জোকার সিনেমা কি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে?

জোকার সিনেমা ছবির কপিরাইট Warner Bros. Entertainment Inc
Image caption ব্যাটম্যানের ওপর অন্যায়ের প্রতিশোধ জোকার সিনেমার বিষয়বস্তু

সুপারহিরো দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ভিলেন বা খলনায়ক চরিত্র নিয়ে বানানো সিনেমা জোকার মুক্তি পেয়েছে গত শুক্রবার, আর সপ্তাহ পেরুনোর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম দিয়েছে নানা বিতর্কের।

মুক্তির পর থেকে এখনো পর্যন্ত বক্স অফিস রিপোর্ট বেশ ভালো, প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছে সিনেমাটি।

কিন্তু এই সিনেমা ইতিমধ্যে মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ বাড়িয়েছে। যেদিন সিনেমা মুক্তি পায়, সেই দিনই সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলির ঘটনা বৃদ্ধির 'বাস্তব ঝুঁকি' রয়েছে বলে নিজেদের সদস্যদের সতর্ক করেছে।

সাত বছর আগে ব্যাটম্যানের ওপর ভিত্তি করে বানানো সিনেমা 'দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস' এর এক প্রদর্শনীর সময় কলোরাডোর অরোরায় এক গোলাগুলির ঘটনায় ১২জন নিহত এবং ৭০জন মানুষ আহত হয়েছিল।

রং করা মুখ নয়

সেই ঘটনায় নিহত-আহতদের পরিবারের অনুরোধে অরোরায় 'জোকার' মুক্তি দেয়া হয়নি।

আরো পড়তে পারেন:

সিরিয়া তুরস্ক সীমান্তে চলছে তীব্র লড়াই

স্থূলতা: মোটা হওয়া নিয়ে যে সাতটি ভুল ধারণা রয়েছে

পথেঘাটে 'মেয়ে-পটানো'র কায়দা কানুন: রোমান্টিক না অপরাধ?

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০১২ সালে অরোরায় বন্দুকধারীর গুলিতে ১২জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন

সিনেমার প্রযোজক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে পরিবারগুলো চিঠি লিখে আবেদন জানায় যেন তারা সিনেমা থেকে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত মানুষের জন্য ব্যয় করে।

চিঠিতে পরিবারগুলো ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত আইনের সংস্কার যারা চায় না, এমন কোন পার্টিকে যেন তারা ভবিষ্যতে কোনদিন রাজনৈতিক অনুদান না দেয়।

সমাজের সকলকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানেরও, সেইটি মনে করিয়ে দেবার লেখা হয়েছে চিঠিতে।

ছবির কপিরাইট Warner Bros. Entertainment Inc
Image caption সমালোচকেরা বলছেন সিনেমায় সন্ত্রাসকে গ্রহণযোগ্য ব্যপার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে

এই পরিবারগুলোর অনেকের অভিযোগ, সিনেমাটি জোকারের আজব কর্মকাণ্ডকে লঘুভাবে উপস্থাপন করেছে, ফলে অনেকেই সন্ত্রাসী কাজে উৎসাহিত হতে পারেন।

অ্যামেরিকার কয়েকটি শহরের সিনেমা হল ঘোষণা করেছে, মুখোশ পড়ে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে কেউ হলে ঢুকতে পারবেন না।

সুপারহিরো সিনেমা মুক্তির সময় মুখোশ পড়ে বা পেইন্ট দিয়ে মুখ রাঙ্গিয়ে সিনেমা দেখতে আসার রেওয়াজ রয়েছে সারা দুনিয়াতেই।

উদ্বেগের কারণ কী

জোকার সিনেমা মূলত আর্থার ফ্লেক নামী একজন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির গল্প, যার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা তাকে এক সময় সহিংস করে তোলে।

সিনেমায় অনেক অ্যাকশন ও সহিংস মারপিটের দৃশ্য রয়েছে।

ফ্লেকের ন্যারেটিভকে গুরুত্ব দিয়ে হাজির করার জন্য পরিচালক টড ফিলিপসকে দুষছেন সমালোচকেরা।

ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনের রিচার্ড লসন সিনেমাটিকে একজন অসুস্থ মানুষের 'একটি কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রচারণা' বলে অভিহিত করেছেন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সিনেমার পুরষ্কার গ্রহণ করছেন জোকার সিনেমার অভিনেতা ও পরিচালক

