল কাটে।"

ফ্যাশন করে চুল কাটলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সেটা কেবল ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য বলা হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মিঃ রেজা।