সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্তে আমরা শুধু সম্মতি দিয়েছিলাম: বিবিসিকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড

মুম্বাইতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সদর দপ্তর ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption মুম্বাইতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সদর দপ্তর

বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে আইসিসির তদন্তে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল না বলে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আজ দাবি করেছে।

তবে বিবিসির কাছে বিসিসিআই এ কথাও জানিয়েছে, আইসিসিকে তারা এই তদন্ত চালানোর 'সম্মতি' দিয়েছিলেন।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি দমন ইউনিটের (এসিইউ) প্রধান অজিত সিং শেখাওয়াত আজ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, "এখানে (সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্তে) আমরা কিছুই করিনি। বস্তুত আইসিসি-ই একটি ব্যাপার নিয়ে তদন্ত করছিল, যাতে কিছু আন্তর্জাতিক ইস্যু জড়িত ছিল - আর সেখানে আইপিএলের নামও এসেছিল।

"সুতরাং (আইপিএলের আয়োজক সংস্থা হিসেবে) বিসিসিআই এই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইসিসিকে সায় দিয়েছিল, এটুকুই শুধু বলতে পারি।"

ছবির কপিরাইট Ajit Singh/Facebook
Image caption অজিত সিং শেখাওয়াত

সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে আইসিসির দীর্ঘ রায়ে আইপিএলের যে ম্যাচটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি খেলা হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৬শে এপ্রিল।

ওই ম্যাচটিতে সাকিবের টিম সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে ১৩ রানে জেতে।

ভারতীয় বোর্ড সূত্রে আরও বলা হচ্ছে, সেই আইপিএল মৌশুমে দুর্নীতি-দমন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় তদারকির দায়িত্বে ছিল আইসিসি নিজেই, সুতরাং সেখানে বিসিসিআইয়ের প্রত্যক্ষ কোনও ভূমিকা থাকার কথাও নয়।

ওই আইপিএল মৌশুম চলাকালীনই অজিত সিং শেখাওয়াত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে দুর্নীতি দমন ইউনিটের দায়িত্ব নেন।

তবে তার কথা থেকে এটা স্পষ্ট, নির্দিষ্ট অভিযোগে সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পরই আইসিসি বিষয়টি ভারতীয় বোর্ডকে জানিয়েছিল এবং আইপিএলের একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে সাকিবের বিরুদ্ধে যে তদন্ত চলছে - বিসিসিআই সে বিষয়ে অবহিত ছিল।

কে এই 'বুকি' দীপক আগরওয়াল?

যে সন্দেহভাজন ক্রিকেট বুকির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জেরে সাকিব আল হাসান অন্তত এক বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হলেন, সেই দীপক আগরওয়ালের পরিচয় নিয়ে অবশ্য এখনও খুব বেশি কিছু জানা যাচ্ছে না।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের সতীর্থদের সাথে সাকিব আল হাসান

তবে ভারতে ক্রিকেটকে ঘিরে যে বিরাট বেআইনি জুয়া ও বেটিংয়ের চক্র চালু আছে, তার খোঁজখবর রাখেন এমন অনেকেই বলেছেন দীপক আগরওয়াল এই সার্কিটে একজন 'পরিচিত মুখ'।

ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তাকে বর্ণনা করা হচ্ছে একজন 'ব্ল্যাকলিস্টেড' বা কালো তালিকাভুক্ত বুকি হিসেবে।

দীপক আগরওয়াল প্রসঙ্গে অজিত সিং শেখাওয়াত বিবিসিকে বলেন, "ইনি ব্ল্যাকলিস্টেড কি না বলতে পারব না, মিডিয়া তো অনেক ধরনের শব্দই ব্যবহার করে। তবে আমাদের ভাষায় তিনি একজন 'পার্সন অব ইন্টারেস্ট'।"

"মানে কিছু লোকজন এই খেলাটাকে সাবভার্ট বা হেয় করার চেষ্টা করে থাকে, ইনি তাদেরই একজন।"

"আমরা তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখার চেষ্টা করি, খেলোয়াড়রা যাতে এদের সঙ্গে না-মেশে সে ব্যাপারে সাবধান করে দিই।"

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ঢাকায় বিসিবি সভাপতির সঙ্গে সাকিব। ২৯ অক্টোবর ২০১৯

"তবে শেষ পর্যন্ত আমরা তো আর পুলিশ নই, ফলে এর চেয়ে বেশি কিছু করার থাকে না," বলেন মি শেখাওয়াত, যিনি কর্মজীবনে অবসর নিয়েছেন রাজস্থান পুলিশের মহাপরিচালক হিসেবে।

'ক্রিকেট বুকি' দীপক আগরওয়ালের সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে গিয়ে বিবিসি অন্তত দুটি ঘটনার খোঁজ পেয়েছে - যার দুটিতেই অভিযুক্তের নাম দীপক আগরওয়াল।

প্রথম ঘটনায় ২০১১ সালে রাজস্থানের উদয়পুর শহরের ঘন্টাঘর এলাকায় বিজয় কুমার নামে এক উঠতি ক্রিকেটার ক্রিকেট বেটিং চক্রে জড়িয়ে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।

নিজের সুইসাইড নোটে তিনি নিজের এই পরিণতির জন্য দায়ী করে গিয়েছিলেন দীপক আগরওয়ালকে। অভিযোগ করেছিলেন, দীপকই না কি তাকে ক্রিকেট জুয়ার চক্রে টেনে এনেছিলেন।

উদয়পুর শহরের পুলিশ কর্মকর্তাও তখন এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, দীপক আগরওয়ালের কাছ থেকে ৫ লক্ষ রুপি আদায় করে তার পরিবারকে দেওয়ার জন্য সুইসাইড নোটে অনুরোধ করে গেছেন নিহত ওই যুবক।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ভারতীয় বুকিদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করছেন মার্ক ওয়া ও শেন ওয়ার্ন। ডিসেম্বর ১৯৯৮

দ্বিতীয় ঘটনায় ২০১৭ সালে ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের পুলিশ ক্রিকেটের স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে রায়গড় শহরে জনৈক দীপক আগরওয়ালকে গ্রেফতার করে।

সেই ঘটনায় দুই সঙ্গী সমেত দীপক আগরওয়ালকে জেলেও যেত হয়, তবে কিছুদিনের ভেতরই তিনি ছাড়া পেয়ে যান।

তবে এই দুটি ঘটনায় জড়িত দীপক আগরওয়াল আর সাকিব আল হাসানের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ এক্সচেঞ্জে জড়িয়ে পড়া দীপক আগরওয়াল একই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিতভাবে এখনও বলা যাচ্ছে না।

'ভারতীয় বুকি'রা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য বিপদ?

২০০০ সালে দিল্লি পুলিশের আসা একটি টেপ থেকে উদ্ধার হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রোনিয়ে আর ভারতীয় একজন বুকমেকার সঞ্জয় চাওলার মধ্যে গোপন কথাবার্তা।

সেই তদন্তের সূত্র ধরেই হ্যান্সি ক্রোনিয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ পরে প্রমাণিত হয়। ক্রোনিয়ে নিজের দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কাছে অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হন।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption অনুশীলনে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। তখনও দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক

সঞ্জয় চাওলা ছিলেন লন্ডন-প্রবাসী একজন ভারতীয় বংশোদ্ভুত ক্রিকেট বুকি। তিনি ও ভারতে তার সঙ্গী রাজেশ কালরা মিলেই ক্রোনিয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকা দলের আরও কিছু ক্রিকেটারকে ফিক্সিংয়ে টেনে এনেছিলেন।

এর কিছুদিন পরেই ভারতীয় দলের তৎকালীন ক্যাপ্টেন মহম্মদ আজহারউদ্দিনকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় বোর্ড।

অজয় জাডেজা, মনোজ প্রভাকর, নয়ন মোঙ্গিয়াসহ আরও কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটারের ওপরও শাস্তি নেমে আসে।

আজহারউদ্দিনসহ এই তারকাদেরও ক্রিকেট বেটিং জগতের সঙ্গে যোগসূত্র ছিলেন মুকেশ গুপ্তা নামে একজন ক্রিকেট বুকি।

দক্ষিণ দিল্লির বাসিন্দা মুকেশ গুপ্তা 'জন' বা 'এমকে' নামেও পরিচিত ছিলেন। পারিবারিকভাবে স্বর্ণালঙ্কারের ব্যবসা থাকলেও ক্রিকেট বেটিংয়ের মারফত তিনি বিপুল অর্থসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন বলে অভিযোগ।

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আজহারকে বেটিংয়ে টেনে আনতে ভূমিকা ছিল মুকেশ গুপ্তা নামে একজন বুকির

দিল্লি-মুম্বাই-লন্ডনের ভারতীয় কিংবা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেট বুকিরাই বিশ্ব ক্রিকেটে বড় বড় তারকাকে বারেবারে বিপদে ফেলেছেন - সেই তালিকায় দীপক আগরওয়াল হলেন সবশেষ সংযোজন।

এ প্রসঙ্গে অজিত সিং শেখাওয়াত বিবিসিকে বলেন, "বিশ্ব ক্রিকেটকে এই 'ভারতীয়' বুকিরা কলুষিত করছে কি না সেটা আইসিসি-ই ভাল বলতে পারবে।"

"তবে হ্যাঁ, আমাদের জন্যও এই বুকিরা বিরাট মাথাব্যথা কোনও সন্দেহ নেই - এদের ওপর সব সময় আমাদের নজর রাখতে হয়, অ্যালার্ট থাকতে হয়।"

বিশ্ব ক্রিকেটের দুর্নীতি দমন কর্মকর্তারা 'অ্যালার্ট' ছিলেন বলেই যে সাকিব আল হাসানের ওপর নিষেধাজ্ঞার সাজা নেমে এল, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই।