কৃষকের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের ধান কেনার নতুন সিদ্ধান্তে কৃষকের কী লাভ হবে

  • কাদির কল্লোল
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ধান, কৃষি, বাংলাদেশ

ছবির উৎস, SOPA IMAGES

ছবির ক্যাপশান,

ধান নিয়ে গত বছর কৃষকরা বেশ বিপাকে পড়েছিলেন

বাংলাদেশ সরকার এবার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত বছর চালকল মালিকদের মাধ্যমে সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

এখন আমন মৌসুমে আগামী ২০শে নভেম্বর থেকে প্রতিকেজি ২৬টাকা দরে ৬লাখ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে।

দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত এক গ্রামের কৃষক রওশন আরা বেগমকে হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তান নিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে।

তিনি গত বছর চার বিঘা জমিতে ধান চাষ করে খরচের টাকা তুলতে পারেননি।

চালকল মালিকরা ধান না নেয়ায় তিনি অনেক কম দামে ধান বিক্রি করেছিলেন।

এবার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারের ধান কেনার খবরে তিনি খুশি হয়েছেন।

কিন্তু এর প্রক্রিয়া কী হবে-প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ্ব হবে এবং তারা আসলে কতটা লাভবান হবেন, তার উপাদন খরচ উঠবে কিনা- এমন অনেক প্রশ্ন কুড়িগ্রামের এই কৃষকের।

সরকার বলছে, চালকল মালিক গোষ্ঠীর কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবছর। সেজন্য এখন কৃষকের কাছ থেকে চালের বদলে ধান কেনার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সরকার গত বছর চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৮লাখ মেট্রিক টন চাল কিনেছিল। আর চালকল মালিকরা ধান কিনেছিল কৃষকের কাছ থেকে।

কিন্তু চালকল মালিকদের একচেটিয়া ব্যবসার কারণে গত বছর ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় ধান ফেলে বা বিক্ষোভ করে প্রতিবাদ করেছিলেন।

অতীতের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়ার উল্লেখ করে এবার সরকার চাল কেনার টার্গেট অনেক কমিয়ে এনেছে।

সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে আমন এবং আতপ চাল মিলিয়ে ৩লাখ মেট্রিক টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN

ছবির ক্যাপশান,

কিছুদিন পরেই আমন ধান কাটা শুরু হবে

'একজন কৃষকের কাছ থেকে দুই টনের বেশি ধান নেয়া হবে না'

কৃষিমন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের সাথে একটা নেটওয়ার্ক আছে। সেটিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকের তালিকা করা হবে।

তিনি জানিয়েছেন, ইউনিয়নের কৃষি কর্মকর্তারা গ্রাম থেকে ধান উৎপাদনকারী কৃষকের তালিকা করে ১০ই নভেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে তা জমা দেবে।

মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, প্রত্যেক উপজেলায় ধান চাল কেনার সরকারি একটি কমিটি আছে। সেই কমিটি ইউনিয়নের তালিকা নিয়ে যাচাই করে তা চূড়ান্ত করবে।

আরও পড়ুন:

একেকটি ইউনিয়ন থেকে কতজন কৃষকের কাছ থেকে ধান নেয়া হবে, সেটা সরকার কেন্দ্র হতে নির্ধারণ করবে। সেই সংখ্যার চেয়ে বেশি কৃষকের নাম তালিকায় এলে তখন লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হবে।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে যে ব্যবস্থাপনা সারাদেশে রয়েছে, সেটা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার জন্য যথেষ্ট নয়।

কৃষি নিয়ে কাজ করেন ফরিদা আকতার। তিনি বলছিলেন, এখনকার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা না হলে অনেক কৃষক বাদ পড়ে যেতে পারে।

সরকার অবশ্য মনে করছে, বর্তমান ব্যবস্থা দিয়েই সরাসরি কৃষকের বড় অংশকে সুবিধা দেয়া সম্ভব।

সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সারাদেশে প্রায় ২ কোটি কৃষক আছেন।

