ধর্ম নিয়ে সহিংসতা উস্কে দেয়া এতো সহজ কেন?

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ধর্ম নিয়ে সহিংসতা উস্কে দেয়া এতো সহজ কেন?

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চেয়ারম্যানবাড়ি বাজার। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে এই চায়ের দোকানে বসেই আড্ডা দিচ্ছিলেন জনাবিশেক স্থানীয় মানুষ। তাদের কারো কারো হাতে স্মার্ট ফোন।

এদেরই একজন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। পেশায় শ্রমিক, পড়ালেখা তেমন নেই।

ভোলায় ইসলামের নবীকে কটূক্তির কথিত ঘটনা তিনি ফেসবুকের মাধ্যমেই জেনেছেন। বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে একটু ক্ষোভও আছে বোঝা গেলো।

তিনি বলছিলেন, 'নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহিওয়াসাল্লামকে কটুক্তি করছে। এইটা নিয়া প্রতিবাদ তো হবেই। মানুষ ফেসবুকে ভিডিও দিচ্ছে। বলতেছে যে এইটা ভালো না।'

আপনি কি এরকম ভিডিও লাইক বা শেয়ার করেন? এমন প্রশ্নে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

এবার তাকে জিজ্ঞেস করি, ফেসবুকে যে সত্যি সত্যিই একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ ইসলামের অবমাননা করেছে, সেটা তিনি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন?

তার উত্তর 'হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মানুষ এটা নিয়া কথা বলতেছে, আন্দোলন করতেছে। সত্য না হইলে কি এতো লোক নামতো?'

বাংলাদেশে শাহাবুদ্দিনের মতো আরো অনেকেই আছেন, যাদের কাছে ধর্ম সবসময়ই অনেক স্পর্শকাতর বিষয়।

ধর্ম অবমাননার যে কোন অভিযোগ, সেটা সত্য হোক কিংবা মিথ্যা, এসব লোককে খুব সহজেই বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

'কক্সবাজারের রামু কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

প্রথমে ফেসবুকে এরপরে মুখে মুখে ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। যার পরিণতি হয়, সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক বিদ্বেষ এবং এর পথ ধরে হামলা ও লুটপাট।

ছবির কপিরাইট STR
Image caption রামু, নাসিরনগর, ভোলা সবক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হয় ধর্ম অবমাননার কথিত ফেসবুক পোস্ট থেকে।

ব্যাপক বিক্ষোভ এবং হামলার নেপথ্যে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার কথিত পোস্ট নিয়ে যে ব্যাপক প্রচারণা হয়, পরে বিক্ষোভের আয়োজন হয় এবং শেষে হামলার ঘটনা ঘটে এর পেছনে কোন একটা গোষ্ঠীর ভূমিকা আছে বলেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন।

তিনি বলছিলেন, 'কোন কথায় আমরা কতটা উত্তেজিত হবো তার কিন্তু একটা পলিটিক্স আছে। দেখেন আমাদের মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে, নানারকম অনিয়ম হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে কিন্তু মানুষ এতো হাজারে হাজারে লাখে লাখে জড়ো হচ্ছে না।'

'আজকে আমাদের দেশে এই বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলেছে এ কথাটি যদি প্রচার করা যায়, তাহলে কিন্তু যে কোন বিপর্যয় করা সম্ভব।'

২০১২ সালে রামু'র ঘটনায় ফেসবুকে ইসলাম অবমাননার কথিত অভিযোগ আনা হয়েছিলো উত্তম বড়ুয়া নামে একজনের বিরুদ্ধে।

একইভাবে ২০১৬ সালে নাসিরনগরে রসরাজ এবং এবারে ভোলার ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়েছে বিপ্লব নামে আরেকজনের বিরুদ্ধে।

যদিও প্রতিটি ঘটনাতেই পুলিশ বলছে, ঐসব ব্যক্তিদের একাউন্ট হ্যাক করে কিংবা কাউকে ট্যাগ করে এসব কথিত অবমাননার বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছিলো।

কিন্তু ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অন্যের নামে এসব পোস্ট কারা করছে সে বিষয়ে পরে আর কোন তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ।

এমনকি প্রতিটি ঘটনাতেই ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হলেও পুলিশ ফেসবুকে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেও সমালোচনা আছে।

কাবেরী গায়েন বলছেন, ফেসবুকে কারা অন্যের একাউন্ট হ্যাক করে সংঘাত তৈরি করছে, পুলিশ সেটা চিহ্নিত করতে পারছে না। এবং এগুলো যে কারো কারসাজি সেই তথ্যটাও দ্রুততার সঙ্গে প্রচার করতে পারছে না।

এমনকি কারা ফেসবুক আইডি হ্যাক করে পোস্ট দিচ্ছে তাদেরও চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

এছাড়া বিক্ষোভ থেকে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হওয়াও ঠেকাতে পারেনি আইন-শৃংখলা বাহিনী।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption ভোলা, নাসিরনগর, রামু সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিটি ঘটনাতেই ব্যাপক ভাংচুর, লুটপাট করা হয়।

পুলিশ কী বলছে?

পুলিশ অবশ্য বলছে, ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় কথিত এসব পোস্ট খুব দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু নজরে আসা মাত্রই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলছিলেন, 'কোন একটি তথ্যের সত্যতা যাচাই করে সে বিষয়ে জনগনের জন্য একটি বিবৃতি দিতেও কিন্তু একটু সময় লাগে। আমরা চেষ্টা করছি রেসপন্স টাইমটি আরো কমিয়ে এনে কতো দ্রুততার সাথে মানুষের কাছে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরা যায়।'

'তবে এ ক্ষেত্রে একটি বাধা হচ্ছে, ফেসবুকের সহযোগিতা নিতেও একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের যেতে হয়। এতে সামান্য কিছু দীর্ঘসূত্রতা থাকে। কিন্তু এ ধরণের অপকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।'

নেপথ্যে রাজনীতি?

ভোলার সর্বশেষ ঘটনায় নবী অবমাননার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ডেকে হাজার হাজার লোকের জমায়েত করেছিলো তৌহিদি জনতা নামে একটি সংগঠন।

অন্যদিকে একই বিষয়ে ঢাকায় সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম। সমাবেশ হয় আরো কয়েকটি স্থানে।

বারবার একইভাবে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ এবং পরে ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা এসবের পেছনে একধরণের রাজনীতি আছে বলেই মনে করেন কাবেরী গায়েন।

তার মতে, এই রাজনীতি হচ্ছে সরকার এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী উভয় পক্ষ থেকেই।

তিনি বলছেন, 'ধর্মকে রাষ্ট্র কিভাবে ডিল করে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আপনি দেখেন, এখানে হেফাজতের উত্থান হয়েছে, ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে অনেক বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে সরকার। এখানে একটা ভোটের রাজনীতিও আছে।'

'সরকারও আসলে একটু নড়বড়ে এখানে। সেও মনে করে যে ধর্মকে নিয়ে যারা রাজনীতিটা করছেন তাদের বিরুদ্ধে গেলে তার ভোটের হিসাব-নিকাষ কী হবে? ফলে যে বার্তাটি যেভাবে যত জোরালোভাবে দেয়া দরকার ছিলো সেটা দিচ্ছে না। কিন্তু এতে করে ঘটনার পুনরাবৃত্তিও তো ঠেকানো যাচ্ছে না।'

অধ্যাপক গায়েন বলছেন, রামুতে প্যাগাডো বানিয়ে দেয়া হয়েছে কিন্তু বিচার শেষ হয়নি। কোন ঘটনারই বিচারকাজ শেষ হয়নি। এটা জরুরী।

একই সঙ্গে কারা ফেসবুক একাউন্ট হ্যাক করছে, তাদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।

সেটা না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। এবং এক্ষেত্রে সরকারকে আরো সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে।

সম্পর্কিত বিষয়