নারীবাদ-বিরোধী আফগান শহরে সাহসী এক নারীর রেডিওতে নারী অধিকারের প্রচার ও ক্রুদ্ধ তালেবান

Sediqa Sherzai
Image caption সেদিকা সেরযাই

আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকায় বহুদিন ধরে প্রচলিত রীতি হল সেখানে ঘরের বাইরে নারী ও মেয়েদের খুব একটা দেখা বা শোনা যায় না।

আপনি হয়তো প্রত্যাশাই করতে পারবেন না যে, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় কুন্দুজ শহরে মেয়েদের পরিচালিত কোনও রেডিও স্টেশনে মেয়েদের অধিকারের বিষয়ে প্রচার করা হবে।

কিন্তু রেডিও রোশনি অবিকল সেটাই এবং এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক সেদিকা শেরযাইকে হত্যার জন্য তালেবানদের একাধিকবার চেষ্টার পরও তা আজও সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

পুরুষদের আধিপত্য এবং রেডিও রোশনি

পুরুষদের আধিপত্যময় জগতে রোশনি সম্প্রচারিত হচ্ছে।

অদ্ভুতভাবে বহু পুরুষ আসলে তাদের (মেয়েদের) নিজেদের সম্পত্তি মনে করে। এই ধরনের মনোভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই ২০০৮ সালে সেদিকা রেডিও রোশনি চালু করেন কিন্তু বিষয়টি তাকে দ্রুত তালেবানের শত্রুতে পরিণত করলো।

যদিও তারা সরকারে নেই কিন্তু দেশের অনেক জায়গায় এখনো তারা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। প্রথমে তারা সেদিকাকে সম্প্রচার বন্ধের হুমকি দিয়েছে। পরে ২০০৯ সালে রেডিও স্টেশনে রকেট ফায়ার করা হয়।

ছবির কপিরাইট Facebook
Image caption অধিকার আদায়ে সোচ্চার আফগান নারী আন্দোলনকারী

সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সম্প্রচার বন্ধ করেন সেদিকা। আফগান সরকারের কাছে তিনি নিরাপত্তা চান। অল্প কয়েকদিন পর তিনি আবার অন-এয়ারে যান, "কারণ কেবল হুমকিতে আমাদের থেমে যেতে পারিনি।"

সেখানে স্থানীয় প্রতিরোধ বিরোধিতা অব্যাহত থাকলো। পুরুষেরা সেদিকাকে প্রায়ই ডেকে বলতো যে, এলাকার মেয়েদের সে বিপথগামী করছে এবং ঘরে ঘরে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্কে সংঘাত লাগিয়ে দিচ্ছে।

তারা সেদিকাকে এসে বলে, "এইসব কাজ এতটাই খারাপ যে তার জন্য আপনাকে হত্যা করা উচিত, আমেরিকানরা যা করে তার চেয়েও তা খারাপ"।

নারীদের অধিকার ও তালেবান হুমকি

সেদিকার জন্য বিশেষ করে সেই দিনটি ছিল ভয়ংকর যেদিন তিনি দেখলেন কুন্দুজে ২০১৫ সালে তালেবানরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার ফোন বেজে ওঠে।

"কেউ একজন পশতু ভাষায় কথা বলছিল, জানতে চাইলো আমি কোথায় ছিলাম,আমার অবস্থান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চাইলেন" সেদিকা বলেন, "লোকটা কে ছিল আমি নিশ্চিত ছিলাম না এবং সে ছিল সন্দেহজনক। এরপর আমি আমার ফোন বন্ধ করে দেই এবং পালানোর যথাসাধ্য চেষ্টা চালাই।"

এটা ছিল একটি আগাম সতর্কতা। রেডিও স্টেশনের কর্মীকে পালাতে দেখে তালেবান যোদ্ধারা স্টেশনের আর্কাইভ ধ্বংস করে দেয়, যন্ত্রপাতি চুরি করে, এবং ভবনটিতে মাইন পুঁতে রাখে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০১৫ সালে তালেবান শাসনের অবসানের পর কুন্দুজে ফিরছেন বাসিন্দারা

বিবিসি বাংলায় আরও খবর:

নাগরিকত্ব হারানো চার হতভাগ্যের বয়ান বিবিসির কাছে

গর্ভেই নির্ধারিত হয়ে যায় সন্তানের ব্যক্তিত্ব

আবারো ছড়াচ্ছে অ্যানথ্রাক্স, যা জেনে রাখা প্রয়োজন

যদিও তারা শেষ পর্যন্ত শহর থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, স্টেশনটি দুইমাসের জন্য বন্ধ ছিল যখন বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞরা মাইন নিষ্ক্রিয় করে এবং খোয়া যাওয়া যন্ত্রপাতি পুনরায় স্থাপন করা হয়।

কিন্তু সেদিকা এবং তার দলের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি চলতেই লাগলো।

হাতে টাকা এলেই বিয়ে!

