ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে হাজারো ইসরায়েলি বাস করে কেন

ফিলিস্তিনি নারী ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি নারীদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বন্দ্বের একটি বড় উৎস হলো পশ্চিম তীর কিংবা পূর্ব জেরুজালেমের মতো ফিলিস্তিনি এলাকায় গড়ে ওঠা ইহুদি বসতিগুলো।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারণে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় দখল করা এলাকায় ইসরায়েল তার নাগরিকদের বসতি করতে দিলে সেটি হবে অবৈধ।

আন্তর্জাতিক এ সমঝোতার অংশ ছিলো যুক্তরাষ্ট্রও।

তারা সবসময় এসব বসতিকে অবৈধ বললেও সম্প্রতি সে অবস্থান পরিবর্তন করেছে তারা।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ঘোষণা করেছেন পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতিকে তারা আর অবৈধ বিবেচনা করবেনা।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বলছে এসব ভূখণ্ড ফিলিস্তিনের অংশ।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন হলো "ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন"।

বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা বারবার প্লেট উশারের মতে পদক্ষেপটি শুধু শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার আইনি কাঠামোকে খাটো করা নয় বরং এটি ইহুদি বসতির আরও বিস্তারকে উৎসাহিত করবে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

আরবদের হটিয়ে যেভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের মূলে যে দশটি প্রশ্ন

অসলো শান্তি চুক্তি: কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?

ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র ঘোষণার প্রতিক্রিয়া কী হবে?

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption একটি বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে

ইসরায়েলি বসতি কি?

১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় দখল করা অংশে ইসরায়েল ইহুদিদের এসব বসতি স্থাপন করেছে।

এর মধ্যে আছে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম যা আগে জর্ডানের দখলে ছিলো এবং গোলান মালভূমি সিরিয়ার অংশ ছিলো।

এর মধ্যে কিছু বসতি স্থাপনকারী এখানে এসেছেন ধর্মীয় বিশ্বাসগত কারণে। তাদের বিশ্বাস ঈশ্বর এ ভূমি ইহুদিদের জন্য দিয়েছেন।

আর অন্যরা এসেছ কারণ এখানে ঘরবাড়ি নির্মাণে খরচ খুবই কম।

ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পিচ নাউ এর হিসেবে ১৩২ সেটেলমেন্ট বা বসতি গড়ে তোলা হয়েছে সেখানে। আর সাথে আছে ১১৩টি ফাঁড়ি।

এর মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমে আছে ১৩টি বসতি যাতে প্রায় সোয়া দুই লাখ সেটেলার বসবাস করেন।

এছাড়া গাজা উপত্যকা ও মিসর থেকে ১৯৬৭ সালে দখল করা সিনাই উপদ্বীপে বসতি স্থাপন করা হয়েছে।

গোলান মালভূমিতেও আছে কয়েক ডজন বসতি।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ইসরায়েল বলছে তারা আর বসতি সরাবেনা

বসতিই কেন সংঘাতের কেন্দ্রে

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে এই বসতিও বড় ইস্যু গুলোর একটি এবং অনেক বার শান্তি আলোচনাও ভেস্তে গেছে এ কারণে।

এটা ফিলিস্তিনিদের জন্য শুধু জমির দখল হারানোর কারণেও বড় সমস্যা নয় বরং এর কারণে তাদের স্বাধীন চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কারণ এসব বসতিকে কেন্দ্র করে চেকপয়েন্ট, রোডব্লক সহ নানা কিছু তৈরি করেছে ইসরায়েল।

কিন্তু এর বাইরেও বড় প্রশ্ন হলো পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অংশ কারণ এগুলো ছাড়া যৌক্তিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হওয়া অসম্ভব।

তারা তাই চেয়েছিলো যে শান্তি আলোচনার আগে ইসরায়েল বসতি স্থাপন বন্ধ করুক।

ট্রাম্প জমানায় কি কি পরিবর্তন এলো?

এক কথায় এর উত্তর- অনেক।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তার শাসনের শুরুতেই বসতি ইস্যুতে অনেক নমনীয় অবস্থান প্রদর্শন করেন তিনি।

তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে এই বসতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ছিলো অবৈধ।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি রেজুলেশনে বলা হয়েছে এসব বসতির আইনগত বৈধতা নেই এবং এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা হয়েছে।

যদিও এসব রেজুলেশন মানার আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

গত ১৮ই নভেম্বর মাইক পম্পেও বলেছেন ট্রাম্প প্রশাসন আগের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে।

"ইসরায়েলি বেসামরিক বসতি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে কোনো সমস্যা তৈরি করেনা," মিস্টার পম্পেও বলেন।

ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দশকের নীতি উল্টে দিলেন পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু আরও একধাপ এগিয়ে পশ্চিম তীরের সব বসতি, জর্ডান উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের পূর্বাঞ্চলে নর্দার্ন ডেড সি র মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে চান।

গণমাধ্যম বলছে এই পরিকল্পনা মিস্টার ট্রাম্পের ইসরায়েল ফিলিস্তিন শান্তি র জন্য তার ভিশনের সাথে বেশ মিলে যায়।

এই ভিশন তিনি খুব শিগগিরই হয়তো প্রকাশ করবেন।

তবে ফিলিস্তিনিরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে ইসরায়েলি বসতির বিস্তার শান্তি প্রক্রিয়াকে শেষ করে দেবে।

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption ১৯৯৩ সালের সমঝোতায় বলা হয়েছিলো চূড়ান্ত আলোচনায় বসতি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে

তাহলে বসতি নিয়ে সমঝোতা কি অসম্ভব?

এমন সম্ভাবনাই বাড়ছে।

বহু বছর ইসরায়েল শান্তির জন্য বড় ছাড় দেয়া কথা বলেছে।

এর আগে তারা সিনাই ও গাজায় কয়েকটি বসতি ধ্বংসও করেছিলো।

এখন মিস্টার নেতানিয়াহু বলছেন কখনোই বসতি উচ্ছেদ করা হবেনা।

আন্তর্জাতিক আইন কি বলছে?

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মতে বসতি অবৈধ।

এর ভিত্তি হলো ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন যাতে দখলীকৃত জায়গায় স্থানান্তরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

যদিও ইসরায়েল বলছে এই কনভেনশন পশ্চিম তীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা কারণ তারা সেটি দখল করেনি।

তারা কোনো সার্বভৌম শক্তির কাছ থেকে সেটি দখল করেনি।

তাদের দাবি ইহুদি বসতির আইনগত অধিকার ১৯২২ সালে লীগ অব নেশন্সে ফিলিস্তিনের জন্য যে ম্যান্ডেট দেয়া হয়েছিলো সেখানেই আছে যেটি জাতিসংঘ সনদেও সংরক্ষিত।