সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ বাংলাদেশে আসার সংখ্যা বাড়ছে

বাংলাদেশ, নারীশ্রমিক, শ্রমবাজার, সৌদি আরব,মধ্যপ্রাচ্য। ছবির কপিরাইট NURPHOTO
Image caption সৌদি আরব থেকে এবছর ৯০০ বাংলাদেশী নারী শ্রমিক ফেরত এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই সেখানে নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

সৌদি আরবে গৃহকর্মি হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের দেশে ফেরার প্রবণতা বাড়ছে।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা বলেছে, সেখানে ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এবছর ৯০০ জনের মতো বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মি দেশে ফেরত এসেছে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ দেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। এই বিষয়টিকেই বেশি উদ্বেগজনক বলে বলা হচ্ছে।

ফেরত আসা নারী শ্রমিকরা ধর্ষণসহ নানাভাবে নির্যাতিত হওয়ার অভিযোগ করছেন।

সরকারি কর্মকর্তারাও বলছেন, এসব অভিযোগের কিছুটা সত্যতা আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে-এই প্রশ্ন অনেকে তুলছেন।

এ বছর সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশী নারী গৃহকর্মির ৪৮ জনের মৃতদেহ দেশে আনা হয়। তাদের মধ্যে ২০ জনই সৌদি আরবে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন।

বেসরকারি সংস্থা ব্রাক এর অভিভাসন কর্মসূচির কাছ থেকে এই পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

সংস্থাটি বলেছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মির কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশী নারীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর কোন বিচার হচ্ছে না।

খুলনার খালিসপুর এলাকা থেকে সালমা বেগম বলছিলেন, সৌদি আরবে নির্যতনের কারণে তার ছোট বোনের মৃত্যু হয়েছে। কোন বিচার তারা চাইতেই পারেননি। মৃতদেহও পেয়েছেন ঘটনার অনেক পরে।

"নির্যাতনে কারণে আমার ছোট বোন সৌদিতে একটা পরিবারের কাছ থেকে পালিয়ে থানায় গিয়েছিল। কিন্তু পরিবারটি থানা থেকে ফেরত নিয়ে আবার নির্যাতন চালিয়েছিল।তখন তার মৃত্যু হয় বলে আমরা জানতে পেরেছি।"

"আমার বোনের মৃত্যু হয়েছে মার্চের ৪ তারিখে। কিন্তু আমরা মৃতদেহ পেয়েছি গত মাসের ২০ তারিখে। যদিও হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদের সার্টিফিকেট দিয়েছে, কিন্তু মাথার পিছনটা ছিল ভাঙা এবং বিভৎস। নির্যাতনের চিহ্ন ছিল শরীরেও।"

সৌদি আরবে একজন গৃহকর্মিকে নিয়ে যাওয়ার পর একটি পরিবার থেকে আরেকটি পরিবারের কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য মক্তব নামের কিছু প্রতিষ্ঠানও আছে।

এমন বিক্রির শিকার বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি এলাকার ২৬ বছরের একজন নারী। স্বামী এবং এক শিশু সন্তান দেশে রেখে ভাগ্য বদলের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য বাড়ির দুই তলা হতে লাফ দিয়েছিলেন।

মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে পঙ্গু হলেও তিনি অন্তত জীবনটা নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন।

"সৌদিতে যাওয়ার পর এক পরিবারে থাকলাম ৭ মাস। সেখানে প্রতিদিন মারধোর এবং নির্যাতন চলে। আর বেতন চাইলে নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে ঐ পরিবার আমাকে মক্তবের মাধ্যমে আরেকটা পরিবারের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখান থেকে পালানোর জন্য ঐ বাড়ির দুই তলার জানালা দিয়া বাইরে লাফ দিয়েছিলাম। তখন রাস্তার লোক আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।"

"আমি হাসপাতালে দুই মাস ছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেভ হোমে চারমাস থাকার পর দেশে ফিরছি।"

ছবির কপিরাইট BRAC
Image caption সৌদিতে যে বাড়িতে কাজ করতেন যাত্রাবাড়ীর তানিয়া সেখানে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেয়া হয়।

আরো পড়তে পারেন?

সৌদি আরব থেকে শ্রমিক ফেরত, চিন্তিত দূতাবাস

'বাঁচতে হলে লাফ দেয়া ছাড়া উপায় কি'?

সৌদি আরব থেকে শ্রমিক ফেরত, চিন্তিত দূতাবাস

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন নারী বলছিলেন, কয়েকদিন আগে ১৮ জন নারীর সাথে তিনি ফিরেছেন। ধর্ষণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেন্টারে দুই মাস ছিলেন আরও দুইশ জন বাংলাদেশী নারীর সাথে। তাদের পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, এই সংগঠনের সুমাইয়া ইসলাম বলছিলেন, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের ফেরত আসার মিছিল যে থামছে না, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

সৌদি আরবে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালে নারী গৃহকর্মি পাঠানোর শর্তে সেই বাজার খুলেছিল।

সে সময়ের চুক্তির পর চার বছরে প্রায় তিন লাখ গৃহকর্মি সৌদি আরবে গেছে। এর মধ্যে আট হাজারের মতো ফেরত এসেছে বলে সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে। ফেরত আসার সংখ্যাটা বেশি নয় বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদিতে ২০ লাখের বেশি পুরুষ শ্রমিক আছে। তাদের বিষয়টি সরকার বিবেচনায় রাখছে। এছাড়া পুরুষ শ্রমিকদের যাওয়া অব্যাহত আছে। এই শ্রমবাজার আবার বন্ধ হোক সেটা বাংলাদেশ চায় না বলে তারা মনে করছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সাবিহা বারী বলছিলেন, সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মি পাঠানো অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সরকার কোন সমস্য দেখছে না।

"আমরা যে দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠাচ্ছি, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ফেরত আসার কথা না। কিন্তু তারা বিদ্রোহ করে ফেরত আসছে।"

কিন্তু নির্যাতন সম্পর্কিত নানা অভিযোগের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এই কর্মকর্তা বলেছেন, "এটা কিছুটা ঠিক, তবে সম্পূর্ণ ঠিক সেটা আমি বলবো না।"

তবে তিনি বলেছেন, এসব অভিযোগের ব্যাপারে বিভিন্ন সময় তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছেন।

আরো পড়তে পারেন?

দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ সাকিব আল হাসান: আইসিসি

ইউরোপের উগ্র-দক্ষিণপন্থী এমপিরা কেন কাশ্মীরে?

আল-বাগদাদির অন্তর্বাস চুরি করে ডিএনএ পরীক্ষা

মাদ্রাসার ছদ্মবেশে নির্যাতন কেন্দ্র : ভয়ঙ্কর সব তথ্য