ভারতীয়রা নতুন ট্রাফিক আইন মানতে চাইছে না কেন

নতুন আইন চালু হওয়ার প্রথম দিনেই এক ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে চালান কাটছে দিল্লি পুলিশ ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নতুন আইন চালু হওয়ার প্রথম দিনেই এক ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে চালান কাটছে দিল্লি পুলিশ

ভারতে ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গ করলে খুব কঠোর আর্থিক জরিমানার যে বিধান এ মাসের গোড়ায় কেন্দ্রীয় সরকার চালু করেছে, তা বলবৎ করতে বহু রাজ্যই বেঁকে বসেছে।

নতুন আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে জরিমানার অঙ্ক দশগুণ বাড়িয়ে করা হয়েছে পাঁচ হাজার রুপি।

আবার মদ খেয়ে স্টিয়ারিং ধরলে ছ'মাসের জেল ছাড়াও দশ হাজার রুপির পেনাল্টি নির্ধারণ করা হয়েছে।

কিন্তু গুজরাট, কর্নাটক, পাঞ্জাব বা পশ্চিমবঙ্গের মতো অনেক রাজ্য সরকারই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে এত কড়া আইন তারা প্রয়োগ করতে পারবে না।

রাস্তাঘাটেও বহু সাধারণ মানুষ এই মোটা জরিমানার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

তবে কেন্দ্রীয় সরকার ও পথ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর দেড় লক্ষরও বেশি মানুষ মারা যান সেখানে এই ধরনের কঠোর আইনের কোনও বিকল্প নেই।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতে প্রতি বছর পথ দুর্ঘটনায় কম করে দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়

আরো পড়তে পারেন:

সড়ক দুর্ঘটনা: হাসপাতালে নেয়ার পথে এত মৃত্যু কেন?

'যত গতি তত ক্ষতি, মোড়ে মোড়ে ফুট ওভারব্রিজে লাভ নেই'

সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকানোর কমিটিতে শাজাহান খান কেন?

গত ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে চালু হয়েছে এই নতুন মোটর ভেহিকেলস (সংশোধনী) আইন, আর তাতে সব ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনেই জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ একলাফে বেশ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফলে এখন থেকে সঠিক কাগজপত্র ছাড়া বা মদ্যপান করে গাড়ি চালালে, হেলমেট ছাড়া বাইকে চাপলে কিংবা ট্রাক ওভারলোড করা হলে এক ধাক্কায় বেশ কয়েক হাজার টাকা গচ্চা দিতে হবে।

রাজধানী দিল্লি ও তার আশেপাশে অনেকেই এই নতুন আইনের প্রতিবাদে মুখর।

নয়ডার পুনম শ্রীবাস্তব যেমন বলছেন, "রাস্তার হাল আগে ঠিক না-করেই কেন এই আইন চালু করা হল? আর যে ফাইন একশো টাকা ছিল সেটা বড়জোর দুশো টাকা করা যেতে পারত, কিন্তু এতটা বাড়ালে মানুষ তো খুব অসুবিধায় পড়বে!"

দিল্লির মহম্মদ আফতাবের আবার বক্তব্য, "এটা স্রেফ সরকারের কোষাগার ভরার একটা ছুতো - আর এতে পুলিশেরই শুধু পকেট ভরবে, লোকসান হবে শুধু সাধারণ মানুষের।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতের সড়ক পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গডকড়ি

গুরগাঁওয়ের গৃহবধূ নীলম শর্মার আবার মত, "রাস্তাঘাটে বেপরোয়া তরুণদের জন্যই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে - শুধু ওদের নতুন নিয়মের আওতায় নিয়ে এসো।"

"সেই সঙ্গে শাস্তি দাও সেই বাবা-মাদের, যারা হেলমেট বা লাইসেন্স ছাড়াই সন্তানকে রাস্তায় নামতে দিচ্ছেন।"

এই কড়া জরিমানার বিরুদ্ধে জনমত যে তীব্র, সেটা আঁচ করেই দেশের একের পর এক রাজ্য এই আইন প্রয়োগ করতে আপত্তি জানাচ্ছে কিংবা পেনাল্টির পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যেমন বলছেন, "নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের জন্য প্রচার চালালেও আমার সরকার এই নতুন আইন বলবৎ করবে না, কারণ এটা খুবই 'হার্শ' বা কঠোর।"

তিনি আরও দাবি করছেন, "সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন এটা চালু করলে মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো হয়ে যাবে।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মমতা ব্যানার্জি জানিয়ে দিয়েছেন তার সরকার এই আইন প্রয়োগ করবে না

বিজেপি-শাসিত গুজরাট বা কর্নাটকও কিন্তু এই একই সুরে গলা মেলাচ্ছে।

ফলে রীতিমতো অস্বস্তিতে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গডকড়ি, যিনি এই বিলের পক্ষে গত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রচার চালিয়ে আসছেন।

মি গডকড়ি যুক্তি দিচ্ছেন, "আইনকে যাতে মানুষ ভয় করে ও মর্যাদা দেয় সেই জন্যই এটা চালু করা হয়েছে। ট্রাফিক আইন না-ভাঙলে কোনও জরিমানাও দিতে হবে না, অতএব ভয় কীসের?"

"আর এটা সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর কোনও ফিকির নয়, বরং মানুষের প্রাণ বাঁচানোর প্রস্তাব। ভুললে চলবে না, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে ভারত জিডিপি-র দুই শতাংশ হারায়।"

বস্তুত পথ-নিরাপত্তার দৃষ্টিতে ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption হেলমেট না-পরে স্কুটার চালানোর অপরাধে মোটা জরিমানা হচ্ছে গাজিয়াবাদে দুই তরুণের

প্রতি বছর এদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দেড় লক্ষ লোক মারা যান, পঙ্গু হয়ে যান আরও তিন লক্ষ - যাদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশই তরুণ, অর্থাৎ ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী।

পথ নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে ভারতের নামী এনজিও 'সেভ লাইফ ফাউন্ডেশন'।

সেই সংস্থার কর্ণধার পীযূষ তিওয়ারি আবার বলছেন, "নতুন আইনে শুধু জরিমানা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়েই কথা হচ্ছে - কিন্তু এর আরও নানা ভাল দিকও রয়েছে।"

"যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স পদ্ধতির সংস্কার, রাস্তা খারাপ হলে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের দায়বদ্ধ করা, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ইত্যাদি ইত্যাদি।"

"পুরো আইনটা বুঝতে মানুষের সময় লাগবে, মসৃণভাবে এর রূপায়নে হয়তো বছরখানেক লেগেও যাবে - কিন্তু একবার ঠিকমতো চালু হলে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু নি:সন্দেহে অনেক কমে যাবে।"

কিন্তু এই নতুন আইন যে সাধারণ ভারতীয়দের প্রাণ বাঁচাতেই প্রয়োজন, তা বোঝাতেই আপাতত হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে।

আরো পড়তে পারেন:

স্বাস্থ্য: হৃদরোগ ঠেকাতে খাদ্যভ্যাসে ৫টি পরিবর্তন

যে দশ লক্ষণ দেখে বুঝবেন একটি দেশ গণতান্ত্রিক নয়

দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়ে কী তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে