দুর্গাপূজার মণ্ডপে আজান নিয়ে বিতর্ক কলকাতায়

বেলেঘাটার এই পূজা মন্ডপে চন্ডীপাঠের সঙ্গে আজান, চার্চের ঘন্টাধ্বনি সবই শোনানো হচ্ছে। ছবির কপিরাইট Tomal Dey
Image caption বেলেঘাটার এই পূজা মন্ডপে চন্ডীপাঠের সঙ্গে আজান, চার্চের ঘন্টাধ্বনি সবই শোনানো হচ্ছে।

কলকাতার একটি দুর্গাপূজা মণ্ডপে আজানের আওয়াজ কেন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

পূজার উদ্যোক্তারা বলছেন, সব ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতেই তাঁরা এবারের পূজার 'থীম' করেছেন। ওই থীমের নাম দেওয়া হয়েছে, 'আমরা এক, একা নই'।

সেই সূত্রেই মণ্ডপ সজ্জায় তারা যেমন হিন্দু-ইসলাম-খৃষ্টান সব ধর্মের নানা মোটিফ তুলে ধরেছেন, তেমনই থীম সঙ্গীত হিসাবে যা মণ্ডপে বাজানো হচ্ছে, সেখানেও চন্ডীপাঠের সঙ্গে আজান এবং বাইবেল পাঠ আর চার্চের ঘন্টাধ্বনি ব্যবহার করেছেন।

ওই পূজা কমিটির সম্পাদক সুশান্ত সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমাদের মণ্ডপ সজ্জার অঙ্গ হিসাবে যে থীম মিউজিকটা চালাচ্ছি, সেখানে কিন্তু আজান নেই শুধু! একই সঙ্গে চন্ডীপাঠ যেমন আছে, তেমনই বাইবেল থেকে পাঠও রয়েছে আজানের সঙ্গে। আমরা একটা স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছি - সেটা হল সম্প্রীতির বার্তা।"

ছবির কপিরাইট Tomal Dey
Image caption পূজা মণ্ডপ সাজানো হয়েছে নানা ধর্মের প্রতীক দিয়ে

কিন্তু হিন্দুদের একাংশ মনে করছেন দেবী দুর্গার পূজা হচ্ছে যেখানে, সেই জায়গায় আজান কেন বাজানো হবে!

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অভিযোগে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবী, যিনি একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

ওই আইনজীবী, তরুণ জ্যোতি তিওয়ারী বলছিলেন, "আমি যখন বেলেঘাটার ওই মণ্ডপে যাই, তখন শুনতে পাই আল্লাহু-আকবর ধ্বনি বাজছে। কোনও চার্চে ক্রিসমাস ক্যারলের সময়ে নিশ্চই গায়ত্রী মন্ত্র বাজানো হবে না, অথবা ঈদের দিন কোনও মসজিদে নিশ্চয়ই হনুমান চালিসা পাঠ হয় না! আমি চাইও না সেরকমটা হোক - তাতে শুধু অশান্তিই বাড়বে। সবাই নিজের মতো করে নিজের ধর্ম পালন করুক না কেন!"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption পূজা মন্ডপে দেবী দুর্গার সঙ্গে সেলফি

তার আরও বক্তব্য, "দুর্গাপূজার প্রথমেই প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, অর্থাৎ পূজার চারদিন সেটা হিন্দুদের কাছে মন্দিরের সমতূল্য। সেখানে আজান বা অন্য যে কোনও ধর্মের ধ্বনি কেন বাজানো হবে? থীমের নামে যা খুশি তো করা যায় না!"

আবার মুসলমানদের একাংশও মনে করছেন যে এভাবে সম্প্রীতির সেতু বানানো যায় না - তারাও যেমন মসজিদে দুর্গামন্ত্র বললে মেনে নেবেন না, সেরকমই হিন্দু পূজায় আজান ব্যবহার করাও অনুচিত হয়েছে।

কলকাতার সাংবাদিক মোক্তার হোসেইন বলছেন, "যে হিন্দু ভাইদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, সেটা যথার্থ। মসজিদের ভেতরে যদি মা দুর্গার প্রশংসাসূচক কোনও গান পরিবেশিত হয়, সেটা যেমন আপত্তিকর, সেই একই ভাবে দুর্গাপূজার মণ্ডপে অন্য ধর্মের কিছু বাজানো হলেও তাদের আপত্তি থাকতেই পারে! এভাবে সম্প্রীতি রক্ষা হয় না, উল্টে ধর্ম নিয়ে আরও অশান্তি পাকিয়ে ওঠে।"

তবে ওই এলাকার বাসিন্দা একজন হিন্দু আর ঠাকুর দেখতে আসা একজন মুসলমান বিবিসিকে বলেছেন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মতো কিছু তারা তো অন্তত দেখতে পাচ্ছেন না!

আরও পড়ুন:

কলকাতার যে দুর্গাপূজা আয়োজনের উদ্যোক্তা মুসলমানেরাও

পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার মন্ত্র বদলানোর দাবি

দুর্গা পূজা যেভাবে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো

বেলেঘাটার যে পূজা নিয়ে বিতর্ক, সেখানকার বাসিন্দা অঙ্কন অধিকারী বলছিলেন, "প্রথমত এটা একটা শিল্প ভাবনা - এমন তো নয় যে দুর্গাপূজায় শুধুই আজান বাজানো হচ্ছে! বাইবেল থেকে পাঠও হচ্ছে, আবার চন্ডীপাঠও আছে। এতে আমার তো অন্তত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে নি। লাগবেই বা কেন?"

"দুর্গাপূজাটা তো এখন সকলের উৎসব - গঙ্গাসাগর মেলা বা কুম্ভ মেলায় যেমন বহু মুসলমান যান, তেমনই অন্য ধর্মের মানুষও তো দুর্গাপূজার উৎসবে সামিল হন। একে অপরকে যদি মানুষ হিসাবে ভাল না বাসতে পারি, তাহলে আর কীসের ধর্ম!"

মুহম্মদ রিয়াজ আহমেদ বেলেঘাটা থেকে বেশ কিছুটা দূরের এলাকা রাজাবাজারের বাসিন্দা। মঙ্গলবার তিনি ওই মণ্ডপের ঠাকুর দেখে বেরচ্ছিলেন।

"এটা দেখেই ভাল লাগল যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান - সব ধর্মই এই পূজাতে মিশে গেছে। আজানও হচ্ছে, মন্ত্রও পড়া হচ্ছে, আবার বাইবেলও পাঠ হচ্ছে - শুনে তো খুবই ভাল লাগল আমার। এতে খারাপটা কোথায়? কোনও ভুল তো দেখছি না আমি," বলছিলেন মি. আহমেদ।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption দুর্গা প্রতিমা

তবে তরুণ সাংবাদিক মি. মন্ডলের পরামর্শ, "এভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তৈরি হয় না। এই কলকাতা শহরেই দুই ধর্মের মানুষ পাশাপাশি রয়েছেন অনেক শতাব্দী ধরে - কিন্তু একে অপরের ধর্মীয় রীতিনীতি সম্বন্ধে কতটুকু জানি আমরা?"

"উদ্যোক্তারা সত্যিই যদি দুই ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করতে চান, তাহলে উচিত হবে দুর্গাপূজায় মুসলমানদের ডেকে নিয়ে এসে দুর্গাপূজাটা কী, কীভাবে হয়, কালীপূজায় কী কী হয়, সেসব বোঝাতে পারতেন। আবার একই ভাবে মুসলমান সমাজের নেতাদেরও উচিত হিন্দুভাইদের আহ্বান করে এনে রোজা, ঈদ, আজান - এসবের ব্যাপারে অবগত করানো। একে অপরকে জানলে বুঝলেই তৈরি হবে সম্প্রীতির সেতু।"

পূজা কমিটির সম্পাদক সুশান্ত সাহা অবশ্য মনে করেন, যারা ওই পূজার থীমের বিরোধীতা করছে, তারা সম্প্রীতির পরিবেশটা নষ্ট করতে চাইছে। তারাই যেন হয়ে উঠছে দুর্গাপূজার আসল অসুর।

আর অভিযোগ দায়ের করা আইনজীবী তরুণ জ্যোতি তিওয়ারী মনে করছেন যে পশ্চিমবঙ্গে যে তোষণের সংস্কৃতি চলছে, এ তারই আরেকটা উদাহরণ। দুর্গাপূজার থীমের নামে, প্রাইজ পাওয়ার জন্য ছেলেখেলা হচ্ছে এটা।

সম্পর্কিত বিষয়