তবে সিনেমার সমালোচনা দেখে বিস্মিত হয়েছেন পরিচালক ফিলিপস।

"সিনেমাতে ছোটবেলার কোন দুঃসহ স্মৃতি, ভালোবাসা এবং মমতার অভাবের কথা বলা হয়েছে। আমার মনে হয় মানুষ ক্রমে এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারবে। আর সাধারণভাবে বললে শিল্প মাত্রই কিছুটা জটিল হবে, আপনি খুব সরল কিছু খুঁজলে ক্যালিগ্রাফি দেখুন গিয়ে!"

জোকারের সমালোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র বামদের দুষেছেন সিনেমার পরিচালক। "যারা ভুল বোঝার তারা সব সময়ই ভুল বুঝবে, পরিচালকের দায়িত্ব নয় সবাইকে ভালো মন্দের জ্ঞান দেয়া।"

অভিনেতা কী বলছেন

ছবি মুক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে সিনেমার এহেন সমালোচনায় কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন মূল চরিত্রে রূপদানকারী ফিনিক্স।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মুখোশ পড়ে বা মুখে রঙ লাগিয়ে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনেক শহরে

"আমার মনে হয় কোন সিনেমা যদি আপনাকে ভিন্নভাবে ভাবতে শেখায়, সেটা মন্দ নয়। সে কারণেই সিনেমাটা করতে রাজী হয়েছিলাম আমি।"

"আমার জন্য সহজ ছিল না ব্যপারটা, প্রস্তুতির সময় আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে।"

নেতিবাচক যত চরিত্র

ছবির অভিনেতা কারণে বিতর্ক আর সমালোচনা বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ ফিনিক্স খল চরিত্রের জন্য সুপরিচিত।

আর নেতিবাচক চরিত্র অনেকের কাছেই ভালো লাগার বিষয়।

জোকার মনস্তত্ত্ব নামে বই এর লেখক মনোবিদ ট্রাভিস ল্যাংলি মনে করেন, "আমরা ধারণা করতে পারি যে আমাদের মনের একটি অংশ ভালোবাসে ভাবতে যদি বিধিনিষেধ না থাকতো তাহলে আমরা কি করতাম"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ২০০৯ সালে জোকার ছবির আগের সংস্করণে অস্কার জয়ী অভিনেতা হিথ লেজার

লাইসেন্সড 'কসপ্লে'

ওয়ার্নার ব্রাদ্রার্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কোন খল চরিত্রকে মহিমান্বিত করেনি।

"কাল্পনিক চরিত্র জোকার বা সিনেমা কোথাওই বাস্তবজীবনে সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এমন ভাবনা কেউ ভেবে থাকলে ভুল করেছেন। সিনেমার বা নির্মাতার বা প্রযোজক প্রতিষ্ঠানের কারো উদ্দেশ্যই মোটেও তা নয়।"

ওয়ার্নার অবশ্য জোকার থিমের বেশ কিছু পন্য বাজারে ছেড়েছে, এর মধ্যে রয়েছে একটি মেরুন ব্লেজার। ফিনিক্স পড়েছিলেন এমন ব্লেজারের রেপ্লিকা ৭৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট Merchoid.com
Image caption মেরুন ব্লেজারের রেপ্লিকা

মানসিক স্বাস্থের ব্যপারে নজর দেয়া হয়নি

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন এমনিতেই সমাজে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

এখন এই সিনেমার কারণে অনেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করতে পারেন।

সাংস্কৃতিকভাবে প্রায় সব দেশেই মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষদের ভালো চোখে দেখা হয় না।

সিনেমার প্রাপ্তির ঝুলি

এখনো পর্যন্ত সিনেমা দেখে দর্শকেরা বাহবাই দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে নেতিবাচক প্রচারণার কারণেও অনেক দর্শক সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন।

ছবি মুক্তির প্রথম সপ্তাহে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ডলার, যা অক্টোবর মাসে মুক্তি পাওয়া কোন ছবির জন্য একটি রেকর্ড।

এছাড়া এ মাসের শুরুতে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সিনেমার পুরষ্কার জিতেছে জোকার।

সম্পর্কিত বিষয়