চীনে মোবাইল ফোনে 'ফেস স্ক্যান': যে দেশের প্রতিটি মানুষের চেহারা রাষ্ট্রের নজরদারিতে

চীনে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি দিয়ে সুপারমার্কেটে কেনাকাটাও করা যায়। ছবির কপিরাইট VCG
Image caption চীনে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি দিয়ে সুপারমার্কেটে কেনাকাটাও করা যায়।

চীনের মানুষকে এখন থেকে মোবাইল ফোন রেজিষ্ট্রেশনের সময় তাদের মুখের ছবি স্ক্যান করতে হবে। চীনে যে কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাদের পরিচয় যাচাই করার জন্য এটা করা হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে এই নতুন নিয়ম ঘোষণা করা হয়। এটি আজ রোববার থেকে কার্যকর করা হচ্ছে।

চীনের সরকার বলছে, সাইবার জগতে তারা সব নাগরিকের বৈধ অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।

চীনে 'ফেসিয়াল রিকগনিশন' বা মুখের ছবি দেখে পরিচয় সনাক্ত করার প্রযুক্তি আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ ধরণের প্রযুক্তিতে চীন এখন বিশ্বসেরা। কিন্তু যেভাবে চীন এখন ব্যাপকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

নতুন নিয়মে কী আছে

ছবির কপিরাইট NICOLAS ASFOURI
Image caption পলাতক অপরাধী ধরার জন্য এখন ব্যবহার করার হচ্ছে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি

চীনে যখন কেউ মোবাইল ফোনের সেবা নিতে চুক্তিবদ্ধ হন, তখন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয় এবং ছবি তুলতে হয়। এই নিয়ম অবশ্য বিশ্বের আরও অনেক দেশে আছে।

কিন্তু এখন চীনে মোবাইল সেবা নিতে গেলে তাদের মুখের ছবি স্ক্যান করতে হবে যাতে করে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে এই ছবি মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

চীনে অনেকদিন ধরে এমন চেষ্টা চলছে যাতে করে অনলাইনে প্রত্যেকে নিজের আসল নাম পরিচয় ব্যবহার করে।

যেমন ২০১৭ সালে নিয়ম করা হয় ইন্টারনেটে কেউ যদি কোন বিষয়ে পোস্ট দিতে চায়, তার আসল পরিচয় যাচাই করে দেখতে হবে।

চীনে বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেফরি ডিং চীনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলছেন, চীন যে বেনামি মোবাইল নম্বর এবং বেনামি ইন্টারনেট একাউন্ট বন্ধ করতে চাইছে - তার মূল উদ্দেশ্য সাইবার নিরাপত্তা বাড়ানো এবং অনলাইনে প্রতারণা বন্ধ করা।

'তবে একই সঙ্গে তারা হয়তো জনগণের ওপর আরও বেশি নজরদারি চালাতে চাইছে। চীনে প্রতিটি মানুষের ওপর কিভাবে নজর রাখা যায়, কেন্দ্রীয়ভাবে সেটার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এটাই তাদের লক্ষ্য।'

মানুষ কি চিন্তিত?

ছবির কপিরাইট STR
Image caption মোবাইল ফোনের সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে এখন 'ফেস স্ক্যান' বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে যখন এই নিয়ম ঘোষণা করা হয়, তখন চীন গণমাধ্যমে এটা নিয়ে কোন হৈচৈ হয়নি।

তবে অনলাইনে বহু মানুষ এ নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ।

মাইক্রোব্লগিং সাইটে একজন বলেছেন, "মানুষের ওপর এখন আরও কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন:

বাসচাপায় শিক্ষার্থী মৃত্যুর দায়ে চালকদের যাবজ্জীবন

শত শত শিশুর এইডস হওয়ার পেছনের কারণ এখনো অজানা

'সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়া ইতিবাচক'

আরও অনেকে অভিযোগ করছেন যে চীনে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকছে না।

তবে অনেকে সরকারের এসব পদক্ষেপ সমর্থনও করছেন।

চীনে ইন্টারনেটে কড়া সেন্সরশিপ জারি আছে এবং এর ওপর কড়া নজরদারি চালানো হয়।

ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা ব্যাপক

ছবির কপিরাইট AFP
Image caption মানুষের ওপর ব্যাপক নজরদারির জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে বলে আশংকা বাড়ছে

চীনকে একটি 'নজরদারি রাষ্ট্র' বলে বর্ণনা করা হয়। ২০১৭ সালে চীনে প্রায় ১৭ কোটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। ২০২০ সাল নাগাদ আরও ৪০ কোটি সিসিটিভি বসানোর কথা।

সেখানে একটি 'সোশ্যাল ক্রেডিট' সিস্টেমও চালু করা হচ্ছে। যেখানে নাগরিকরা কে কি আচরণ করছেন, জনসমক্ষে কি ধরণের কথাবার্তা বলছেন তার হিসেবে রাখার কথা।

এর উদ্দেশ্য ২০২০ সাল নাগাদ নাগরিকদের এক বিশাল জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা। যেখানে নাগরিদের আর্থিক লেন-দেন এবং সামাজিক আচরণের ভিত্তিতে একটি 'র‍্যাংকিং' তৈরি করা হবে।

'ফেসিয়াল রিকগনিশন' প্রযুক্তি এই নজরদারির ব্যবস্থায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পলাতক আসামীদের ধরতে এটি খুবই সহায়ক।

গতবছর একটি কনসার্টে যোগ দিতে আসা ৬০ হাজার মানুষের মধ্যে এক পলাতক আসামীকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধরা হয়েছিল।

চীনে দৈনন্দিন সব কাজে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। যেমন দোকানে বা সুপারমার্কেটে জিনিসপত্র কেনার পর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দাম পরিশোধ করছেন অনেকে।