ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার: নির্যাতন থেকে রক্ষায় নিজেকেই ২৫০০ চরিত্রে বদলালেন যে নারী

জেনি হেইনেস ও তার মাল্টিপল পারসোনালিটি
Image caption জেনি হেইনেস ও তার মাল্টিপল পারসোনালিটির সচিত্র প্রকাশ

সাক্ষীর কাঠগড়ায় একজন মাত্র নারী দাঁড়িয়েছিলেন সেদিন কিন্তু তার মধ্যেই ছয় জন এসেছিলেন জবানবন্দী দিতে যে তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

"আমি আদালতে গেলাম। বসলাম। শপথ নিলাম এবং কয়েক ঘণ্টা পর আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম ও হেঁটে চলে গেলাম," জেনি হেইনেস বলছিলেন বিবিসিকে।

শিশু হিসেবে জেনির বারংবার ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তারই বাবা রিচার্ড হেইনেসের দ্বারা।

অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ বলছে দেশটির ইতিহাসে শিশু নির্যাতনের এটাই ভয়াবহ ঘটনা।

আর এই ভয়াবহতা মোকাবেলায় তার মন অসাধারণ একটি কৌশল গ্রহণ করে- আর তা হচ্ছে, নিজের নতুন পরিচয় তৈরি করা।

নির্যাতন ছিলো ভয়াবহ ও নিয়মিত; তিনি বলছেন এ থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের মধ্যেই গড়ে তোলেন ২৫০০ ভিন্ন চরিত্র।

মার্চে আলোচিত এক বিচারে জেনি তার বাবার বিরুদ্ধে যেসব চরিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন করেন তাদের মধ্যে ছিলো চার বয়সী মেয়ে সিম্ফনি।

মনে করা হয় অস্ট্রেলিয়ায় এবং সম্ভবত বিশ্বে এটাই প্রথম যেখানে একজন মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার (এমপিডি) বা ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারে(ডিআইডি) আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য চরিত্রগুলোর হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং এর ভিত্তিতে সাজা হয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

'আমার বান্ধবী চায়না আমি তাকে নগ্ন অবস্থায় দেখি'

যেভাবে আত্মহত্যা প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন এই নারী

নারীদের শরীর ও মনের প্রশান্তি: ঢাকায় সুযোগ কতটা?

"আমরা ভয় পাইনি। আমরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছি যে আমাদের সাথে কি করা হয়েছে এবং সে আমাদের থামাতে পারেনি," তিনি বলছিলেন।

গত ৬ সেপ্টেম্বর ৭৪ বছর বয়সী রিচার্ড হেইনেসকে সিডনির একটি আদালত ৪৫ বছরের জেল দিয়েছে।

সতর্কতা: বিষয়বস্তুতে সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের দৃশ্য রয়েছে

ছবির কপিরাইট JENI HAYNES
Image caption জেনি হেইনেস

'নিজের চিন্তাতেও আমি নিরাপদ ছিলাম না'

হেইনেস পরিবার লন্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়াতে যায় ১৯৭৪ সালে।

জেনির বয়স যখন চার বছর তখন থেকেই তার বাবা তাকে নির্যাতন শুরু করে। পরে তা দৈনন্দিন নির্যাতনে পরিণত হয়।

"আমার বাবার নির্যাতনের ধরণ ছিলো পরিকল্পিত। তিনি প্রতিটি মূহুর্ত উপভোগ করেছেন"।

"এসব বন্ধ করার অনুরোধ তিনি শুনতেন, আমাকে কাঁদতে শুনতেন, আমার কষ্ট ও ভয় তিনি দেখতেন যা তিনি আমার মধ্যে তৈরি করেছেন, তিনি আমাকে রক্তাক্ত দেখতেন। এবং পরদিন এসব তিনি আবার করতেন"।

হেইনেস তার মেয়ের ব্রেনওয়াশ করেছেন এটা ভাবতে যে তিনি তার মন পড়তে পারেন। এমনকি ওই নির্যাতন সম্পর্কে ভাবলেও জেনির মা, ভাই ও বোনকে হত্যার হুমকি দিতেন।

"আমার জীবনটা ভেতর থেকে দখল করে নিয়েছিলো বাবা। এমনকি নিজের চিন্তাতেও আমি নিরাপদ বোধ করতে পারতাম না। আমি বুঝতে পারতাম না কি হচ্ছে আমার সাথে এবং কোনো উপসংহারে আসতে পারতাম না"।

এগুলো ভুলতে সে তার চিন্তাগুলোকে গানের কথায় নিয়ে আসে।

"সে খুব বড় নয়/সে আমার ভাই"- সহোদর সম্পর্কে যখন উদ্বিগ্ন হতো।

ছবির কপিরাইট JENI HAYNES
Image caption জেনি, চার বছর বয়সে

"তুমি কি আমাকে সত্যি আঘাত করতে চাও/ তুমি কি সত্যি আমাকে কাঁদাতে চাও"- যখন সে তার নিজের কষ্ট সম্পর্কে ভাবতো।

তার বাবা তার সামাজিক সক্রিয়তা কমিয়ে দেয় যাতে করে বড়রা কেউ বিষয়টি বুঝতে না পারে।

জেনি নিজে ছোট ও চুপ রাখতে শিখে কারণ সেভাবেই তাকে রাখা হচ্ছিলো। জেনিকে মারধর ও যৌন হয়রানির পর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও দেয়া হয়নি।

এখন ৪৯ বছর বয়সের জেনির দৃষ্টিশক্তি, দাঁতের মাড়ি, অন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

১১ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত জেনিকে এই ভয়াবহ নির্যাতন সইতে হয়েছে।

১৯৮৪ সালে তার বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়।

তার বিশ্বাস কেউই, এমনকি তার মাও জানত না যে সে কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো।

"সে আসলে সিম্ফনিকে নির্যাতন করতো"

ছবির কপিরাইট JENI HAYNES
Image caption সিডনিতে জেনির বাড়ির ছবি

অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞরা জেনির অবস্থাকে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার (ডিআইডি) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

একজন শিশুর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ও এর মধ্যেই নিরাপদ পরিবেশ মনে করে নেয়ার চেষ্টা এটি।

"ডিআইডি সত্যিকার অর্থে বাঁচার কৌশল," বলছিলেন শিশুকালীন ট্রমা বিশেষজ্ঞ ড. পাম স্টাভরোপৌলস।

তার মতে, মনে রাখতে হবে যে এটা চরম নির্যাতন ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশুর একটি প্রতিক্রিয়া।

এ ধরণের ট্রমা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতার সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে মনের মধ্যে বহু ধরণের ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র গড়ে তোলা হয়।

প্রথম যে চরিত্রটি জেনি তৈরি করেছিলো তার মনের মধ্যে সেটি হলো সিম্ফনি যার বয়স চার।

"সে (সিম্ফনি) বাবার নির্যাতনের প্রতি মূহুর্তে কষ্ট পেয়েছে এবং যখন সে আমাকে নির্যাতন করতো, সে আসলে সিম্ফনিকে নির্যাতন করতো," জেনি বলছিলেন বিবিসিকে।

পরের বছর গুলোতে সিম্ফনি এমন আরও চরিত্র তৈরি করে। সংখ্যায় হাজারের বেশি এসব চরিত্রের প্রতিটির আলাদা ভূমিকা ছিলো নির্যাতনগুলোকে হজম করার জন্য।

ছবির কপিরাইট JENI HAYNES
Image caption রিচার্ড হেইনেসের সাথে সন্তানরা, জেনি সবার ডানে

"আমার পরিবর্তনগুলোও ছিলো আমার বাবার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা"।

সিম্ফনির উপস্থিতি নিয়ে যখন আদালতে আধা ঘন্টা ধরে আলোচনা হচ্ছিলো তখন জেনিকে সতর্ক করা হয়েছে যে এটা হতে পারে—তখন তাকে উত্তর গুছাতে লড়াই করতে দেখা গেছে।