তাদের সকলকে এই তালিকার আওতায় এনে সুবিধা দেয়া সম্ভব কিনা-এই প্রশ্নে ড: রাজ্জাকের বক্তব্য হচ্ছে, এখন আমন মৌসুমে যে কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেয়া হবে, বোরো মৌসুমে তাদের বাদ রেখে অন্য কৃষকদের সুযোগ দেয়া হবে। আবার যারা বোরো ধান বিক্রি করতে পারবেন, তারা আমনের সময় সে সুযোগ পাবেন না। এভাবে এক বছর ধান কেনার পর তা পর্যালোচনা করে সংস্কারের প্রয়োজন হলে সেটা সরকার করবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ক্ষুদ্র কৃষকরা যাতে সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য একজন কৃষকের কাছ থেকে দুই টনের বেশি ধান নেয়া হবে না। (সাড়ে ২৭ মণে এক টন ধরা হয়)

একজন কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার টার্গেটও যেহেতু ঠিক করে দেয়া হচ্ছে, সে কারণে ধনী কৃষকরা কোন একচেটিয়া কিছু তৈরির সুযোগ পাবে না বলে সরকার মনে করছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এবারই প্রথম সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনবে

কৃষকের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছ্বতা থাকবে?

ফরিদা আকতার মনে করেন, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কৃষকের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হলে সমস্যার সমাধান হবে না।

এছাড়া কৃষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ হবে না-সেটা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে, এই প্রশ্ন করেছেন ফরিদা আকতার।

তবে মন্ত্রী ড: রাজ্জাক বলেছেন, কৃষকের তালিকা তৈরিতে রাজনৈতিক পরিচয় কোন বিবেচনায় আসবে না। কোন অপপ্রয়োগ যাতে না হয়, সেজন্য উপজেলা এবং জেলা পর্যায় পর্যন্ত মনিটর করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এটাও বলা হচ্ছে যে, ভর্তুকি দিয়ে সারাদেশে কৃষকদের সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ বিভিন্ন সময় দেয়া হচ্ছে স্বচ্ছ্বতার সাথে। সেই নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থাপনা কাজে লাগানোর কথাই সরকার তুলে ধরছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এবার সরকারি গুদামে ধানই মজুত করা হবে

ধান কিনে সরকার তা কি করবে?

কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, কৃষককেই তার ধান শুকিয়ে ধানের আর্দ্রতা কমিয়ে মজুত করার উপযোগী করতে হবে।

তিনি আরও বলেছেন, মাঠের কৃষি কর্মকর্তা তালিকায় নাম দেখে এবং শুকানো ধান পরীক্ষা করে তা কেনার সিদ্ধান্ত নেবেন। তখন কৃষক সেই ধান স্থানীয় সরকারি গুদামে দিয়ে আসবেন।

সরকার ধান সরাসরি গুদামে সংরক্ষণ করবে এবং বোরো মৌসুম আসার আগে আগে চালকলের মাধ্যমে চাল তৈরি করা হবে বলেই সরকার বলছে।

ফরিদা আকতার মনে করেন, জমিতে যে পরিমাণ ধান হয়, কৃষককেই তা শুকিয়ে আর্দ্রতা কমিয়ে আনতে হলে ধানের পরিমাণ কমে যাবে। সেই ক্ষতিটা কৃষকের কাছেই হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, আগে যখন কৃষকরা চালকল মালিক বা বাজারে ধান বিক্রি করতো, তখন শুকানো ধানই তাদের দিতে হতো। এই ক্ষতি কৃষকরা মিলিয়ে নেয়।

সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, এ বছর এক কোটি ৫৩ লাখ টনের বেশি আমন ধান উৎপাদন হতে পারে।

কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিকেজি আমন ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২১ টাকা ৫৫ পয়সা। সেটা বিবেচনা করে তারা ২৬ টাকা কেজি নির্ধারণ করেছেন। যাতে কৃষকের কিছুটা লাভ থাকে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন: