কীসের এত ভাব হেনরি কিসিঞ্জার আর নরেন্দ্র মোদীর?

  • শুভজ্যোতি ঘোষ
  • বিবিসি বাংলা, দিল্লি
নরেন্দ্র মোদী ও হেনরি কিসিঞ্জার। ২২ অক্টোবর, ২০১৯

ছবির উৎস, Narendra Modi/Twitter

ছবির ক্যাপশান,

নরেন্দ্র মোদী ও হেনরি কিসিঞ্জার। ২২ অক্টোবর, ২০১৯

মঙ্গলবার রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অফিশিয়াল টুইটার হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করা ছবিটা অনেককেই চমকে দিয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের লনে পাশাপাশি বসে নরেন্দ্র মোদী ও হেনরি কিসিঞ্জার, আর ৯৬ বছরের বৃদ্ধ সজোরে চেপে ধরে আছেন মোদীর হাত - একটু ঝুঁকে পড়ে দুজনে গভীর মনোযোগে কোনও কথাবার্তা বলছেন।

দিল্লিতে সাত নম্বর জনকল্যাণ মার্গের বাংলোতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পার্টিতেই সে রাতে অন্যতম অতিথি ছিলেন কিসিঞ্জার, যিনি এত বয়সেও ভারতে এসেছিলেন জেপি মর্গ্যান ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের বৈঠকে যোগ দিতে।

সেই ছবি টুইট করে নরেন্দ্র মোদী লেখেন, 'ড: হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে দেখা করে আনন্দিত বোধ করছি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে তাঁর অবদান একজন পথিকৃতের!'

এই সেই হেনরি কিসিঞ্জার - মার্কিন কূটনীতিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যার প্রবল ভারতবিরোধী ভূমিকার কথা কারও অজানা নয়।

কুখ্যাত 'নিক্সন টেপে' তো হেনরি কিসিঞ্জারকে বলতে শোনা গিয়েছিল ভারতীয়রা 'সাচ বাস্টার্ডস' (এত বড় বেজম্মা), আর ইন্দিরা গান্ধী একজন 'বিচ'!

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান ও হেনরি কিসিঞ্জার। ৩০ অক্টোবর, ১৯৭৪

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের চালানো গণহত্যাকেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন করে স্বাধীন বাংলাদেশেও তার পরিচয় এক নিন্দিত চরিত্রের।

আর সেই বাংলাদেশকেই একদা 'বটমলেস বাস্কেট' বা 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বলে কিসিঞ্জারের বর্ণনা তো প্রায় লোকগাথায় পরিণত!

কাম্বোডিয়ায় বেআইনিভাবে বোমা ফেলে গণহত্যা থেকে চিলিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত - এমন বহু ঘটনায় বারে বারে নাম জড়িয়েছে কিসিঞ্জারের।

শীতল যুদ্ধের সময়কার 'রিয়ালপলিটিকে'র মূর্ত প্রতীক বলেও তাঁকে মনে করেন অনেকেই।

এহেন হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অন্তরঙ্গতার ছবি তাই অনেকেরই চোখ কপালে না তুলে পারেনি।

শীতল যুদ্ধের পর্বে ভারতের কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করা দেব মুখার্জি যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "রাজনীতি আর কূটনীতিতে যে আসলে সবই সম্ভব, এই ছবিটা বোধহয় তার প্রমাণ।"

"ছবিটা সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করার সময় প্রধানমন্ত্রী কিসিঞ্জারের পুরনো ইতিহাস, ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক - এগুলো আদৌ মনে রেখেছেন বলে তো মনে হয় না!"

তবে দেব মুখার্জির সেই সঙ্গেই বলতে দ্বিধা নেই, "হেনরি কিসিঞ্জারের একটা সাঙ্ঘাতিক 'অরা' বা 'ইমেজ' আছে, সেটাও কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। আর তিনি যা করেছেন, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থেই করেছেন এই যুক্তিটাও তার পক্ষে দেওয়া যায়।

"হতে পারে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির 'চাণক্য' হিসেবে সম্মান তিনি অর্জন করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সেই সমীহটুকুই হয়তো তাকে দিয়েছেন - এর বেশি কিছু নয়!"

অবশ্য প্রবীণ এই সাবেক কূটনীতিক নরেন্দ্র মোদীকে কিছুটা 'বেনিফিট অব ডাউট' দিতে রাজি।

তবে ঢাকায় পররাষ্ট্রনীতির বিশেষজ্ঞ ইমতিয়াজ আহমেদ আবার মনে করছেন, এ থেকে বোঝা যায় নরেন্দ্র মোদী বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাজনীতিকরা 'মিডিয়া অ্যাটেনশনকে'ই আসলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

"মানুষ কী ভাবল না-ভাবল, আবহমান কাল ধরে একটা দেশ কী নীতি অনুসরণ করে আসছে - সেগুলোর চেয়ে এই নেতাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল মিডিয়া কীভাবে তাদের তুলে ধরছে, বা সোশ্যাল মিডিয়াতে তারা নিজেদের কীভাবে তুলে ধরতে পারছেন!"

ছবির উৎস, NArendra Modi/Twitter

ছবির ক্যাপশান,

টোনি ব্লেয়ার, কন্ডোলিজা রাইস, জন হাওয়ার্ড, রবার্ট গেটস, মোদী ও কিসিঞ্জার - যখন এক ফ্রেমে

"ঠিক এই কারণেই হয়তো নরেন্দ্র মোদী এক মুহুর্ত না-ভেবেই হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে ছবি পোস্ট করতে পারেন, আর ডোনাল্ড ট্রাম্পও মাঝরাতেই হোক বা সাতসকালে - অনর্গল টুইট করে যান", বলছিলেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।

তিনি আরও মনে করছেন, গত মাসেই টেক্সাসে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী যেভাবে কার্যত ডোনাল্ড ট্রাম্পের হয়ে নির্বাচনী প্রচার করে এসেছেন এবং সেখানে ভারতের চিরকালীন পররাষ্ট্রনীতির কোনও তোয়াক্কা করেননি - হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে ছবিতেও তার সেই 'থোড়াই কেয়ার মনোভাবই' প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যে একাত্তরে তাঁর ভূমিকার জন্য হেনরি কিসিঞ্জারকে আজও ক্ষমা করতে পারেনি, সে কথা জানিয়ে ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলছিলেন, "আজ এই দেশ অর্থনীতিতে কতটা উন্নতি করেছে, সেটা বোঝাতেও বারবার টেনে আনা হয় কিসিঞ্জারের সেই বটমলেস বাস্কেটের উপমা।"

"ফলে তিনি চাইলেও বাংলাদেশ তাকে আজও ভুলতে পারে না।"

ঘটনা হল, নরেন্দ্র মোদীর বাড়ির লনে যে পার্টিতে হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন - সেখানে মহাতারকাদের ভিড়ে তিনি একাই নন, আরও ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টোনি ব্লেয়ার, সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিজা রাইস, সাবেক অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট গেটস-ও।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

রিচার্ড নিক্সন (বাঁয়ে) ও হেনরি কিসিঞ্জার। আর্কাইভস থেকে, ডিসেম্বর ১৯৬৮

ব্রিটেনের 'দ্য গার্ডিয়ান' পত্রিকা এক নিবন্ধে এই সমাবেশকেই কটাক্ষ করে বলেছে 'মাস্টারস অব ওয়ার : আর্কিটেক্টস অব মডার্ন কনফ্লিক্টস সে চিজ ফর ক্যামেরা'!

যে শিরোনামের অনুবাদ করা যেতে পারে এভাবে - 'যুদ্ধবাজ নেতারা : আধুনিক সব সংঘাতের স্থপতিরা যখন ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে!"

হেনরি কিসিঞ্জার তো আছেনই - নরেন্দ্র মোদীর টুইট করা আর একটি ছবিতে হাসিমুখে তাদের সাথে দেখা যাচ্ছে ব্লেয়ার-রাইস-হাওয়ার্ড-গেটসকেও, যাদের সবাই কুখ্যাত ইরাক যুদ্ধের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িত ছিলেন।

গার্ডিয়ানে ওই নিবন্ধটির লেখক জুলিয়ান বোর্গার লিখছেন, "এই ব্লেয়ার বা কন্ডোলিজা রাইসরাই যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন গুজরাটে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায় হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পর তাদের দেশের সরকারগুলো মোদীকে বিলেত-আমেরিকায় ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল।"

"এখন দেখে মনে হচ্ছে সে সব কবে চুকেবুকে গেছে - আর হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর চোখের দৃষ্টিও যেন বলছে, তিনি ওই প্রবীণ 'স্টেটসম্যান'কে আপাতদৃষ্টিতে ক্ষমা করে দিয়েছেন!"

ছবির উৎস, The Guardian

ছবির ক্যাপশান,

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধ

অথচ এই হেনরি কিসিঞ্জারই পাকিস্তানের সেই স্বৈর-শাসকদের নিরন্তর সমর্থন করে গেছেন, যারা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অন্তত তিরিশ লক্ষ মানুষের নির্মম গণহত্যার জন্য দায়ী - মনে করিয়ে দিয়েছেন জুলিয়ান বোর্গার।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই গণহত্যা নিয়ে লেখা 'ব্লাড টেলিগ্রাম' বইয়ের লেখক গ্যারি বাস-ও তাই কটাক্ষের সুরে বলেছেন, "অথচ মোদী যদি (কিসিঞ্জিারের ওপর) রুষ্ট হতে চাইতেন, তার কাছে কিন্তু রসদের অভাব ছিল না!"

ভারতের 'স্ক্রোল' পোর্টালও নরেন্দ্র মোদী-হেনরি কিসিঞ্জারের হৃদ্যতার এই ছবিটি সামনে আসার পর মনে করিয়ে দিয়েছে, ১৯৭১-র জুলাইতে এই কিসিঞ্জারই যখন ভারত সফরে আসেন, সে সময়কার ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম তাঁকে মুখের ওপর স্পষ্ট বলেছিলেন, "পাকিস্তান এতটা বাড়াবাড়ি করার সাহস পাচ্ছে স্রেফ আপনাদের জন্য।"

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ইন্দিরা গান্ধী ও রবার্ট নিক্সন। নভেম্বর, ১৯৭১

কিসিঞ্জার কলকাঠি নাড়াতেই আমেরিকার সে সময়কার বৃহত্তম এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার নিয়ে একটি মার্কিন নৌবহর যে বঙ্গোপসাগরে ঢুকে পড়েছিল, নিবন্ধে উল্লেথ করা হয়েছে সে কথাও।

যে পাকিস্তান-বিরোধিতা নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, সেই তিনিই কীভাবে হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে এভাবে ছবি তুলে টুইট করতে পারেন - সঙ্গত কারণেই এ প্রশ্ন তাই অনেককে ধন্দে ফেলেছে।

স্ক্রোলের মতে এর উত্তরটা হল : অসঙ্গতি নয়, বরং এই 'পলিটিক্স অ্যাজ স্পেকট্যাকল' কিংবা 'ফোটো-অপরচুনিটি'টাই নরেন্দ্র মোদীর 'ডিফল্ট মোড'।

সোজা কথায়, দৃশ্যটার অভিঘাতই এখানে মূল রাজনীতি, ভেতরে তার যে বৈপরীত্যই লুকিয়ে থাকুক না কেন!