সামাজিক নেটওয়ার্ক কীভাবে গণতন্ত্রকে অচলাবস্থা থেকে বাঁচাতে পারে

সূর্যমুখী বিপ্লব
Image caption সূর্যমুখী বিপ্লব নামে পরিচিত একটি বিক্ষোভ এই ঐকমত তৈরির ধারণার জন্ম দিয়েছে।

একটি বিষয়ে বাস্তবে প্রায় সকলেই একমত হতে পারে: রাজনীতি এখন তীব্রভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

প্রতিদিনের ব্রেক্সিট জটিলতা, ক্যাপিটল হিল নিয়ে অন্তহীন কেলেঙ্কারি অথবা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন- আজকাল যেন অর্থবহ আপোষের জায়গাটি নাটকীয়ভাবে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

তার পরিবর্তে, এখন সময় হল ঘটনার গভীরে গিয়ে নিজের দাবির জন্য শুধু লড়ে যাওয়া। কোন আত্মসমর্পণ করা নয়।

এটি আরও গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয় - যেমন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যদি এতো মতবিরোধ থাকে তাহলে গণতন্ত্র আরও পঙ্গু হয়ে যায়।

বিষয়গুলো এমনটা না হয়ে যদি অচলাবস্থা ভাঙতে এবং নির্বাচনী প্রতিনিধিদের আবার একত্রিত করতে নতুন কোন উপায় পাওয়া যেতো তাহলে কেমন হতো?

ট্রাম্পকে ঘিরে কিংবা ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তার থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে একটি সমাধান পাওয়া যেতে পারে।

গত পাঁচ বছর ধরে, তাইওয়ান এসব জটিল বিষয়ে সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন একটি উপায় তৈরি করেছে। সেখানে রাজনীতির সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে তারা।

কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এতে অধিকাংশকে ঐকমত আনা গেছে যেখানে অন্য অনেক উপায় টিকতে পারেনি।

এটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, যখন তাইওয়ান একটি বাণিজ্য বিলকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে যায়।

অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে এই আইন হংকংয়ের মতো তাদের দেশকেও চীনের আরও কাছে নিয়ে যাবে।

Image caption ২০১৪ সালের মার্চ মাসে প্রায় আড়াইশো শিক্ষার্থী তাইওয়ানের পার্লামেন্টে হামলা চালায়।

এর প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং সপ্তাহব্যাপী পার্লামেন্ট দখল করে রাখে যা কিনা সানফ্লাওয়ার রেভল্যুশন বা সূর্যমুখী বিপ্লব হিসাবে পরিচিতি পায়।

কারণ তারা সূর্যমুখী ফুলকে আশার প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করেছিল।

"বিক্ষোভকারীদের পার্লামেন্টে প্রবেশের আগের রাতে আমি সেখানে ছিলাম," অড্রে তাং বলেন।

তিনি তাইওয়ানের ক্রমবর্ধমান নাগরিক হ্যাকারদের শীর্ষস্থানীয় সদস্য ছিলেন যারা এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছিল।

এবং বিক্ষোভের ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকার এক পর্যায়ে এই হ্যাকারদের সহায়তা চায়।

কিছু হ্যাকারদের সরকারে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং সে সময় তাং-কে তাইওয়ানের ডিজিটাল মন্ত্রী করা হয়।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি নতুন প্রক্রিয়া ডিজাইন করা যাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ একই ছাদের নীচে যোগ দিতে পারে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে।

তবে এই প্রক্রিয়াটির পক্ষে জনমত তৈরি করতে হয়েছিল যেন সরকার একে নতুন আইন ও বিধিবিধানে রূপান্তর করতে পারে।

তাদের এই উদ্ভাবনের নাম ছিল ভি-তাইওয়ান - "ভি" অক্ষরটি দিয়ে ভার্চুয়াল বোঝানো হয়েছে-এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য আগ্রহী দলগুলো বিতর্কিত ইস্যুগুলো নিয়ে সুচিন্তিত মতামত দিতে পারে।

এটি প্রথমে, ঘটনায় জড়িতদের কাছ থেকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যগুলো খুঁজে বের করে এবং সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করে।

তারপরে ব্যবহারকারীরা পল.ইস নামে একটি বিশেষ সামাজিক মিডিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে।

ছবির কপিরাইট VTAIWAN
Image caption এই স্ক্রিনশটটি পল.ইস- এর মাধ্যমে চলমান উবারের আলোচনার প্রক্রিয়াটি দেখা যায়।

এর মাধ্যমে তারা কোন বিষয় কীভাবে সমাধান করা উচিত সে সম্পর্কে বিবৃতি তৈরি করে এবং অন্যান্যদের বিভিন্ন পরামর্শের সঙ্গে একমত বা দ্বিমত পোষণ করে জবাব দেয়।

এভাবে তারা একবার "মোটামুটি ঐকমতে" পৌঁছে গেলে, লাইভস্ট্রিম বা মুখোমুখি সভার আয়োজন করা হয় যাতে অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট সুপারিশগুলি নিয়ে নিতে পারে।

রাইড-হেইলিং রো

প্ল্যাটফর্মটি প্রথমে উবারের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার কাজ করতো।

রাইড পরিষেবাটি তাইওয়ানে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে প্রচলিত ট্যাক্সি শিল্প সংশ্লিষ্টরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

কারণ মার্কিন সংস্থাটি এই উবার চালকদের জন্য পেশাদার লাইসেন্স রাখা বা একই ধরণের বীমা রাখার কোন শর্ত আরোপ করেনি। স্থানীয় সংস্থাগুলির মতো তাদের করও দিতে হত না।

গ্রাহকরাও অবশ্য উবারের কারণে কম ভাড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধাগুলো উপভোগ করছিল।

অচলাবস্থা ভাঙার জন্য, ভি-তাইওয়ান বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অনলাইনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

পল.ইস তাদের সবাইকে নিজেদের সংকীর্ণ জায়গা থেকে তুলে সামনে আনে।

এটি মূলত সবার মতবিরোধের অনেকগুলো অক্ষের মধ্যে বিচরণ করে একটি মানচিত্র তৈরি করে।

সেখানে দেখা যায় যে তাদের পুরো বিতর্ক জুড়ে কোন কোন বিষয়গুলো বেশি উঠে এসেছে।

এভাবে বিভিন্ন মনোভাবের বিভিন্ন দলের উত্থান হয়।

Image caption ভি-তাইওয়ান প্রক্রিয়াটি অংশগ্রহণকারীদের সাধারণ অবস্থানে আনার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

ট্যাক্সি চালক, উবার চালক, উবার যাত্রী এবং অন্যান্য যাত্রীরা মানচিত্রের চার কোণে নিজস্ব মতামতের এমন চারটি খুঁটি তৈরি করে।

সেখানে কোন রিপ্লাই বা জবাবের বোতাম ছিল না, তাই তারা একে অপরের পোস্টগুলোকে ঘিরে ট্রল করতে পারেনি।

এবং যে বার্তাগুলো তাদের চার ভাগে ভাগ করেছে সেসব বার্তা দেখানোর পরিবর্তে সেগুলোকে অদৃশ্যমান রাখা হয়।

বরং যেগুলো মতামত অপর কোন দলের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বা কাছাকাছি যাচ্ছে সেগুলোকে সামনে আনা হয়।

বিভিন্ন গ্রুপ থেকে শুরু করে নিজেদের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি অনেকটা অক্সিজেনের মতো কাজ করে।

এই প্রক্রিয়াটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কলিন মেগিল বলেছেন, "তথ্যের কাঠামোটি পরিবর্তন করলে আপনি ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরতে পারবেন"।

প্রযুক্তিগতভাবে, এই ধাক্কা সাময়িক হলেও রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব ছিল অনেক।

গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডিং বা অপমানের বিস্তারকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে, এখানে ঐকমতের সন্ধান করা হয়।

তাং বলেন, "এর ফলে মানুষেরা তাদের মতামত খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতা করে যা বেশিরভাগের মন জয় করতে পারে।"

"তারা খরগোশের গর্ত অনুসন্ধানের পরিবর্তে পারস্পরিক মিলগুলো আবিষ্কার করতে অনেক বেশি সময় ব্যয় করে।"

মেজাজ ঠিক করা

বিতর্ক অব্যাহত থাকা অবস্থাতেই এই মানুষগুলো যখন আরও বেশি বেশি তাদের মতামত দিচ্ছিল তখন পোল.ইসে দেখা যায় যে চারটি দল দুটি হয়ে গেছে।

"অবিচ্ছিন্নভাবে, তিন বা চার সপ্তাহের মধ্যে, আমরা এমন একটি আকার খুঁজে পাই যেখানে বেশিরভাগ সময় বেশিরভাগ লোকেরা বেশিরভাগ বিবৃতিতে একমত হয়।" তাং বলেন, "

একমাস পরে, "একমত হওয়া বিষয়গুলো" উত্থিত হয়, যা সবার সমর্থন পায়।

Image caption ভি-তাইওয়ান অন্যান্য বিরোধের মধ্যে অনলাইন অ্যালকোহল বিক্রয় সম্পর্কে মতবিরোধ নিষ্পত্তি করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

এভাবে একটি দল ৯৫% সমর্থন অর্জন করতে পারে। তারা বলে, "ট্যাক্সি শিল্পের পরিচালনা ও মান উন্নত করার জন্য সরকারের এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত যাতে উবারের মতো ট্যাক্সিতেও চালক ও গ্রাহকরা একই মানের পরিষেবা উপভোগ করতে পারে।"

এই বছরের জুলাইয়ে, ভি-তাইওয়ান, ই-যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত সভা পর্যন্ত পৌঁছায় এবং আয়োজকরা অংশগ্রহণকারীদের একটি সহযোগী মেজাজে রাখার চেষ্টা করেছিল।

ঘরটিতে হালকা আলো জ্বলছিল, প্রত্যেকে একসাথে খাবার খেয়েছিল এবং টেবিলে কেবলমাত্র সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় যেগুলো ইতিমধ্যে পোল.ইস চিহ্নিত করেছে। এবং সেখানে শুধুমাত্র একমত হওয়া বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা হয়।

এটি তাদের অ্যাপের মাধ্যমে শুধু ভোট দিতে বলেনা। এর কাজ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

ভি-তাইওয়ান অংশগ্রহণকারীদের কেবল উত্তর নির্ধারণের জন্য নয়, বরং প্রশ্ন বের করতে এজেন্ডা-সেটিংয়ের ক্ষমতা দেয়।

এবং এটি এক পক্ষের চাইতে আরেক পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি না কম সেটা বের করার দিকে লক্ষ্য রাখেনা। বরং তাদের মতের মিলগুলো খুঁজে বের করে।

যখন মত পার্থক্যগুলো ঐকমতে রূপান্তরিত হয় সরকার এ নিয়ে কাজ করতে পারে।

নতুন পাস হওয়া বিধান অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের উবারে যোগ দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এবং নিয়মিত ট্যাক্সিগুলিকে অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে।

আরও পড়তে পারেন:

ফেসবুক-মেসেঞ্জার হ্যাক হওয়া ঠেকাবেন যেভাবে

ফেসবুকে ইসলাম অবমাননা: ধর্মীয় নাকি রাজনৈতিক বিষয়

বিপ্লবের আইডি কে হ্যাক করলো তা এখনো অজানা

উবারের পরে, এটি ১১টি আইন, বিধিবিধান এবং আরও আটটি বিল যেগুলো কিনা এখনও আইন হয়নি সেগুলোর এজেন্ডা ঠিক করার কাজে নামে।

অনলাইনে অ্যালকোহল বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বন্ধে নতুন আইন সবকিছুই তার মধ্যে রয়েছে।

তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

ভি তাইওয়ান এখনও বাস্তব, জাতীয় ইস্যু নিয়ে কোন পরীক্ষা করেনি। এবং এটি সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ায় হওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে যে এতে ডিজিটালি কম পারদর্শী অথচ চিন্তাশীল গোষ্ঠী বাদ পড়তে পারে।

তবে তাইওয়ানের পরীক্ষা আমাদের সবার জন্য বড় ধরণের শিক্ষা হতে পারে।

গণতন্ত্রকে কোনও বিশেষ আকারে জীবাশ্ম বা হিমায়িত করার প্রয়োজন নেই। যা বিকশিত হয় তা-ই সম্ভবত টিকে থাকতে পারে, এমনকি সমৃদ্ধ হতে পারে। এই পৃথিবীতে তারা যে চাপ ও চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয় সেগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।