নারীদের শরীর ও মনের প্রশান্তি: ঢাকায় সুযোগ কতটা আছে?

নারী ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকার নারীরা নিজেদের ওয়েলনেস বা ভাল থাকার পেছনে তেমন একটা সময় ব্যয় করতে পারেননা।

শারীরিক সুস্থতার প্রতি আমাদের স্বভাবজাত সচেতনতা থাকলেও, মানসিকভাবে ভাল থাকা বা ওয়েলনেসের দিকটি অধিকাংশ সময় থাকে অবহেলিত। আর ঢাকায় শুধুমাত্র নারীদের এ ধরণের ওয়েলনেসের সুযোগ আরও সীমিত।

তবে নিজেকে ফুরফুরে ও সতেজ রাখার স্পৃহা থেকে এখন অনেক নারী নিজের ওয়েলনেসকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করছেন।

সেক্ষেত্রে কেউ বেছে নিয়েছেন যোগব্যায়াম, কেউ যাচ্ছেন বিউটি পার্লার বা ফিটনেস সেন্টারে। কেউবা আবার যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন কর্মশালায় শখের প্রিয় কাজটি শিখতে।

Image caption কর্মশালার ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

দৈনন্দিন জীবন থেকে পালানোর সুযোগ:

ঢাকার নিকেতনে রূপসজ্জা এবং ফিটনেস নিয়ে দিনব্যাপী কর্মশালায় গিয়ে চোখে পড়ে, সেখানে বিভিন্ন বয়সী ৪০ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করছেন, যাদের সবাই নারী।

কেউ এসেছেন পেশাদারিত্বকে ঝালিয়ে নিতে আবার কেউ এসেছেন নিজেদের একান্ত আগ্রহ এবং ভালোলাগা থেকে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ফাতেমা-তুজ-জোহরার আগ্রহের একটা বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে বিউটি ও ফিটনেস। তাই এখানে আসার সুযোগ পেয়ে তিনি কোনভাবেই সেটা হাতছাড়া করতে চাননি।

"অন্যান্য সময় আমি অফিস ধরতে সাড়ে ৮টায় ঘুম থেকে উঠতাম। অথচ এখানে ট্রেনিং নিতে আমি ৭টার দিকে উঠে বসে থাকি। খালি মনে হয়, আর যাই হোক ক্লাসের কিছু মিস করা যাবেনা। এটা আমার জন্য একটা স্বাধীনতা বা রেগুলার লাইফ থেকে পালানোর সুযোগ। যেখানে কারও জাজমেন্টের কোন সুযোগ নাই। খুব ভাল লাগে।"

গৃহিণী সুপ্রভা সাহাও সখের কাজটি শেখার সুযোগ পেয়ে এখানে ছুটে এসেছেন।

"আমার এই মেকআপ, ফিটনেসে অনেক আগ্রহ। এতদিন এসব কাজের জন্য পার্লারে যেতে হয়েছে। এখন আমি নিজেকে নিজে তৈরি করতে পারছি। এটা অনেক আনন্দের একটা ব্যাপার। সারাদিন তো ঘর-সংসার, স্বামী, বাচ্চাকাচ্চাদের সামলাতেই চলে যায়। কিন্তু নিজের প্রিয় কাজটা করতে পেরে শিখতে পেরে মনে-হচ্ছে আমি পরিপূর্ণ।"

Image caption গৃহিণী সুপ্রভা সাহাও সখের কাজটি শিখতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

ক্লাসরুমের বাইরে আরেকটি কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। সবাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সামনে রাখা নানা ধরণের মেকআপ পণ্য ব্যবহার করে সাজছেন।

চেষ্টা করছেন এতদিন যা শিখেছেন তা নিজে নিজে অনুশীলন করার। আর তাদেরকে নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করছেন প্রশিক্ষকরা।

প্রতিবছর এমন কয়েকশ নারীকে প্রশিক্ষণ দেন রূপসজ্জা বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভিন। ফিটনেস, রূপসজ্জা নিয়ে নারীদের ব্যাপক আগ্রহের কারণেই এ ধরণের কর্মশালা আয়োজন করা কথা জানান তিনি।

"যেখানে একটা প্রোগ্রাম প্রফেশনাল কাজ শেখানো হয়। সেখানে সেইম ট্রেনিংটা একটা মেয়ে পার্সোনালি শিখতে আসছে। প্রবল ইচ্ছা থেকেই তারা এখানে আসছে। আর মেয়েরা তো নিজেদের ভাল লাগার জন্য কিছু পায়না। এখানে ওরা আসছে, একজন আরেকজনের সাথে টাইমপাস করছে, সাথে সাথে শিখছে। এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন নারী তার এই প্রিয় কাজ করার মাধ্যমে নিজেকে খুঁজে পায়।"- বলেন মিসেস পারভিন।

ছবির কপিরাইট ইয়োগানিকার ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া
Image caption আনিকা রাব্বানি

যোগে মনযোগ

ঢাকায় মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চ মধ্যবিত্ত নারীদের মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার মতো তেমন কোন জায়গা নেই।

