গোলাপী বলের টেস্ট নিয়ে কলকাতায় উত্তেজনা

শুক্রবার ইডেন গার্ডেন্সে গড়াবে গোলাপী বল।
Image caption শুক্রবার ইডেন গার্ডেন্সে গড়াবে গোলাপী বল।

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরেই ক্রিকেটের অনেক ইতিহাসের সাক্ষী কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে তৈরি হবে আরও এক ইতিহাস: উপমহাদেশের প্রথম 'পিঙ্ক বল' টেস্টের আয়োজক হিসাবে।

আর এই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশের নামও।

গোলাপি বলের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে ইডেনের সবুজ মাঠ আর তার আশপাশটাও এখন গোলাপীময়।

"কিছু আপনারা ইতিমধ্যেই দেখছেন, আর শুক্রবার খেলার সময়ে আরও দেখবেন কীভাবে গোলাপি হয়ে ওঠে গোটা ইডেন," বলছিলেন আয়োজক ক্রিকেট এসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল বা সিএবির যুগ্ম সচিব দেবব্রত দাস।

"সিএবির সব কর্মকর্তা, মাঠে যারা কাজ করবেন - সবাই গোলাপি জামা পরবো, খেলার ব্রেক টাইমে চারটে বড় ফ্লাড লাইট স্ট্যান্ডে গোলাপি আলো জ্বলবে। স্টেডিয়ামের সব স্তম্ভগুলো গোলাপিতে মুড়ে দেওয়া হয়েছে, গঙ্গায় গোলাপি নৌকো চলছে, ম্যাসকট দুটোর রঙ গোলাপি আর নীল।"

একদিনের ক্রিকেট আর টি-টোয়েন্টির যুগে আভিজাত্য টিকিয়ে রেখে কীভাবে দর্শকদের টেস্ট-মুখী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা অনেক দিনের।

নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে বলের রঙ আর ম্যাচের সময় বদলিয়ে বছর চারেক আগে থেকে শুরু হয় পিঙ্ক বল বা গোলাপি বল টেস্ট।

২০১৫ সালে গোলাপি বল দিয়ে দিন-রাতের প্রথম টেস্ট হয় অস্ট্রেলিয়ায়।

Image caption টিকেটের জন্যে লাইন

আরো পড়তে পারেন:

বাংলাদেশ টেস্ট দলটি কি ঢেলে সাজানো প্রয়োজন?

আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের নেপথ্যে

পিঙ্ক বল টেস্ট খেলার আমন্ত্রণ এসেছিল ভারতের কাছেও। তবে গোলাপি বলে খেলার অনভিজ্ঞতার কারণ দেখিয়ে বারে বারেই সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছে ভারত।

ইডেন টেস্টে গোলাপি বলে খেলতে প্রথমে রাজি ছিল না বাংলাদেশ দলও, বলছিলেন ক্রিকেট বিশ্লেষক বোরিয়া মজুমদার।

ভারত আর বাংলাদেশকে পিঙ্ক বল টেস্ট খেলতে রাজী করানোর পুরো কৃতিত্বটাই বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলিকে দিতে চান মি. মজুমদার।

"সৌরভ গাঙ্গুলি বোর্ড প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রথম যে বৈঠকটা করেন ভিরাট কোহলির সঙ্গে, সেখানে প্রথমেই পিঙ্ক বল টেস্টের প্রসঙ্গ তোলেন। সৌরভ বলেন যে টেস্টে দর্শক আসছেন না - তাই তোমাদের পিঙ্ক বল টেস্ট খেলায় রাজী হওয়া উচিত।"

"চোখের পলক পড়ার আগেই ভিরাট কোহলি রাজী হয়ে যান," বলছিলেন মি. মজুমদার।

"বাংলাদেশ বোর্ডও বলেছিল ওদের প্লেয়ারদের। কিন্তু তারা রাজী হন নি। পরের দিনই সৌরভ তাদের বোঝাতে থাকেন যে আমরাও আগে পিঙ্ক বলে খেলি নি, তোমরাও খেল নি। তাহলে তো দু'দলের কাছেই ব্যাপারটা নতুন। তারপরেই বাংলাদেশের প্লেয়াররা রাজী হন।"