ফোন-ইন প্রোগ্রামের মাধ্যমে রেডিও রোশনি মেয়েদের অধিকারে বিষয়ে সচেতন করে থাকে। সেদিকা সেরযাই বলেন, কুন্দুজের নারীদের অন্যতম সাধারণ একটি চিন্তার বিষয় হল, স্বামীদের বহু-গামী বৈবাহিক জীবন নিয়ে স্ত্রীদের মধ্যে বিরোধ।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই সম্পাদক বলেন, "বহু সংখ্যায় পুরুষ আছে যখনই তাদের হাতে কিছু টাকা-পয়সা আসে, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়, কিংবা আরও বিয়ে করে ফেলে। ইসলামী অনুশাসন ও রীতি অনুসারে, যেখানে প্রথম স্ত্রী সন্তানের জন্ম দিতে না পারেন সেক্ষেত্রে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হলেও, এখানে মূলত একাধিক বিয়ের ঘটনাগুলো প্রধানত ঘটে "যৌন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য"।

সবসময়ই স্বামীর দায়িত্ব তার স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার এবং সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে কিন্তু সেদিকা বলছেন প্রায়ই তারা সেটি করেন না।

স্ত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগ বিরোধের কারণ তাদের স্বামী একজনের চেয়ে আরেকজনকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

"যখন দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে বেশি সন্তান আসে, তখন তাকে প্রথম স্ত্রীর চেয়ে বেশি সুনজরে দেখা হয়। এবং প্রথম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী যদি নিরক্ষর হয়, তখন লোকটি একজন শিক্ষিত স্ত্রী খুঁজে নেয়, আবার তাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া শুরু হয় কারণ সে বেশি শিক্ষিত," সেদিকা বলেন।

প্রায়ই যেসব নারী এই কঠিনতম সময় পার করেন যারা এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না, অথবা হয়তো বাবা-মা ওই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন, অথবা কোনও আত্মীয়ের ঋণের শোধ করতে না পেরে তাকে ওই পুরুষের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption কুন্দুজে এক আফগান নারীর কোলে শিশু, ২০০১ সাল

তিনি আরও যোগ করেন যে, নারীদের জন্য এটা খুবই বিরল যে তারা একে অন্যকে সমর্থন দেবে, এবং স্বামীর ওপর সম্মিলিত চাপ সৃষ্টি করবে ভালো ব্যবহার করার জন্য।

"তাদের মধ্যে সামান্য বোঝাপড়া এবং সহানুভূতি কাজ করে, বৈবাহিক টানাপড়েনের কারণে। অনেকে অন্য স্ত্রীদের নিয়ে ঈর্ষান্বিত থাকে কারণ অন্য স্ত্রীরা স্বামীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকে,আর তারা নিজেরা দূরবর্তী হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের মধ্যে খুব কমই পারস্পরিক সহযোগিতা দেখা যায়"।

যখন কুন্দুজে রেডিও রোশনি একজন নারীর পরিচালিত একমাত্র রেডিও স্টেশন সেখানে আরও তিনটি রেডিও স্টেশন উদ্বোধন করা হয়েছে নারীদের দ্বারা এবং মূলত পুরুষদের দ্বারা পরিচালিত হলেও সেখানে কিছু অনুষ্ঠান নারীদের জন্য প্রচার করা হচ্ছে।

যোহাল নুরি, যিনি রেডিও রোশনি এবং আরও একটি রেডিও স্টেশনে কাজ করছেন, তিনি বলছেন যে অনেক পুরুষ নারীদের অনুষ্ঠান শোনে এবং এভাবেই বিষয়টি তাদের মনোভাব বদলাতে সহায়তা করছে।

তিনি আরও জানান, এখন অনেকেই তাদের স্ত্রীদের কাজে যেতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে সক্রিয় করার জন্য অনুমতি দিতে আগ্রহী।

যোহাল বলেন, ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় পুরুষেরা তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে দিতে অনুমতি দিচ্ছেন, সেজন্য নারী চিকিৎসকদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আফগান নারী ও শিশু, ২০০১ সালে তোলা ছবি

নিরাপত্তার অভাব

সাধারণভাবে কুন্দুজে নারীদের জন্য অবস্থা উন্নত হচ্ছে। কিন্তু সেখানে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে,কারণ নড়বড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ৩১শে অগাস্টের তালেবান আক্রমণ শহরজুড়ে অভিযান শুরু করে দেয়।

যোহাল বলেন, এখানে প্রচুর হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং অপরাধ ঘটছে। রাতে অপহরণের ঘটনা খুবই সাধারণ এবং ঘটনাগুলো খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে।

ফলাফল হিসেবে কিছু পরিবার যারা মেয়েদেরকে ভাইদের সঙ্গে করে হলেও স্কুলে পাঠাতেন তারাও এখন মন বদলাতে শুরু করেছেন।

আমেরিকা এবং তালেবান প্রতিনিধিদের মধ্যে যে আলোচনা চলছিল তার ফলে রেডিও রোশনি এবং অন্যান্য সম্প্রচার মাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে নারী অধিকারের জন্য যে লড়াই করে আসছে তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

কারণ তাদের ভয়, আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ডামাডোলে আমেরিকা না আবার তালেবানের ইসলামী শরীয়া আইন ফিরিয়ে আনার সুযোগ করে দেয়!

সেদিকা সেরযাই বলেন, "আমরা আশা করি শান্তি আলোচনা নিয়ে আসবে সত্যিকারের শান্তি। এবং সেটা মেয়েদের ঘরের কোনে বসে থাকার বিনিময়ে নয় এবং আমাদের সব অর্জন যেন ভেস্তে না যায়।"