আবার সারাদিন কর্মব্যস্ততার মধ্যে অনেক নারীর পক্ষে নিজের জন্য আলাদা করে সময়টুকু বের করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা।

তাছাড়া শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নারীর মনের প্রশান্তির প্রয়োজনীয়তা সমাজে এখনও উপেক্ষিত থেকে গেছে বলে মনে করেন ফিটনেস বিশেষজ্ঞ আনিকা রাব্বানি।

"আমাদের ঢাকার নারীরা একদমই সুবিধাবঞ্চিত। সুবিধাবঞ্চিত এই সেন্সে যে নারীরা কখনও নিজেকে টেককেয়ার করার কথাটা সেভাবে ভাবছেনা। নারীদের সেলফ এক্সপ্রেশনের জায়গাটাও খুব কম। ছোটবেলা থেকে তাদের বলা হয় যে ' ইউ আর নট এনাফ'- এটাও এক ধরণের ট্রমা। তখন আমি নারীদের জন্য একটা স্পেস তৈরি করতে চাইলাম। যেখানে নারীদের একটা কমিউনিটি তৈরি করা যায়, তাদের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হয়।"

ছবির কপিরাইট ইয়োগানিকার ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া
Image caption ইয়োগানিকা সেন্টারে যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আনিকা রাব্বানি।

মিস রাব্বানি নারীদের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির চাহিদা মাথায় রেখে ঢাকায় যোগব্যায়ামের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলেন।

যেখানে প্রতিদিন যোগব্যায়াম শিখতে আসেন বিভিন্ন বয়সী নারী। তার এখানে কেবল শরীরকে সুস্থ রাখতে আসেন তা নয় বরং মনকে রিচার্জ করে নেয়াও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তিনি বলেন, "যোগ ব্যায়ামটা হল মন, শরীর এবং আত্মার একটা সংযোগ। এটা ঠিকভাবে শিখতে সাধনার প্রয়োজন। এর যেমন শারীরিক প্রভাব আছে তেমনি আছে মানসিক প্রভাব। আমাদের যতো ট্রমা, মানসিক চাপ, বাজে অভিজ্ঞতা আছে তার সবকিছু আমাদের মাসেলে জমে থাকে। যখন আমরা যোগ ব্যায়াম করি, তখন ওই মাসলগুলো শিথিল হয়ে যায়। এতে নারীরা মানসিকভাবে হালকা বোধ করেন, শান্তি পান। এভাবে তারা ক্ষমা করত শিখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পান।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বডি ম্যাসাজ।

ওয়েলনেস সেন্টার

এমন যোগ ব্যায়াম কেন্দ্রের পাশাপাশি আজকাল ঢাকার নারীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দেশি বিদেশি বিভিন্ন ওয়েলনেস সেন্টার।

যেখানে নারীদের সৌন্দর্য ও ফিটনেসসহ আরও নানা বিষয়ে সেবা দিয়ে থাকেন পেশাদার চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, ফিজিও থেরাপিস্ট এবং প্রসাধন বিশেষজ্ঞ।

মনকে শিথিল রাখার পাশাপাশি কর্মোদ্দীপনা বাড়াতে এখন বিভিন্ন বয়সীরা এই সেবাগুলো নিয়ে থাকেন বলে জানান ভিএলসিসি সেন্টারের থেরাপিস্ট রেজওয়ানা তিনা।

"নারীরা মূলত ফিট থাকার জন্য, প্রেজেন্টেবল হওয়ার জন্য নিজেদের মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশনের জন্য এখানে আসেন। ব্যাপারটা শুধু ফিজিক্যাল না, বরং মেন্টালও। শুরুতে অনেক ক্লায়েন্ট থাকে যারা মেন্টালি স্ট্রেসড থাকে, এগ্রেসিভ থাকে। আমরা তখন তাদের মেন্টাল কাউন্সেলিং করাই। যেটা তাদের মনকে সতেজ করে দেয়। সে বোঝে যে এই সময়টা শুধু নিজের জন্য।" বলেন মিসেস তিনা।

Image caption "ফিটনেস ব্যাপারটা শুধু শারীরিক নয়, বরং মানসিকও"- রেজওয়ানা তিনা।

বিউটি স্যালুন

তবে ঢাকার নারীদের কাছে রিফ্রেশমেন্টের জন্য এখনও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় বিউটি স্যালুনগুলো।

আর আজকাল এই বিউটি স্যালুনগুলো তাদের নিয়মিত সেবার পাশাপাশি যুক্ত করেছে আরও নানা অনুষঙ্গ। তারমধ্যে রয়েছে ম্যাসাজ ট্রিটমেন্ট এবং স্পা, অ্যারোমা থেরাপিসহ আরও নানা কিছু।

ঢাকার বনানীর একটি স্যালুনে ম্যাসাজ ট্রিটমেন্ট নিতে এসেছিলেন সাবেরা খান। নিজের ভাল লাগার কাজ করাকে খুব জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