বলের রঙ আর খেলার সময় বদলিয়ে টেস্টের মাঠে দর্শক টেনে আনার এই উদ্যোগ যে বেশ সফল, সেটা বোঝাই যাচ্ছে টিকিট বিক্রি দেখে।

Image caption একতারা নিয়ে বাংলাদেশী এক ভক্ত ছুটে গেছেন কলকাতায়।

সিএবি বলছে, প্রথম চারদিনের টিকিট সম্পূর্ণ শেষ, অর্থাৎ ওই চারদিন মাঠে হাজির হবেন ৬৫ থেকে ৭০ হাজার মানুষ।

গত কয়েকদিন ধরে তাই ইডেনে টিকিটের খোঁজে এসে ফিরে যাচ্ছেন বহু মানুষ।

এই টেস্ট যে কিছুটা হলেও উন্মাদনা তৈরি করেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সেটাও দেখা গেল টিকিটের লাইনে। টিকিট কাটতে আসা স্বর্ণালী ভট্টাচার্য বলছিলেন, "আমি এমনিতেই খেলা দেখতে ভালবাসি। তার ওপর এরকম একটা ঐতিহাসিক টেস্ট - আবার পিঙ্ক বলে খেলা। এই সুযোগ ছাড়া যায় নাকি?"

জয়িতা শীল এসেছিলেন স্কুল ফেরত শিশুকন্যাকে নিয়ে। তার স্বামী আগেই অনলাইনে টিকিট বুক করে রেখেছেন। তিনি বলেন, "ইডেনে বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্ট আর গোলাপি বলের প্রথম ম্যাচ, তাই আমার স্বামীর খুব উৎসাহ যে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাঠে আসবে।"

বাংলাদেশ থেকেও অনেক মানুষ ইতিমধ্যেই কলকাতায় চলে এসেছেন খেলা দেখতে। ইডেন আর তার আশপাশে চোখে পড়ছে সেদেশের জাতীয় দলের টি-শার্ট পরা মানুষজন।

কাশেম জামাল আর কামরুন্নাহার বকুল দম্পতি খেলা দেখতে কলকাতায় এসেছেন ঢাকা থেকে।

মি. জামাল বলছিলেন, "আমি আগে অনেকবার ইডেনে খেলা দেখেছি - ভারত-পাকিস্তান, ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু এবার ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ দেখব, সেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, গোলাপি বলে খেলা হবে দিনরাতের টেস্ট - এগুলো আমার কাছে একটা আবেগ তৈরি করেছে।"

এসেছেন বাংলাদেশের পরিচিত ক্রীড়াপ্রেমী নূর বক্স, হাতে একতারা নিয়ে।

Image caption স্টেডিয়াম সাজানো হচ্ছে গোলাপি রঙে।

"আমি তো গত পনেরো বছর ধরে দেশের সব ম্যাচ দেখি বিনা-পয়সায়। সরকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, বিদেশেও খেলা দেখতে গেছি, শ্রীলঙ্কা গেছি, এবার ভারতে এসেছি। দিল্লি, রাজকোট, নাগপুর, ইন্দোর - সব জায়গায় বাংলাদেশ টিমের খেলা দেখতে গেছি," বলছিলেন মি. বক্স।

ভারতীয় নারী দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার ও নির্বাচক মিঠু মুখার্জী বলছেন, "আমাদের ছোটবেলায় এই ইডেনের টেস্টেও গ্যালারি ভরে যেত। তখন ওয়ানডে আর টি২০ ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রাও বদলে গেছে। সেই হিসাবে দুপুর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খেলা দেখাটা বেশ ভাল সময়। আমার তো মনে হয় টেস্ট ক্রিকেটের এই ফর্ম্যাট জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।"

কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দর্শক সকলেই এখন তাকিয়ে আছেন ম্যাচ শুরুর ওই মুহূর্তের দিকে, যখন হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসবেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুজন প্যারাট্রুপার - তারা দুটি গোলাপি বল তুলে দেবেন দুই দলের দুই অধিনায়কের হাতে।

আরো পড়তে পারেন:

সড়ক আইন বাস্তবায়নে সরকার কি ছাড় দিচ্ছে?

এবার গোটা ভারতেই এনআরসি চাইছে বিজেপি সরকার

ইনজেকশন বিতর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত

আশ্বাসের পর কর্মবিরতি প্রত্যাহার মালিক-শ্রমিকদের