শেখ হাসিনার দিল্লি সফর: বাংলাদেশ কি ভারতের কাছে কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হল?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী ছবির কপিরাইট PRAKASH SINGH
Image caption প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরে বাংলাদেশের বেশ কিছু ইস্যু ছিল।

এবার ভারতের সাথে যে ক'টি সমঝোতা স্বারক সাক্ষর হয়েছে তাতে ভারত বেশ ক'টি সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশের কাছ থেকে।

চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে ভারত। নজরদারির জন্য বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরে রেডার বসাবে দেশটি।

অভিন্ন ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। ভারতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস রপ্তানিরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

বছর তিনেক হল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধা পাচ্ছে ভারতের পণ্যবাহী যানবাহন।

আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে কোলকাতা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে শিলিগুড়ি যাবে।

কিন্তু ভারতের কাছে বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা ছিল ছিল তা পূরণ হয়নি, বলছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।

তিনি বলছেন, "আমাদের প্রত্যাশিত যে বিষয়গুলো আমরা মনে করেছিলাম, সবগুলোই বেশ জটিল। বিষয়গুলো নিয়ে হয়ত আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যে জয়েন্ট স্টেটমেন্ট এসেছে সেখানে এর খুব একটা প্রতিফলন আমরা দেখিনি।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে চুক্তি নিয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি।

তিনি আরও বলছেন, "ভারতকে যখন আমরা মানবিক কারণে ফেনি নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেই, আমরাও একই ধরনের মানবিকতা ভারতের কাছ থেকেও আশা করি। অন্তত আমাদের যে বিষয়গুলি ঝুলে আছে সেগুলোর ব্যাপারেও আরও বেশি সক্রিয় হবে সেরকম প্রত্যাশাতো আমাদের থাকে।"

ভারত এবার যে সুবিধাগুলো নিশ্চিত করলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত চিত্র।

ভারতের কাছে বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের চাওয়া তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে চুক্তি নিয়ে কোন অগ্রগতি হয়নি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের যে জোরালো সমর্থন বাংলাদেশ চায় সেটি মেলেনি। এমনকি 'রোহিঙ্গা' শব্দটিই ব্যবহার করা যায়নি।

বলা হয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে আসা 'আশ্রয়চ্যুত' মানুষজন।

ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতে কোথাও বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক উদ্বেগের বিষয়, ভারতের বিতর্কিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদীর মুখ থেকে কোন আশ্বাস আসেনি, যেমনটা বাংলাদেশে চেয়েছিল।

এমনকি দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে এনআরসি শব্দটিই একবারও উল্লেখ হয়নি।

রাজনীতির অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছেন, লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতকে সবসময় শুধু দিয়েই গেছে। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়।

তিনি বলছেন, "বাংলাদেশের কূটনীতি সবসময় ভারতের কাছে নতজানু ছিল। ধরেন, বাণিজ্য ঘাটতি থেকে শুরু করে, তাদেরকে এককভাবে ট্রানজিট দিয়ে দেয়া, ফারাক্কার যে চুক্তি হয়েছে সেটাও কিন্তু সমতার ভিত্তিতে হয়নি। ভারত চাপের মুখে রেখে সব সময় সবকিছু আদায় করে নিয়েছে।"

ছবির কপিরাইট PID
Image caption দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে এনআরসি শব্দটিই একবারও উল্লেখ হয়নি।

আরো পড়তে পারেন:

ফেনী নদী: পানি প্রত্যাহারে কী প্রভাব পড়বে?

আগরতলা-ঢাকা ফ্লাইট চেয়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী

যুবলীগ নেতা সম্রাট অবশেষে গ্রেপ্তার

তিনি মনে করছেন, "বাংলাদেশও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার ক্ষমতাটা বাংলাদেশের নাই। কারণ বাংলাদেশ একটি বিভক্ত জাতি। কোনো জাতীয় ইস্যুতে এখানে ঐক্যমত্য নেই।"

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় ভারত বাংলাদেশ বন্ধুত্ব এখন তুঙ্গে।

কিন্তু তারপরও এবারের ভারত সফরে বাংলাদেশ কী কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুকসানা কিবরিয়া বলছেন, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের যে অবস্থান সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিকভাবে তার স্বার্থ সংরক্ষণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে।

ভারতের স্বার্থ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি বলছেন, বাংলাদেশও আরও সূক্ষ্ম কূটনীতির যায়গায় ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ।

তার মতে, "দুই বন্ধুরই তো সুযোগ সুবিধা সমান হতে হবে। এখানে আমরা তার প্রতিফলন দেখিনি। যা আমাদের জন্য খুবই একটা চিন্তার বিষয়। কূটনীতিক দিক দিয়ে আরও সূক্ষ্মভাবে এটা করা যেত। এমনভাবে সমঝোতাগুলো করা হয়েছে তাতে সমর্থন দেয়ার সুযোগ নেই। এনিয়ে প্রশ্ন উঠবে। জনগণ এখন প্রশ্ন তুলবে আমাদের সরকার আমাদের জন্য কী নিয়ে আসলো।"

তিনি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেও ভারত বিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

সব মিলিয়ে এবার ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার মতো সুনির্দিষ্ট কোন বার্তা পাওয়া গেছে বলে মনে হচ্ছে না।

বরং একটি একতরফা বিষয় ঘটলো বলেই মনে হচ্ছে শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে।