বিএসএফ সৈন্য নিহতের ঘটনা নিয়ে দু'রকম বক্তব্য

বিজিবি'র দেয়া ছবি: এতে চারঘাটের মৎস্য কর্মকর্তা ও স্পিডবোটে করে আসা বিএসএফ সদস্যদের দেখা যাচ্ছে বলে বিজিবি বলছে ছবির কপিরাইট বিজিবি
Image caption বিজিবি'র দেয়া ছবি: এতে চারঘাটের মৎস্য কর্মকর্তা ও স্পিডবোটে করে আসা বিএসএফ সদস্যদের দেখা যাচ্ছে বলে বিজিবি বলছে

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পদ্মা নদীতে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে এক বিবাদ ও গোলাগুলির ঘটনায় এক ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী নিহত হবার এক দিন পর ঘটনা সম্পর্কে দু'রকম বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিজিবি ও বিএসএফের আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে।

বিজিবি বলছে, বিএসএফের সৈন্যরা প্রথমে গুলি ছোঁড়ে এবং এর পরে তারা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। কিন্তু বিএসএফ বলছে, তাদের সৈন্যরা কোন গুলিই করেনি।

নিহত বিএসএফ সদস্যের নাম বিজয়ভান সিং। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান একে 'অনাকাঙ্খিত এক দুর্ঘটনা' বলে বর্ণনা করে বিবিসিকে জানিয়েছেন যে এর পর দুই বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। এ ঘটনা দু'দেশের সম্পর্কে কোন বিরূপ প্রভাব ফেলবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিজিবির সংবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকালে 'রাজশাহী ব্যাটালিয়নের অন্তর্গত চারঘাট বিওপি এলাকায় পদ্মা নদীর পাড়ে আনুমানিক ৩৫০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী ৩ জন জেলেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়।'

বাংলাদেশে বর্তমানে মা ইলিশ সংরক্ষণের জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ - তাই উপজেলার একজন মৎস্য কর্মকর্তাসহ তিন জনের একটি দল সেখানে গিয়ে একজন জেলেকে আটক করে, অন্য দুজন পালিয়ে যায়।

Image caption নদীতে টহলরত বিএসএফ সৈন্য

বিবৃতিতে বলা হয়, এর পর বিএসএফের চারজন সদস্য বাংলাদেশের সীমানার ৬৫০ গজ ভেতরে এসে ওই জেলেকে ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু বিজিবি জানায়, নিয়মানুযায়ী পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাকে হস্তান্তর করা হবে।

বিজিবির বিবৃতিতে আরো বলা হয়, "বিজিবি টহল দল বিএসএফ সদস্যদেরকে আরও জানায় যে, আপনারাও অবৈধভাবে বাংলাদেশে এসেছেন, তাই আপনাদেরকেও নিয়ম অনুযায়ী পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফের নিকট হস্তান্তর করা হবে। তখন বিএসএফ সদস্যরা আতংকিত হয়ে জোরপূর্বক ধৃত জেলেকে নিয়ে ঘটনাস্থল হতে চলে যেতে চাইলে বিজিবি সদস্যরা তাদের বাধা প্রদান করে।"

বিবৃতিতে বলা হয়, এসময় বিএসএফের লোকেরা গুলিবর্ষণ করে, এবং তখন বিজিবিও আত্মরক্ষার্থে গুলি করে।

এতে বিএসএফের একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হয়।

তবে বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ অঞ্চলের ডিআইজি এস এস গুলেরিয়া বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিজিবির ভাষ্য তারা মানতে নারাজ।

তিনি বলেন, 'বিএসএফের দিক থেকে একটি গুলিও চালানো হয় নি।'

ছবির কপিরাইট Veronique de Viguerie
Image caption ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া।

মি. গুলেরিয়া আরো জানান, "বেলা ১০:৩০ নাগাদ বাহিনীর পাঁচ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে পোস্ট কমান্ডার বিজিবি'র সঙ্গে পতাকা বৈঠক করতে যান। বৈঠকের পরেও আটক ভারতীয় মৎস্যজীবিকে ছাড়তে রাজী হয়নি এবং বিএসএফ'র সদস্যদের ঘিরে ফেলতে শুরু করে বিজিবি সদস্যরা।"

বিবিসিকে মি. গুলেরিয়া বলেন, পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে দেখে বিএসএফ দল যখন স্পীডবোটে ফিরে আসছিল, তখন হঠাৎই বিজিবি সদস্যরা গুলি চালায়।

ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, ঐ গোলাগুলিতে হেড কনস্টেবল বিজয়ভান সিংয়ের মাথায় গুলি লাগে, আর হাতে গুলি লাগে নৌকাচালকের।

আরও পড়তে পারেন:

ভারতে বিজিবির সন্তানদের লেখাপড়া, স্ত্রীদের সফর

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া যেভাবে বদলে দিচ্ছে জীবন

মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মি. সিং মারা যান বলে তারা জানান।

এই ঘটনার পরে বিএসএফ বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেখানে গিয়েছেন।

বিজিবি এবং বিএসএফ-এর মহাপরিচালকদের মধ্যে ফোনে কথাও হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই প্রসঙ্গে বিএসএফ'র অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি সলিল কুমার মিত্র বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এটা অভূতপূর্ব ঘটনা। এর আগে কখনও পতাকা বৈঠকের সময়ে গুলি চালানোর ইতিহাস নেই।"

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption দুই দেশের সীমান্তে মাছ ধরাও বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠছে।

"পতাকা বৈঠক মানেই দুই বাহিনীর সম্মতি নিয়ে আলোচনা। সেখানে কেন বিজিবি গুলি চালালো, এটাই স্পষ্ট নয়। এরকম ঘটনা অনভিপ্রেত।"

বিজিবি কর্মকর্তা ফেরদৌস মাহমুদ পরে জানান, সীমান্তে এখন কোন উত্তেজনা নেই, তবে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

কী বলছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এই ঘটনাকে 'অনাকাঙ্খিত এক দুর্ঘটনা' বলে বর্ণনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে এই ঘটনার পর দুই বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের মধ্যে যোগাযোগ চলছে।

বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে পুরো ঘটনার একটি বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ইলিশ নিষিদ্ধ মৌসুমে বাংলাদেশের জলসীমায় আটক করে রাখা এক জেলেকে বিএসএফ জোর করে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বিজিবি এতে আপত্তি জানালে বিএসএফ তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার সময় গুলি ছোঁড়ে । এর জবাবে বিজিবিও গুলি ছোঁড়ে বলে মি. খান জানান।

শুক্রবার এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসে বিষয়টার সুরাহা করা হবে বলে তিনি জানান।

এই ঘটনা দু'দেশের সম্পর্কের ওপর কোন রেখাপাত করবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সম্পর্কিত বিষয়