ওয়াজ মাহফিল: কুমিল্লায় তিনজন মাওলানা নিষিদ্ধ, কিন্তু বয়ান নিয়ে এখনো কোন নীতিমালা নেই

বায়তুল মোকাররাম, ঢাকা। ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption বায়তুল মোকাররাম: ওয়াজ মাহফিলের বয়ান নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোন নীতিমালা নেই।

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা প্রশাসন বলছে, ২০১৬ সালে যে তিনজন ইসলামী বক্তাকে জেলায় সব ওয়াজ মাহফিল থেকে নিষেধ করা হয়েছিল, সেই নিষেধাজ্ঞা তারা বহাল রেখেছেন।

এই তিনজন বক্তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর ও উস্কানিমূলক এবং উগ্রবাদকে উৎসাহ দেয় এমন বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল ফজল মীর বলছেন স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছিলেন যে, ওই তিন ব্যক্তি কিছু বিভ্রান্তিকর, উস্কানিমূলক ও উগ্রবাদকে উৎসাহিত করার মতো বক্তব্য দেয় ।

অভিযোগ পাওয়ার পর ২০১৬ সালের অক্টোবরে বিষয়টি নিয়ে আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ও স্থানীয়দের সাথে বৈঠক হয়। সে বৈঠকেই তাদের নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো।

'সেই সিদ্ধান্তই এখনো চলমান আছে,'' তিনি বলেন।

যে তিন ব্যক্তির ওপর জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তাদের মধ্যে একজন বেসরকারি টেলিভিশনে ধর্মীয় বক্তব্য দেয়ার জন্য পরিচিত।

গত সোমবার জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তাদের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়টি জানিয়ে তা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক বলছেন, ওয়াজ মাহফিল করতে হলে আগেই অনুমতি নিতে হবে এবং আবেদন পাওয়ার পর পুলিশ আগে পর্যালোচনা করে দেখবে কারা ওয়াজ করবেন। পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই ওয়াজের অনুমতি দেবে জেলা প্রশাসন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

'কিছু ওয়াজে সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে'

সহিংস জিহাদের প্রতি আকর্ষণের পেছনে কী কাজ করে

ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের শক্তি কেন বাড়ছে

ছবির কপিরাইট NurPhoto
Image caption মাওলানার বয়ান ওয়াজ মাহফিলের বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু বাংলাদেশে বছর জুড়ে বিশেষ করে শীতের মৌসুমে সারাদেশে অসংখ্য ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে যাতে ধর্মীয় বক্তারা বক্তব্য দিয়ে থাকেন।

এমন অনেক ওয়াজে কারও কারও আপত্তিকর বক্তব্য বিশেষ করে নারীদের নিয়ে কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।

বয়ান নিয়ে নীতিমালা

ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বলছেন ওয়াজ মাহফিলে বয়ান কেমন হবে বা কোনো বিষয়ে বলা যাবে বা যাবেনা তার কোনো নীতিমালা নেই।

তবে, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলছেন, আলেমদের অকারণে বিরক্ত না করার পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য যেনো কেউ না দিতে পারে তা নিয়ে প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন তারা।

"কোনো ভাবেই যেনো হক্কানি আলেম বা ওলামাদের বিরক্ত না করা হয়, ইমাম বা খতিবের সঠিক বক্তব্য যেনো বাধা দেয়া না হয়, আবার কোনো লোক যেনো ইসলাম ও ধর্ম বিরোধী বক্তব্য না রাখতে পারে, সন্ত্রাসবাদ বা জিহাদের নামে উৎসাহিত করার মতো বক্তব্য দিতে না পারে - এসব বিষয়ে সজাগ থাকার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছি,'' তিনি বলেন।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ড. ফাজরীন হুদা বলছেন সরকারের উচিত সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাতে করে ধর্মকে ব্যবহার করে কেউ কোনো অশালীন কিংবা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিতে না পারে।

"সরকারের নীতি থাকা উচিত। সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে আর পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন থাকা উচিত। সরকারের নীতিতে থাকা উচিত যাতে নিজের ধর্মের অপব্যাখ্যা না হয়। সরকার করছেনা কেনো জানিনা। তবে ওয়াজগুলোকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সর করার উচিত,'' তিনি বলেন।

তিনি বলছেন ওয়াজ সাধারণ মানুষকে সরাসরি প্রভাবিত করে, সেজন্য যোগ্যতাসম্পন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিরা যেনো ধর্মের সঠিক প্রচার ও ব্যাখ্যা করতে পারেন সেজন্যই ওয়াজে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া উচিত কর্তৃপক্ষের।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক

চলতি বছরের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে বলা হয়েছিলো দেশের গ্রামে-গঞ্জে, এমনকি ইউটিউবসহ সামাজিক নেটওয়র্কের মাধ্যমে কিছু বক্তা ওয়াজ মাহফিলে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদে উৎসাহ দিচ্ছেন।

একইসাথে এই বক্তারা নারী অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্বেষ বা হিংসা ছড়াচ্ছেন, সে কারণে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিলো।

এমন ১৫ জন বক্তাকে চিহ্নিত করে ওয়াজ মাহফিলের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছয় দফা সুপারিশও করা হয়েছিলো।

যদিও এরপর এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং কর্মকর্তারাও আর কোনো তথ্য এ বিষয়ে দিতে পারেননি।

অবশ্য মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে তখন বলা হয়েছিলো বলে জানা গেছে।

তবে ইসলামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন তখন এই পদক্ষেপকে ইসলাম প্রচারে বাধা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

সম্পর্কিত বিষয়