"হেলো আমি সিম্ফনি। আমি আপনাদের এমন সব বলবো যা আপনাদের চিন্তায়ও নেই"।

সিম্ফনির কণ্ঠ ছিলো উঁচু, মেয়েলি ও দমহীন। পনের মিনিটে সে বলে যায় বাবার নোংরামিগুলো।

জেনি বলছে কিছু মানুষ তাকে সহায়তা করেছে বাঁচতে

-মাসল- শিল্পী বিলি আইডলের মতো দেখতে এক তরুণ। তিনি লম্বা ও তার শক্ত-সামর্থ ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্ত ও সুরক্ষা দেয়ার মতো।

-ভলকানো অনেক লম্বা ও শক্তিশালী। তার ছিলো উজ্জ্বল স্বর্ণকেশী চুল।

-রিকির বয়স ছিলো মাত্র আট কিন্তু পুরনো ধুসর স্যুট পড়েছিলো। তার চুল ছিলো খাটো ও উজ্জ্বল লাল।

-জুডাস খাটো ও লাল চুলের। সে স্কুল ট্রাউজার ও উজ্জ্বল সবুজ জাম্পার পড়েছিলো।

-লিন্ডা/ম্যাগট লম্বা ও পাতলা। পঞ্চাশের দশকের স্কার্ট পড়েছে। চুল ছিলো এলিগেন্ট ও ভুরু ছিলো চিকন।

-রিক বড় চশমা পড়ে। - রিচার্ড হেইনেস যেমন পড়তো।

Image caption জেনির মধ্যে বাস করতো আরও অসংখ্য চরিত্র

মার্চে জেনিকে সিম্ফনি হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয় আদালত। সে প্রতিটি আলাদা নিপীড়নের ঘটনার বর্ণনা দেয়।

মাত্র একজন বিচারক এই বিচারে ছিলেন কারণ আইনজীবীরা মনে করেছেন বিচারকদের জন্য এটি খুবই পীড়াদায়ক হতে পারে।

প্রাথমিক ভাবে হেইনেসের বিরুদ্ধে ৩৬৭ টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণ, অশালীন আচরণসহ নানা ধরণের অভিযোগ ছিলো।

জেনি তার চরিত্রে প্রতিটি ভিন্ন ঘটনার বিবরণ দিতে সক্ষম ছিলো।

অন্য চরিত্রগুলো তাকে ঘটনা মনে করতে সহায়তা করেছে।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, "এমপিডি-তে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি হিসেবে আমার স্মৃতিগুলো একেবারেই যখন যা ঘটেছে তখনকার মতো অবিকলই রয়ে গেছে"।

তিনি বলেন , "আমার স্মৃতিগুলো ফ্রোজেন হয়ে যায়। আমার যদি প্রয়োজন হয় আমি শুধু গিয়ে সেগুলো তুলে আনি"।

সিম্ফনির লক্ষ্য ছিলো অসহ্য সেই কষ্টগুলো মনে করা যা অস্ট্রেলিয়াতে সাত বছর ধরে সে সহ্য করেছে।

মাসলস, ১৮ বছরের শক্তিশালী ব্যক্তি, তাকে শারীরিক নিপীড়নের প্রমাণগুলো মনে করিয়েছে। আবার তরুণী লিন্ডা জেনির স্কুল ও সম্পর্কগুলোর বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে।

বিচারের দ্বিতীয় দিনে আড়াই ঘন্টা ধরে সাক্ষ্য দেয় সিম্ফনি।

এমডিডি আমার আত্মাকে রক্ষা করেছে।

শিশু কালীন ট্রমা থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুদের সহায়তা দেয়া সংগঠন ব্লু নট ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ড. কেথি কেজেলম্যান বলছেন এটি ছিলো মাইলফলক একটি বিচার।

কারণ যতটুকু মনে করা যায় যে এটাই প্রথম ডিআইডিতে আক্রান্ত কাউকে আদালতের পদ্ধতিতে এনে সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে সাজা হয়েছে।