"আমার নিজের খেয়াল রাখতে ভাল লাগে। কারণ যখন আমি নিজের টেককেয়ার করছি, এটা অনেকটাই সেলফ লাভ, সেলফ কেয়ার। স্পা-টা অনেক রিল্যাক্সিং। স্ট্রেস একদম ঝটপাট চলে যায়। এতে আমার কাজের গতি বাড়ে। মনে হয় যেন রিচার্জ হয়ে যাই।"- বলেন মিস খান।

নিজের প্রতি ভালবাসা থেকে নারীরা নিয়মিত স্যালুনগুলোয় ভিড় করেন বলে জানান রেড-এর তত্ত্বাবধায়ক তাহমিনা সুলতানা।

ম্যাসাজ এবং স্পাতে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ম্যাসাজ করা হয় বলে অল্প সময়ের মধ্যে ক্লান্তি ও অবসাদ দূর যায় বলে জানান তিনি।

"সৌন্দর্য কিন্তু শুধু মানুষকে দেখানোর জন্য না এটা নারীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। নিজের যতটুকু আছে সেটাকে কেউ যদি পরিপাটি করে রাখেন ও হাসিখুশি থাকেন, এতে তো আমি কোন সমস্যা দেখিনা। এখানে নারীরা নিজের জন্য কিছু করতে আসে। আর সার্ভিস নেয়ার পর খুশি মনে বের হয়ে যায়। তাদের আত্মবিশ্বাসও অনেক চাঙ্গা থাকে।"

Image caption গত দুই বছরে কয়েকশ নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন আফরাজা পারভিন।

ওয়েলনেস কতোটা জরুরি

নারীদের এই মানসিক প্রশান্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন মনরোগবিদরাও। তাদের মতে, কাজের সাথে অবসাদটা খুব নিবিড় ভাবেই জড়িত।

ড. মেখলা সরকার জানান, একই রকম কাজ বারবার করতে অবসাদ একঘেঁয়েমি আসবেই। যা কাজ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই কেবল শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য নয় বরং মন থেকে ভাল লাগার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কিছু করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

"শরীর আর মন হচ্ছে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। মানসিকভাবে যদি একজন সম্পূর্ণ ভাল না থাকেন, এখানে মানসিক অবস্থা বলতে কোন রোগ বোঝাচ্ছিনা, এটা বলতে বোঝাচ্ছি ভাল থাকাকে। এই ভাললাগার ব্যাপারটি যদি না থাকে তাহলে এটা পারস্পরিক সম্পর্ক এবং উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।"

মিসেস সরকার বলেন, "তার যে কর্মক্ষেত্র, সেটা হোক অফিস বা ঘর-সংসার, সেখানে তার কাজ যতোটা ভাল হতে পারতো ততোটা ভাল হবেনা। অর্থাৎ মনের ভাল থাকা না থাকা আমাদের সার্বিক গুনগত জীবন যাপনের ওপর প্রভাব ফেলে।"

Image caption রূপসজ্জা।

ঢাকাতে নারীদের ওয়েলনেসের সুযোগ

নারীদের ওয়েলনেসকে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট, ব্লগ এবং ভ্লগ থেকে।

সেখানে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেকোনো সাহায্যের জন্য রয়েছে ২৪/৭ এর হেল্পলাইন নম্বর, ক্লিনিকাল পরামর্শ সেবা, বিনামূল্যের কর্মশালাসহ আরও নানা সুযোগ সুবিধা।

এমনকি পাশের দেশ ভারতেও নারীদের এই ওয়েলনেসকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সরকারি বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান।

ঢাকাতে এখনও এমন সুযোগ কেন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি?

সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ সাদেকা হালিম বলছেন, নারীদের নিজেদের মধ্যে কোন উপলব্ধি না থাকায় তাদের ওয়েলনেস উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

আরও পড়তে পারেন:

প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে মানুষ কতোটা সচেতন

ভারতে ঋতুমতী নারীরা কেন জরায়ু ফেলে দিচ্ছেন?

পিরিয়ডের সময় স্যানিটারি প্যাডের বিকল্প কী আছে বাজারে?

তিনি বলেন, "ঢাকায় উচ্চবিত্ত নারীদের ওয়েলনেসের সুযোগ থাকলেও মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য তেমন কিছুই নেই। তারা বাইরে গেলে জাজমেন্টের শিকার হয়। আসলে নারীদের নিজেদের মধ্যেই উপলব্ধি নেই যে তার একটা মনস্তাত্ত্বিক জগত আছে। আমরা নারীকে তার প্রয়োজনীয়তা শিখতে দিইনি।"

"আবার গৃহিণী থেকে শুরু করে ওয়ার্কিং ওমেন, সংসারের সব কাজ ওই এক নারীকেই সামলাতে হয়। এরমধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন তো আছেই। এমন অনেক প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীর প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছেনা"

তবে এখনকার নারীরা নিজেদের ব্যাপারে আগের চাইতে কিছুটা হলেও সচেতন এবং যত্নশীল হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা। আ

গে নারীরা শুধুমাত্র শারীরিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিলেও এখন তারা মানসিক সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভাবতে শুরু করেছেন।