নির্যাতনের খবর জেনেও সৌদি আরবে যেতে আগ্রহী অনেক নারী: 'আমাদের স্বামীরা কি আমাদের অত্যাচার করে না?'

বিদেশে যেতে আগ্রহী কয়েকজন নারী। ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারীরা নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

অত্যাচার নির্যাতনের মুখে সৌদি আরব থেকে হাজারো নারীর ফিরে আসার কাহিনী এমনকি মৃত্যুর খবর জানার পরেও বাংলাদেশের বহু নারীর গন্তব্য এখনো সৌদি শ্রমবাজার।

যারা নির্যাতিত হয়ে ফিরে এসেছেন তারা সবাই চান, সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করা হোক। কিন্তু বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নারীরা বন্ধ করাটাকে সমাধান মনে করছেন না। তারা চাইছেন নিরাপদ অভিবাসন।

ঢাকার একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বিদেশ যাবার আগে এক মাসের প্রশিক্ষণে আছেন এরকম অনেকে।

আরবি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার শিখছেন অনেকে। ক্লাসরুমে জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নারী যেতে চাইছেন সৌদি আরবে। এর মধ্যে কেউ কেউ আছেন - যারা আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এখন আবার যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সাবিনা নামের একজন সৌদি আরবে চার বছর কাজ করে এসেছেন। বেতন এবং কাজের পরিবেশ ভাল পেয়েছিলেন বলেই আবার যাচ্ছেন। সৌদি আরবই তার পছন্দের দেশ।

অন্যদিকে কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই দালালের মাধ্যমে সৌদি গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন ময়না। তিনমাসের মাথায় আবার তিনি বিদেশ যেতে চাইছেন। তবে সৌদি আরবে যাবেন না কখনোই। তার দাবি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সৌদিতে যেন কোনও নারীকে পাঠানো না হয়।

বিদেশে যেতে ইচ্ছুক এসব নারীর সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায় বেশিরভাগই স্বল্প-শিক্ষিত ও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা। অভাব-অনটনের সংসারে উন্নত ভবিষ্যতে স্বপ্ন নিয়ে তারা পরিবার-পরিজন ছেড়ে বিদেশ যেতে চান।

তাসলিমা ইসলাম নামের একজন বলছিলেন, "সমস্ত দেশ খোলা থাকুক, আমরা বাঁচতে চাই, খাবার চাই, পরনের কাপড় চাই, নিজের একটা অধিকার চাই।"

তাসলিমারও সৌদি আরবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তিনি মনে করেন, সৌদিতে বাংলাদেশি দূতাবাসকে আরো তৎপর হতে হবে।

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার শিখছেন অনেকে।

আরো পড়তে পারেন:

সৌদি আরব থেকে শ্রমিক ফেরত, চিন্তিত দূতাবাস

সৌদি থেকে নারী শ্রমিকদের মৃতদেহ আসার সংখ্যা বাড়ছে

'বাঁচতে হলে লাফ দেয়া ছাড়া উপায় কি'?

সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যারা আসেন তাদের একটা বড় অংশেরই সৌদি আরবে যাবার আগ্রহ। এর মধ্যে অনেকেই জানান তাদের আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীরা তাদের নিয়ে যাচ্ছেন, ভরসা দিচ্ছেন।

সৌদি আরবে যেতে নারীদের কোনও টাকা লাগে না, পুরো খরচ বহন করে নিয়োগকারী। নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসা সবাই নারী পাঠানোতে আপত্তি করলেও যারা বিদেশ যেতে ইচ্ছুক তাদের একটা বড় অংশ আর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোও চান, সৌদি আরবে নারী পাঠানোর প্রক্রিয়া চালু থাকুক।

সৌদি যেতে ইচ্ছুক শিমু আক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত অত্যাচার নির্যাতনের খবর আসছে, তারপরেও কেন সৌদি যেতে চান তিনি?

এর উত্তরে শিমু বলেন, "হ্যাঁ, আমরা শুনতেছি কিন্তু আমাদের স্বামীরা কি আমাদের অত্যাচার করে না? কেউ কি নিজের দেশ ছাইড়া, ছেলেমেয়ে রাইখা বিনা কারণে বিদেশ যায়? আমরা বন্ধ হোক এটাও চাই না, আবার ওইখানে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হই - এটাও চাই না।"

বিদেশগামী মেয়েদের নিয়ে কাজ করছেন খালেদা সরকার। তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশের স্বল্প শিক্ষিত হত-দরিদ্র পরিবার থেকেই মেয়েরা মূলত সৌদি যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, পরিবারে সম্পর্কের জটিলতা, আর্থিক সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাবেই নারীরা বিদেশে যাবার ঝুঁকি নিচ্ছে।

"এটা কখনোই বন্ধ হবে না, বরং আমাদেরকে দেখতে হবে মানুষের অধিকার, মানবাধিকার এবং তাদের নিরাপত্তার জায়াগুলোকে আরো বলিষ্ঠ করতে হবে।"

এদিকে বাংলাদেশ থেকে এপর্যন্ত সোয়া ৩ লাখ ৩২ হাজার ২০৪ জন নারী সৌদি আরবে গিয়েছেন।

Image caption আমাদের স্বামীরা কি আমাদের অত্যাচার করে না? - শিমু আক্তারের প্রশ্ন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের তথ্যে চলতি বছরে এ সংখ্যা ৫৩ হাজার ৭শ ৬২ জন। এরমধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসেছেন ভয়ংকর নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

গত চার বছরে লাশ হয়ে ফিরেছেন ১৫৭ জন নারী। চলতি বছরের গত এগার মাসে সৌদি থেকে ৫৩ জন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীর মৃতদেহ এসেছে।

এ অবস্থায় এখনো যারা যাচ্ছেন তাদের শেখানো হয় বিপদে পড়লে তারা কোথায় যাবে, কী করবে।

শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উপাধ্যক্ষ শাহেল আরা বলেন, "আমরা ওদেরকে দূতাবাসের ফোন নাম্বার, যোগাযোগ করার মত কিছু নম্বর এবং মেসেজ ওদের দেই। এমনভাবে ওদের শেখানো হয় যাতে বিদেশে গিয়ে ওরা বিপদগ্রস্ত না হয়। আমরা চাই না ওখানে গিয়ে তারা ক্রীতদাস হয়ে যাক।"

নারী শ্রমিকদের নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বলছেন, নিরাপদ অভিবাসন নারীর অধিকার। তবে সৌদিতে গৃহকর্মী নির্যাতনের বিষয়টি উদ্বেগজনক আর এক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, "তাদের সৌদি ভাষা যতোটুকু শেখানো হয় সেটা যথেষ্ট নয়। কারণ সেখানে কথ্য ভাষা ব্যবহৃত হয়। প্রশিক্ষণের মান আরো বৃদ্ধি করতে হবে। এক মাসের জায়গায় তিন মাস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক করতে হবে। নারীকে শুধু আরবি ভাষা, হাঁড়িপাতিলের ব্যবহার না, তাকে সংকট মোকাবেলায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। এছাড়া দুদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। কেউ যদি ভায়োলেশন করে তাহলে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করতে হবে।"

ছবির কপিরাইট BBC Bangla
Image caption বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে সৌদি শ্রমবাজারে নারী-কর্মী বন্ধের পক্ষে যেমন অনেকে আছে, আবার সুরক্ষা নিশ্চিত করে নারীদের পাঠানোর পক্ষেও মতামত দেখা যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে সৌদিতে থাকা বাংলাদেশিদের কথা হলো: নারী কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে দূতাবাসকে আরো তৎপর হতে হবে, এব! মক্কা, মদিনা, রিয়াদ বা জেদ্দা শহরের বাইরে নারী শ্রমিক না পাঠানোই সবচেয়ে ভাল।

ইলিয়াস কাঞ্চন বাস-ট্রাক শ্রমিকদের টার্গেট কেন?

ইনজেকশন বিতর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত

পেঁয়াজ আমদানির ফলে বিপদে পড়বে চাষীরা?

আশ্বাসের পর কর্মবিরতি প্রত্যাহার মালিক-শ্রমিকদের