সড়ক পরিবহন আইন: সংস্কারের দাবি তুলে শ্রমিকদের হঠাৎ ধর্মঘট-কর্মবিরতি, সরকার বলছে আইন 'অকার্যকর' করা যাবে না

বাংলাদেশ গণ-পরিবহনের সংখ্যা দেশে পাঁচ লাখের মতো ছবির কপিরাইট NURPHOTO
Image caption বাংলাদেশ গণ-পরিবহনের সংখ্যা দেশে পাঁচ লাখের মতো

বাংলাদেশের নতুন সড়ক পরিবহন আইনের 'সংস্কার'-এর দাবিতে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় হঠাৎ করে ধর্মঘট ও কর্মবিরতি শুরু করেছে পরিবহন শ্রমিকেরা।

এই ধর্মঘট ও কর্মবিরতি এমন এক দিনে শুরু হলো, যেদিন থেকে সরকার আনুষ্ঠানকিভাবে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে।

তবে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে যত চাপই আসুক, এই আইন অকার্যকর করা যাবে না।

নভেম্বর মাসের প্রথমদিন থেকে আইনটি কার্যকর করা হয়। তবে পিছিয়ে দেয়া হয় এর প্রয়োগ।

আইনটি প্রয়োগে সকাল থেকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ।

কোথায় হচ্ছে ধর্মঘট

সড়ক পরিবহন আইন সংস্কার করতে হবে, এই দাবি তুলে রাজশাহী জেলার পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালন করছেন সকাল থেকে।

রাজশাহী শহর থেকে উপজেলা রুটে কোন বাস চলেনি বলে জানা গেছে।

তবে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে অল্প সংখ্যক বাস ছেড়ে যায়।

রাজশাহী জেলার পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, নতুন আইনটি সংস্কারের দাবিতে শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালন করছে।

তিনি বলেছেন, "নতুন আইনটা সংস্কার করা প্রয়োজন। এই আইনে ড্রাইভারের জন্য যে জরিমানা ধরা হইছে, সেইটা একজন ড্রাইভার কোথা থেকে দেবে? সে বেতন পায় কত টাকা?"

আরো পড়তে পারেন:

সড়ক নিরাপত্তা: নতুন আইন প্রয়োগ হচ্ছে কি?

সড়ক দুর্ঘটনা: ৩০ বছর ধরে চলা ক্ষতিপূরণের আইনি লড়াই

'সরকার মালিক-শ্রমিক সংগঠনকে ভয় পায়'

"কিন্তু সব পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট করছে না। যার কাগজ ঠিক আছে সে চালাইতেছে। যার কাগজ ঠিকঠাক নাই, মানে মেয়াদ শেষ হইছে বা কাগজ হারিয়ে গেছে বা চুরি গেছে, তারা বইসা আছে। কারণ কাগজ হইতে তো সময় লাগে। একদিনে তো আর হয় না।"

নতুন আইনে দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও পাঁচ বছরের সাজার ব্যবস্থা রাখা রয়েছে।

এই ধর্মঘট কতদিন চলবে, এমন এক প্রশ্নে মিঃ আলম বলেন, পরিবহন শ্রমিকের স্বার্থ নিশ্চিত হওয়ার পর তারা কর্মসূচি তুলে নেবেন।

তিনি জানান, উপজেলা রুটের সঙ্গে রাজশাহী-নওগাঁ রুটেও বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু রাজশাহী-নাটোর এবং রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে বাস চলাচল করছে।

এদিকে, খুলনা জেলা থেকে দেশের ১৮টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে সকাল থেকে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে খুলনায় ধর্মঘট আহ্বান করেনি কোন সংগঠন।

তবে সকাল নয়টা পর্যন্ত ঢাকা-খুলনা রুটে কয়েকটি বাস ছাড়ে।

খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা কাজী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বেবী জানিয়েছেন, খুলনায় কোন ধর্মঘট হচ্ছে না, তবে শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে 'কর্মবিরতি' পালন করছে।

"নতুন আইন কার্যকর হওয়ার কারণে চালকেরা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামতে চায় না। তাদের বক্তব্য, চালকের জন্য যে শাস্তি বা জরিমানার বিধান কঠোর হয়েছে তা অনেক। সেটার সংস্কার না হলে তারা কাজে ফিরবে না।"

এদিকে, রোববার রাতে যশোরের ১৮টি রুটে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হলেও সোমবার সকাল থেকে আবার অঘোষিত কর্মবিরতি শুরু হয়।

যশোর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, "ফাঁসির দড়ি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করতে পারবে না। তাই তারা কর্মবিরতি পালন করেছে। কিন্তু আইনের সংস্কার করা হবে এমন আশ্বাসে আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছি।"

সকাল থেকে অবশ্য যশোর-বেনাপোল ও যশোর-সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী বাসের চলাচল বন্ধ ছিল।

কিন্তু ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে অবশ্য ট্রাকে মালামাল ওঠানামা বন্ধ রয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় আরেক জেলা নড়াইলের সাথে পাঁচটি রুটের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

এছাড়া বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরাও সকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন।

এদিকে, সড়ক পরিবহন আইনের সংস্কারের দাবিতে সিরাজগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পরিবহনের শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন করছেন বলে জানা যাচ্ছে।

তবে, চট্টগ্রাম এবং সিলেটে পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

সরকার কী বলছে?

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, কোন মহলের চাপের মুখে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন 'অকার্যকর' করা যাবে না।

তিনি বলেন, "এই আইন যেন সহনীয় পর্যায়ে কার্যকর করা হয়, তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ আইন কাউকে শাস্তি দিতে নয়, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা কমাতে ব্যবহার করা হবে।"

২০১৮ সালের ২৯শে জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় কারণে দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে বিক্ষোভ করে। এই বিক্ষোভের কিছুদিন পরেই সংসদে সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়।

সম্পর্কিত বিষয়