জেনি প্রথম নিপীড়নের অভিযোগ করে ২০০৯ সালে। পরে দশ বছর সময় লেগেছে পুলিশের বিষয়গুলো তদন্ত করে ও বিচার করে রিচার্ড হেইনেসকে শাস্তি দিতে।

নির্যাতনের ঘটনা জানার পর জেনির মা বিষয়টি আদালতে নিতে তাকে শক্তভাবে সমর্থন করেন।

কিন্তু কয়েক দশক ধরে জেনি সহায়তা পেতে লড়াই করেছে।

কারণ কাউন্সিলর ও থেরাপিস্টরা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলো কারণ তার ঘটনাগুলো তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে এবং এগুলো এতো ভয়ংকর ছিলো যে তারা সেগুলো এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলো।

ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার

-নিজেকে নিজের থেকে বা বিশ্ব থেকে আলাদা করে ফেলা- এটাকে ট্রমার সাধারণ প্রতিক্রিয়া মনে করা হয়

-কিন্তু ডিআইডি কোনো ব্যক্তির মধ্যে হতে পারে বিশেষ করে শিশুর যে দীর্ঘদিন ধরে জটিল কোনো ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়।

-কোনো এডাল্ট সাপোর্ট না থাকা- বা প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি বলে যে ট্রমাটি সত্যি নয়-সেটিও ডিআইডি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে

-ডিআইডিতে আক্রান্ত কেউ ভাবতে পারে তাদের চিন্তার জন্য অনেক চরিত্র আছে যারা আলাদা কাজ করে

-সুনির্দিষ্ট কোনো ঔষধ নেই চিকিৎসা হিসেবে।

ছবির কপিরাইট JENI HAYNES
Image caption জেনির মধ্যে থাকা চরিত্রগুলোর অনেকগুলোই ছিলো খুবই বুদ্ধিমান ও পরিপক্ক

ড. স্টারভোপৌলাস বলছেন জেনির ঘটনা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটাই এই চ্যালেঞ্জিং বিষয়টিকে বড় সচেতনতার মধ্যে নিয়ে এসেছে।

আর জেনি বলছেন তার এমপিডি তার জীবন ও আত্মাকে বাঁচিয়েছে।

সে পড়ালেখায় জীবন কাটিয়েছে। মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছে লিগ্যাল স্টাডিজ ও দর্শনে।

কিন্তু তাকে কাজের সম্পূর্ণ সময় দিয়ে লড়াই করতে হয়েছে।

সে এখন তার মায়ের সাথেই বাস করে এবং তারা দুজনই ওয়েলফেয়ার পেনশন নির্ভর।

ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্টে জেনি তার চরিত্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন আচরণ সম্পর্কে বলেছে।

"প্রায় ২৫০০ ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠ, মতামত ও আচরণ ম্যানেজ করা আসলেই কঠিন। কিন্তু আমার এমন হওয়ার কথা ছিলোনা। কোনো ভুল না করে, আমার বাবাই আমার মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের জন্য দায়ী "।

গত ৬ সেপ্টেম্বর আদালতে তার বাবার থেকে কয়েক মিটার দুরেই বসেছিলো জেনি।

দুর্বল স্বাস্থ্যে হেইনেসকে অন্তত ৩৩ বছর জেলে থাকতে হবে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য হওয়া পর্যন্ত।

তবে বিচারক বলেছেন ক্ষতির তুলনায় যে শাস্তি তা নগণ্য।

জেনি বিবিসিকে বলেছেন তিনি তার গল্প জানাতে মরিয়া ছিলেন।

"নির্যাতনের কারণে আপনার এমপিডি থাকলেও বিচার পাওয়া এখন সম্ভব। আপনি পুলিশের কাছে যেতে পারেন এবং বলুন এবং বিশ্বাস করান। আপনার রোগ বিচারের পথে বাধা হবেনা"।

সম্পর্কিত বিষয়