পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় শাান্তিচুক্তির পর গঠিত ইউপিডিএফ দলটি যেভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলো

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বাচ্চা কোলে এক উপজাতীয় নারী। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সম্প্রতি কয়েকটি সহিংসতার ঘটনার পর পার্বত্য এলাকায় শান্তি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য যে সংগঠনটি সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটির নাম ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ।

নিরাপত্তা বাহিনীর কোন কোন সূত্রের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ হয়তো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে নতুবা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।

ওদিকে, ইউপিডিএফ-এর বক্তব্য তারা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে।

সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, সোমবার খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর সাথে 'গোলাগুলিতে' ইউপিডিএফ এর 'তিনজন সন্ত্রাসী' নিহত হয়েছে।

যদিও এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফ বলেছে, তাদের তিনজন সদস্যকে গ্রেফতারের পর ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে কোন গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করে সংগঠনটি।

ইউপিডিএফ-এর জন্ম হলো কেন?

পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতার মাধ্যমে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন ঢাকায় এক কনফারেন্সের মাধ্যমে ইউপিডিএফ-এর জন্ম হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বা সন্তু লারমাকে কোণঠাসা করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থনে ইউপিডিএফ-এর জন্ম হয়।

সন্তু লারমার দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির সমিতি থেকে তরুণদের একটি অংশ বের হয়ে ইউপিডিএফ গঠন করে।

পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থন নিয়ে এই সংগঠনটি বিকাশ লাভ করে।

ইউপিডিএফ যত বিস্তৃত হতে থাকে মি. লারমার প্রভাব-প্রতিপত্তি ততই কমতে থাকে।

আরো পড়ুন:

ধর্ষণ: ছেলেশিশুরা কি মেয়েশিশুদের চেয়ে নিরাপদ

এশিয়ার সমরখাতে কি মার্কিন একাধিপত্য শেষ?

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া যেসব সমস্যার কারণ

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে সবসময় স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইউপিডিএফ কতটা শক্তিশালী?

ইউপিডিএফ আত্মপ্রকাশের পর কুড়ি ২০ বছর পর্যন্ত একসাথে ছিল।

কিন্তু ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ইউপিডিএফ ভেঙ্গে যায়। তখন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আত্মপ্রকাশ করে।

নতুন সংগঠন গঠনকারীরা বলছেন, ইউপিডিএফ-এ গণতন্ত্রের চর্চা নেই বলে তারা নতুন সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সূত্র বলছে, পার্বত্য এলাকায় ইউপিডিএফ-এর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছিল।

শান্তিচুক্তির পরে পাহাড়িদের তরুণ প্রজন্মের উপর বেশ প্রভাব সৃষ্টি করে ইউপিডিএফ।

এর ফলে পার্বত্য এলাকার প্রত্যন্ত জায়গায় সংগঠনটির শক্ত অবস্থান গড়ে উঠে।

এই সংগঠনটি নিজেদেরকে বাম ধারায় উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পার্বত্য এলাকার যেসব শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে তাদের মধ্যেও ইউপিডিএফ-এর সমর্থক রয়েছে বলে জানা যায়।

পার্বত্য এলাকার পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০ বছর আগে ইউপিডিএফ সংগঠনটি নিরাপত্তা বাহিনীর ছত্রছায়ায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

এখন তারা এতোটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে তাদের শক্তি খর্ব করার জন্য ইউপিডিএফ-এর মধ্যে বিভক্তি আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নিরাপত্তা বাহিনী।

এমনটাই বলছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।

যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, এখানে শক্তি খর্ব করার কোন প্রশ্ন নেই। নিরাপত্তা বাহিনী শুধু অপরাধ দমনের জন্য কাজ করছে।

সোমবার সেনাবাহিনীর সাথে 'গোলাগুলিতে' যে তিনজন নিহত হয়েছে তারা ইউপিডিএফ-এর পুরনো অংশ, অর্থাৎ প্রসীত বিকাশ খিসার অনুসারী।

পার্বত্য এলাকার তিনটি জেলা - রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবনে ইউপিডিএফ-এর জোরালো অবস্থান রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ-এর অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী।

অন্যদিকে বান্দরবানে সন্তু লারমার জেএসএস শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া রাঙামাটিতে উভয় পক্ষের সমান-সমান অবস্থান।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption সোমবারের ঘটনায় সেনাবাহিনী তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করেছে। (ফাইল ফটো)

ইউপিডিএফ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীরগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি কী?

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ইউপিডিএফ-এর মূল ধারাটির সাথেই নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বন্দ্ব।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পার্বত্য এলাকায় পাহাড়িদের সংগঠনগুলো যেমন বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়েছে তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সেখানে 'ডিভাইড এন্ড রুল' নীতি গ্রহণ করেছে।

বান্দরবানের সাংবাদিক সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া বলেন, পাহাড়ে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে সাধারণত সেগুলোর বিচার হতে দেখা যায়না।

"শান্তিচুক্তির পরে পাহাড়ে প্রায় ৬০০'র মতো হত্যাকাণ্ড হয়েছে। একটা মার্ডার হলে এরপর আরেকটা মার্ডার হয়," বলছিলেন মি: বড়ুয়া।

নিরাপত্তা বাহিনীগুলো মনে করে, প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর থেকেই ইউপিডিএফ-এর কিছু নেতা-কর্মী রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে এসে অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পরে। দিনকে দিন শক্তিশালী হয়ে উঠে সংগঠনটি।

নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্রমতে, ইউপিডিএফ-এর একটি অংশের হাতে অস্ত্র মজুদ রয়েছে। ফলে তারা পাহাড়ে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছে।

এই অংশটির হাত থেকে অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব না হলে পার্বত্য এলাকায় বড় ধরণের অস্থিরতা তৈরি হবে বলে মনে করেন বাহিনীর কোন কোন কর্মকর্তা।

সেজন্য সাম্প্রতিক সময়ে ইউপিডিএফ-এর বিরুদ্ধে বেশ শক্ত অবস্থান নেয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।

কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার চায় ইউপিডিএফ যেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এরই মধ্যে ইউপিডিএফ-এর একটি অংশ মূল রাজনৈতিক ধারায় ফিরে এসেছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করছেন।

তবে ইউপিডিএফ এর খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাদের ওপর রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চলছে।