ইরান-বাংলাদেশ সম্পর্ক: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কতটা প্রভাব ফেলেছে?

বাংলাদেশ ও ইরানের জাতীয় পতাকা
Image caption বাংলাদেশ ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ব্যবসা বাণিজ্য অনেক কম হচ্ছে

বাংলাদেশের ঢাকায় একটি সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য আজ ঢাকায় আসছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।

তিনি ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোর সহযোগিতা সংস্থা 'ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওরা) সম্মেলনে যোগ দেবেন।

সম্মেলনে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া, মরিশাস, মাদাগাস্কার, কেনিয়াসহ ২২টি দেশের মন্ত্রীরা অংশ নেবেন।

এমন একটা সময়ে তার এই সফর হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের কারণে ইরান চাপের মধ্যে রয়েছে।

এর মধ্যেই দেশটির নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ইউরোপীয় দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছে।

যদিও ২০১৩ সালে পাঁচ পরাশক্তির সঙ্গে পরমাণু চুক্তির পরে আশা করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরো বাড়বে।

পরবর্তীতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সেসব চুক্তি আটকে গেছে।

আরো পড়ুন:

'তিন শত্রু'র সাথে কীভাবে সুসম্পর্ক রাখছে চীন?

ইরানে মার্কিন হামলার পরিণতি কী হতে পারে?

সস্তা ইরানি তেল না কি ট্রাম্প? উভয় সঙ্কটে দিল্লি

ইরানকে ঘিরে মার্কিন যুদ্ধ প্রস্তুতি- উদ্দেশ্য কী

ছবির কপিরাইট Reuters
Image caption ঢাকায় একটি সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য আজ ঢাকায় আসছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।

ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক

বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও এবং গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের আসা-যাওয়ার বাইরে সম্পর্ক খুব বেশি এগোয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের মৌলিক দ্বন্দ্ব নেই, বরং খুব ভালো সম্পর্ক আছে বলা যেতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক আরো এগোতে গেলে বাংলাদেশকে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

''ইরানের ইস্যুতে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র আর সৌদি আরবের মতো দেশ আছে, অন্যদিকে আছে চীন বা ভারতের ইস্যুটিও। বাংলাদেশকে এসব জোট বা ভূরাজনৈতিক বিষয় বিবেচনায় রেখেই অবস্থান নিতে হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী, সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে।''

অধ্যাপক ইয়াসমিন বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ঘণিষ্ঠ রাখতে হবে, বাংলাদেশেও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের শ্রম বাজার, অর্থনৈতিক সহায়তাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

''ফলে যত ভালো সম্পর্কই থাকুক না কেন, ইরানকে পুরোপুরি বা সরাসরি সমর্থন দেয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে না।''

আরেকজন বিশ্লেষক আমেনা মহসীন বলছেন, ''কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈরিতায় বাংলাদেশ কারো পক্ষই হয়তো নেবে না। বাংলাদেশ চাইবে না কারো সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ করতে। ''

ফলে বাংলাদেশ যেমন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা কোন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেতে চাইবে না, তেমনি আবার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতেও চাইবে না বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (বিস) চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বিবিসিকে বলছেন, ''দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে কোন সমস্যা নেই, তবে সেটা অনেকদিন ধরেই একটু স্তিমিত অবস্থায় আছে।''

''আন্তর্জাতিক নানা কারণে ইরানও সেটা বুঝতে পারে। তারাও নিশ্চয়ই আমাদের কাছে সেরকম কিছু এই মুহূর্তে আশা করছে না।''

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে সেনা প্রশিক্ষণ বদলে দিয়েছে

'শাড়ি' নিয়ে লেখা, সামাজিক মাধ্যমে তুলকালাম

৬১৭৪: সংখ্যাটি যে কারণে এত রহস্যময়

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বিরোধের জেরে প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অনেক দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর

ব্যবসা-বাণিজ্য শূন্যের কোঠায়

বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআই বলছে, পরমাণু চুক্তি হওয়ার ইরানের সাথে বাংলাদেশের অনেক বাণিজ্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু নতুন বিরোধে সেসব স্থগিত হয়ে গেছে।

সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোঃ মুনতাকিম আশরাফ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধ শুরু হওয়ার পর সেদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সবরকম ব্যবসা বাণিজ্য স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে চটিয়ে নিজেদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে কেউ চায় না।''

২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ইরানে ১৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও কোন পণ্য আমদানি হয়নি। অথচ ২০১১ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৭ মিলিয়ন ডলার আর আমদানির পরিমাণ ছিল ৬৩ মিলিয়ন ডলার।

মি. আশরাফ জানান, ইরান পরমাণু চুক্তি হওয়ার বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইরানের কিছু চুক্তি হয়েছিল। তখন দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার তৈরির একটি কনসোর্টিয়াম তৈরির সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু এই বিরোধ শুরু হওয়ার পর সেগুলোর কাজ আর এগোয়নি।

''ইরানে এলপিজির দাম অনেক কম। বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকে যে দরে এলপিজি গ্যাস কেনে, ইরানে তার অর্ধেক দামে কেনা যায়। তেলের খরচও কম পড়ে। তারপরেও সেখান থেকে আর কেনা যাচ্ছে না।''

সরকারের তরফ থেকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর সরাসরি কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীরাও নিজেরা কোন ঝুঁকি নিতে চান না বলে তিনি জানান।

কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ''যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য অনেক বেশি রপ্তানি হয়। সুতরাং ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে সেটাকে ঝুঁকিতে ফেলতে চান না ব্যবসায়ীরা।''

তবে সরাসরি বাণিজ্য না হলেও, রাশিয়ার মতো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কিছু কিছু পরোক্ষ লেনদেন হতে পারে বলে তিনি ধারণা করেন।

এফবিসিসিআই সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ইরানে পাট, পাটজাত দ্রব্য, পেপার, অপটিক্যাল বা সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট, নিটওয়্যার, কেমিক্যাল সামগ্রী, ওভেন, ওষুধ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রপ্তানি হতো।

আর আমদানি করা হতো তরল পাল্প, অর্গানিক রাসায়নিক, তুলা, কোকোয়া ইত্যাদি।