ভূমির দলিল নিবন্ধন সেবায় সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি: টিআইবি

ঢাকা। ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption বাংলাদেশে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে জমির দলিল নিবন্ধনের নজির নেই।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোন জমি কেনার পর তার দলিল নিবন্ধন করতে হয়।

কিন্তু সরকারের বাধ্যতামূলক এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয় নিবন্ধনের জন্য আসা মানুষদের।

ভুক্তভোগী বেশ কজন বিবিসিকে বলেন, তারা কেউই সরকার নির্ধারিত মূল্যে নিবন্ধন করতে পারেননি।

তাদের একজন শিল্পী আক্তার। ঢাকায় গত দুই বছর আগে পাঁচ জন অংশীদারের সঙ্গে পাঁচ শতাংশ জমি কিনেছিলেন তিনি।

জমির দলিল হস্তান্তরের পর যখন সেটা নিবন্ধনের জন্য তারা ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে যান, সেখানে শুরুতেই তাদের জানিয়ে দেয়া হয় সরকারের নির্ধারিত ফি-তে কোন নিবন্ধন করা যাবেনা।

শুরুতে রাজী না হলেও পরবর্তীতে বাধ্য হয়েই ঘুষ দিয়ে নিবন্ধন করতে হয় তাকে।

"আমরা প্রথমে চেষ্টা করেছি যতো সময় লাগুক, সরকারি ফি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করবো। কিন্তু আমাদের কাজটা কোনভাবেই হল না। বার বার ঘোরায়। একেকদিন একেক অজুহাত। পরে ওই এক্সট্রা টাকা দিয়েই করেছি। ধরেন সরকারি রেট থেকে ৫০-৬০ গুণ বেশি টাকা দিতে হয়েছে।" বলেন শিল্পী আক্তার।

এনামুল হক মনির তার জমি সরকারি রেটে নিবন্ধনের চেষ্টা করলেও পরে ব্যর্থ হয়ে দালালের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, "আমি রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার পর ওখানকার অফিসাররা শুধু এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে ঘোরালো। কয়েকজন বলে যে আপনার তো হেল্প লাগবে। সরাসরি কেউ দালালের কথা বলেনা। পরে দালাল নিজে থেকেই আমার কাছে আসলো, বলল যে এভাবে আমার কাজ হবেনা। পরে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে নিবন্ধন করাতে হয়েছে।"

Image caption টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী দলিল নিবন্ধনে এক হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ম বহির্ভূত অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে।

আরও পড়তে পারেন:

বাংলাদেশে নামে মাত্র সংসদীয় গণতন্ত্র আছে - টিআইবি

'পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন'

'প্রশ্নবিদ্ধ, 'অভূতপূর্ব', 'অবিশ্বাস্য': নির্বাচন নিয়ে টিআইবি

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এড়াতে বিশেষ করে অবৈধ দখল রোধ করতে বাংলাদেশের আইনে জমির নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সরকারি নিয়মে একটি জমি নিবন্ধনে ২৮ থেকে ৪৫ কর্মদিবস সময় লাগার কথা থাকলেও বাস্তবের চিত্র পুরো ভিন্ন।

নিয়ম বহির্ভূত টাকার লেনদেন তো হয়ই তার ওপর সময়ও বেশি লাগে।

ভূমির দলিল নিবন্ধনের এমন নানা অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে আজ (সোমবার) একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই গবেষণার ব্যাপারে জানান যে, বাংলাদেশে ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবা খাতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ভূমি নিবন্ধন অফিসে প্রয়োজনীয় জনবল নেই, তাদের প্রশিক্ষণ নেই, আইনি কাঠামোতে ঘাটতি আছে এমন আরও অনেক সমস্যা আছে। তবে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয় সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে কর্মকর্তারা অর্থ নিয়ে থাকেন।"

কোন গ্রাহকের থেকে কত অর্থ আদায় করা হবে সেটা দালালদের কাছে পুরো সরকারি রেটের মতোই নির্ধারিত থাকে বলে জানান তিনি।।

ভূমি নিবন্ধন দপ্তরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "নিয়ম বহির্ভূতভাবে উত্তোলন হওয়া টাকার পঞ্চাশ শতাংশ পান সাব রেজিস্টার অফিসার। আর বাকি টাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়।"

ভূমি নিবন্ধনের আগের ও পরের সব কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও নিবন্ধন প্রক্রিয়া হয় আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সমন্বয় আনা না গেলে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে বলে মনে করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান পাটোয়ারি।

"ভূমি সংক্রান্ত প্রত্যেকটা কাজ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে আমরা আইন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করার চেষ্টা করছি। এ নিয়ে আমরা তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। এই দুটো পক্ষ যদি এক হয়ে কাজ করে তাহলে গ্রাহকদের আরও ভাল সেবা দেয়া যাবে। সমন্বয় ছাড়া বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন," বলেন মি. পাটোয়ারি।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

এদিকে ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা অস্বীকার করেছেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মোঃ গোলাম সারওয়ার।

তার মতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অভিযোগ যেগুলো তারা গুরুত্ব দিয়েই দেখছেন।

মি. সারওয়ার বলেন, "ঢালাওভাবে অনিয়ম দুর্নীতি হচ্ছে এটা আমি বলবো না। হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা হয়তো ঘটেছে। আমাদের নলেজে এমন কোন অভিযোগ এলেই আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই। আর আমরা এগুলো মনিটর করি যেন কোন অভিযোগ এলেই সাথে সাথে অ্যাকশন নেয়া যায়।"

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ ধরণের অনিয়ম দূর করতে শিগগিরই ভূমি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিলাইজড করার কথাও জানান তিনি। যেন অনলাইনেই সবকিছু সম্পন্ন করা যায়।

টিআইবির ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী দলিল নিবন্ধনে এক হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ম বহির্ভূত অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে।

একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়মভঙ্গের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।