ঝটপট রান্নার সমাধান বাতলে যে যুবক গড়েছেন শত কোটি পাউন্ডের সফল ব্যবসা

টিমোর ফ্ল্যাটের লাউঞ্জেই চালু হয়েছিল গৌস্তো ছবির কপিরাইট GOUSTO
Image caption টিমোর ফ্ল্যাটের লাউঞ্জেই চালু হয়েছিল গৌস্তো

বিবিসির সাপ্তাহিক সিরিজ 'দি বস'-এ পৃথিবীর নানা দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কর্মজীবন নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। এই সপ্তাহে তুলে ধরা হলো খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গৌস্ত'র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী টিমো বোলড্ট-এর কাহিনী।

টিমো বোলড্ট যখন ২৬ বছরের টগবগে উদ্যমী তরুণ ছিলেন, তখন সুপারমার্কেটে যাবার সুযোগই পেতেন না তিনি।

সেই ২০১২ সালে, লম্বা সময় ধরে অফিসের কাজের পর বাসায় ফিরে সহজে রান্না করা যায়, কিন্তু যা খেতেও ভালো তেমন কিছু খেতে ইচ্ছে হতো টিমো বোলড্টের।

টিমো বলছিলেন, "অনেক সময় রান্নার সময় থাকলেও দেখা যেতো কিছু খাবার হয়তো নষ্ট হতো। কখনো আবার অনলাইনে খাবারের রেসিপি ঠিকমত করা যেতো না।"

এরকম অবস্থায় কীভাবে নিজের খাবারের সমস্যার সমাধান করবেন, কীভাবে রান্না-বান্নার বিষয়টিকে সহজ করে যায়— এই নিয়ে ভাবতে থাকেন তিনি।

এই নিয়ে যখন গবেষণা শুরু করলেন তখন টিমো দেখলেন, তার মতন সময়ের টানাটানিতে যারা থাকে তাদের আসলে এমন একটা প্রতিষ্ঠান দরকার যেখানে রান্নার সকল উপাদান আগে-ভাগেই পরিমাপ করে কেটে-কুটে গুছিয়ে বাক্সে ভরে রাখা হবে।

সাথে দেয়া থাকবে সহজে রান্নার রেসিপি বা দিক-নির্দেশনাটাও। তারপর সেই বাক্সটা ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। ব্যাস!

সেই সময়, আজ থেকে বছর সাতেক আগে, এই জাতীয় খাবারের প্যাকেট সরবরাহ করার প্রতিষ্ঠান ছিল অল্প কিছু।

তেমনি একটি জার্মানির 'হ্যালোফ্রেশ'।

ছবির কপিরাইট HELLOFRESH
Image caption রেসিপি বক্স সরবারহের এই ব্যবসায় এখন অনেক প্রতিযোগিতা

টিমোর মনে হলো, এই ধরণের খাবারের চাহিদা সামনে আরো বহুগুণ বাড়বে।

তাই, একদিন চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজেই এই জাতীয় খাবার সরবরাহ করার ব্যবসায় নেমে গেলেন। খুলে বসলেন তার প্রতিষ্ঠান 'গৌস্তো'।

সেদিনের সেই ছোট্ট দোকানের আজ বার্ষিক বেচা-বিক্রির পরিমাণ ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে।

শুধু তাই নয়, এখন তার ব্যবসার লগ্নিতেও রয়েছে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ।

টিমো বোলড্টের মতন এখন আরো অনেকেই এই ব্যবসায় এসেছেন।

যেমন 'সিম্পলি কুক', 'মাইন্ডফুল শেফ' ইত্যাদি নানা প্রতিষ্ঠান মিলে এই ব্যবসা এখন একটা বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যে এই শিল্প বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ডের অনেক বেশি ব্যবসা গড়ে তুলেছে।

ছবির কপিরাইট GOUSTO
Image caption প্রতি মাসে গৌস্তো এক লাখের বেশি বক্স পাঠায় মানুষের কাছে

২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে এই ব্যবসা প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাণিজ্যে পরিণত হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

গৌস্তো বর্তমানে তার লোকবল আরো বাড়াচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মী সংখ্যা যুক্তরাজ্যে ৫শ থেকে বাড়িয়ে ১২ শত হতে যাচ্ছে।

টিমোর জীবন

টিমোর জন্ম ও বেড়ে ওঠা বার্লিনে। পরবর্তীতে লন্ডনে চলে আসেন তিনি।

নিজের ব্যবসা চালু করতে সেই সময় নিজের সঞ্চয় থেকে ৭৫ হাজার পাউন্ড দিয়ে গৌস্তো চালু করেন টিমো।

পরে পরিবার আর বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে আরো প্রায় দেড় লাখ পাউন্ড অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি।

তবে, ব্যবসার একদম শুরুটা ছিল বলতে গেলে একেবারে কপর্দকহীন। তার উপর চাকরি ছেড়ে দেয়ায় মাস শেষে বেতনের টাকাটাও পাওয়া বন্ধ।

টিমো বলছিলেন, সেই সময় সারাদিন ধরে তিনি বিভিন্ন রেসিপি নিয়ে গবেষণা চালাতেন।

এসব করতে-করতেই টিমোর বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের মধ্যে একটা সাড়া পাওয়া যায়।

তবে, ব্যবসা শুরুর পর প্রথম তিন বছর নিজে কোন অর্থ পারিশ্রমিক নিতে পারেননি। তবু দিনমান গৌস্তো নিয়ে মেতে থাকতেন তিনি।

এসব করতে গিয়ে পারিবারিক জীবনেও খানিকটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ছবির কপিরাইট GOUSTO
Image caption গৌস্তোর পাঠানো রেসিপি অনুসরণ করে বানানো খাবার

টিমো বলছিলেন, "আমি আমার গ্রাহকদেরকে নিজের নাম্বারটা দিই। যদিও এই বিষয়টা আমার স্ত্রী খুব অপছন্দ করেন। কারণ এমনকি মধ্যরাতেও কেউ-কেউ ফোন করে নিজের পার্সেলের খবর জিজ্ঞেস করে।"

শুরুর দিকে টিমোর ব্যবসাটা পূর্ব লন্ডনে ভালো করে।

আরো পড়তে পারেন:

যেসব খাবারে প্রতি পাঁচ জনে একজনের অকাল মৃত্যু হচ্ছে

জেনে নিন বিশ্বের কোন খাবারগুলো পরিবেশ বান্ধব

তারপর তাদের মুখ থেকেই গৌস্তোর কথাটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে বলে জানালেন এই ব্যবসায়ী।

গৌস্তো'র যাত্রা

তরুণ ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ বা অন্টারপ্রেনারশিপ নিয়ে বিবিসির টিভি অনুষ্ঠান 'ড্রাগন্স ডেন' এ ২০১৩ সালে অংশ নিয়েছিলেন টিমো।

কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে আসা পাঁচজন ব্যবসায়ীর কেউই তখন টিমর প্রতিষ্ঠানে লগ্নি করতে রাজি হননি।

সেই সময়ে মাসে মাসে প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড করে লোকসান গুনছিলেন তিনি।

বর্তমানে গৌস্তো'র অফিস রয়েছে হ্যামারস্মিথ ও ওয়েস্ট লন্ডনে। আর নিজস্ব একটা কারখানা রয়েছে লিঙ্কনশায়ারে।

প্রতিমাসে গৌস্তো এখন গড়ে আড়াই লাখ প্যাকেট খাদ্য সরবরাহ করে।

ব্যবসায় এখনো তার লোকসান হয় বটে। কিন্তু টিমো বলছেন, তার নজর ব্যবসা প্রসারের দিকেই বেশি।

"মুনাফার চেয়ে আমরা আরো বেশি বিনিয়োগ করতে চাই।"

ছবির কপিরাইট GOUSTO
Image caption ব্রেক্সিট নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নন টিমো

কারা গ্রাহক?

মিন্টেল নামে একটি প্রতিষ্ঠান যেটি খুচরা বাজার বিষয়ে গবেষণা করে সেটির কর্মকর্তা নিক ক্যারোল বলছিলেন, যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা একটু ভালো মূলত তারাই এই ধরণের প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক।

নিক ক্যারল আরো বলছিলেন, গৌস্তোসহ এই জাতীয় আরো যত কোম্পানি আছে তাদের জন্য সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

এর মধ্যে প্যাকেজিং বা খাবার প্যাকেটজাত করাই অন্যতম প্রধান ইস্যু।

টিমো জানালেন, খাবার প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যাবহার কিভাবে আরো অন্তত ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা যায় সেই চেষ্টা তিনি করছেন।

পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্পও খুঁজছে তারা।

খাবারের অপচয় রোধেও তারা ব্যাপকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য কম্পিউটারের এলগোরিদমের সাহায্যে নিচ্ছে তারা।

তাছাড়া খাবারের প্যাকেটের যে মূল্য পড়ে সেটিও একটা চিন্তার কারণ।

প্যাকেটের দাম গত কয়েক বছরে ১০-১৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু তবু এখনো তা সস্তা নয়।

দুইজন মানুষের জন্য দুই পদের রেসিপি দিয়ে খাবারের প্যাকেট অর্ডার করলে বর্তমানে দাম পড়ে ২৪.৯৯ পাউন্ড।

টিমো বলছিলেন, ২০১৭ সালে তিনি খাবারের মূল্য কিছুটা কমাতে সক্ষম হন।

কারণ তখন তার ব্যবসাটা অর্থনৈতিকভাবে বড় পরিসরে বেড়ে ওঠে। তবে এই খাবার আরো সহজলভ্য করতে চান টিমো।

যদিও গৌস্তোকে যুক্তরাজ্যের বাইরে ছড়িয়ে দেবার কোনো পরিকল্পনা এখনি টিমোর মাথায় নেই।

তবে ব্রেক্সিটের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব তার ব্যবসায় কী পড়তে পারে - তা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত টিমো।

তার মতে, ব্রেক্সিটের ফলে, মোটাদাগে, ব্যবসায় একটা নেতিবাচক প্রভাব হয়তো পড়বে।

তবে, গৌস্তো'র উপরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদী টিমো বোলড্ট।