বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী: ভিন্নরকম হওয়ায় এই মানুষগুলোর যত হেনস্থা

আপনার ডিভাইস মিডিয়া প্লেব্যাক সমর্থন করে না
ছোট্ট জীবনে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে আফরোজার

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়ন কিংবা তাদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রায় সময়ই শোনা যায়। এ নিয়ে সরকার থেকে প্রতি বছর আলাদা বাজেটও বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের মূলধারায় কতটা সম্পৃক্ত হতে পারছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকেই বা তারা কিরকম সহযোগিতা পাচ্ছেন?

ঘটনা : 'মেয়েরে ল্যাংড়া বলে ডাকে'

আফরোজা খানম। জন্ম থেকেই শরীরের ডান পা এবং ডান হাত একরকম অকেজো। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না, প্রায় সব কাজেই সাহায্য নিতে হয় কারো না কারো।

ডান হাতে শক্তি না থাকায় আফরোজা খানম লেখালেখি করেন বাম হাতে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এখন স্নাতকে ভর্তি হয়েছেন একটি কলেজে।

কিন্তু ছোট্ট এই জীবনে তিক্ত অনেক অভিজ্ঞতারই মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। আফরোজা খানম বলছেন, স্কুল জীবনে প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো আচরণে মন খারাপ হতো তার।

"দেখা গেলো সবাই খেলছে। আমাকে কেউ খেলায় নিচ্ছে না। আমার সঙ্গে কেউ মিশছেও না। কারণ আমি তো ওদের মতো সুস্থ্য, স্বাভাবিক না।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption শরীরের এক অংশ প্রায় অবশ। কিন্তু এ নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন আফরোজা খানম। যদিও সমাজ থেকে প্রতিনিয়ত নানা রকম অপমান সহ্য করতে হয় তাকে।

"স্যাররা যখন পড়াতো, অনেক স্টুডেন্টদের মধ্যে পড়ালে আমার বুঝতে সমস্যা হতো। আমি টিচারদের বুঝিয়ে বলতে পারতাম না। তারাও আমাকে বুঝতে চেষ্টা করেনি। আলাদাভাবে কেয়ারও করেনি। ...আমাকে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই বেশি বেশি পড়ার চাপ দেয়া হতো। যেটা আমি নিতে পারতাম না।"

শারীরিক সমস্যার কারণে আফরোজা শুধু স্কুলেই অবহেলার মধ্যে পড়েছেন তা নয়। সমাজেও নানারকম কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাকে।

আফরোজার মা শামসুন্নাহার বলছেন, এলাকার অনেকেই তার মেয়েকে প্রকাশ্যেই ল্যাংড়া বা লুলা বলে সম্বোধন করতো।

"ধরেন ও স্কুলে যাচ্ছে, আমার মেয়েটারে ল্যাংড়া বলে ডাকে। এসব নিয়ে অনেকের সঙ্গে ঝগড়া-ঝাটি হইছে আমাদের। ...এলাকার মানুষের কাছে সে ভালবাসা, আদর-সহানুভূতি কোনটাই পায় নাই।"

ঘটনা : 'বয়স হইছে, মেয়ের বিয়ে দিতে পারি না'

মুন্সীগঞ্জ সদরের মনিকা আক্তার। বিশ বছর বয়সী মনিকা জন্ম থেকেই কানে শোনে না। কথাও বলতে পারে না।

তার মা লাভলী আক্তার জানাচ্ছেন, তার মেয়ে পড়তে পারবে এলাকায় এরকম কোন স্কুল ছিলো না।

অন্যদিকে মূলধারার স্কুলগুলোও তাকে ভর্তি নেয়নি।

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে দু:শ্চিন্তায় আছে তার পরিবার।

মিসেস আক্তার বলছেন, একদিকে স্কুলে যেতে না পারা অন্যদিকে পাড়া-প্রতিবেশিদের অপমানসূচক কথায় তার মেয়ে এতোটই কষ্ট পেয়েছে যে, সে এখনো সারাদিন বাড়িতেই সময় কাটায়।

"মনে করেন, মানুষের বাড়িতে সুবিধা অসুবিধায় বাচ্চাদের ডাকে। আমার মেয়েরে কেউ ডাকে না। কোন অনুষ্ঠানে, বিয়ে-শাদি কিংবা কাজে-কর্মে কোনটাতেই না। বলে ও তো বোবা। আইসা কী করবে?"

তবে সব পরিস্থিতি সামলে মেয়েকে বড় করে তুললেও এখন মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে দু:শ্চিন্তায় পড়েছে মণিকার পরিবার।

কারণ মেয়েকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেও পারছেন না তারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাভলী আক্তার বলছিলেন, "মেয়ের চিন্তায় আমি ঘুমাইতে পারি না। ওর বাবাও খালি কান্না করে। আমি মরে গেলে ওরে কে দেখবে? ওর তো কোন ব্যবস্থা হইলো না"।

"বয়স হইছে, মেয়ের বিয়ে দিতে পারি না। এমনও চাইছিলাম আমরা যে, গরীব হোক কিন্তু ভালো একটা ছেলে পাইলে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে আমাদের বাড়িতেই রাইখ্যা দিবো। কিন্তু সেটাও মিলাইতে পারি না।"

ঘটনা ৩: 'বেঁচে থাকাটাই কষ্ট'

সুজন মাঝি। উচ্চতা মাত্র দুই ফুট। যদিও বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে।

সুজন মাঝি বিয়ে করেছেন। ছোট্ট দুই সন্তান, স্ত্রী আর মা'কে নিয়ে তার পাঁচ সদস্যের সংসার।

ছোট্ট শরীর নিয়ে বড় এই পরিবারের বোঝা টানতে হয় সুজন মাঝিকে। আকারে ছোট হওয়ায় সব কাজ করতে পারেন না।

নিজের চেষ্টায় একটা মুদি দোকান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু দোকানের আয় দিয়ে তার সংসার চলছে না চলার মতোই।

সুজন মাঝি বলছেন, সামাজিক অবহেলাকে তিনি মোটেও পাত্তা দেন না।

কিন্তু তার চিন্তার মূল বিষয় খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা।

একবছর আগে তিনি সরকারি প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছেন। কিন্তু সরকার থেকে যে ভাতা পাচ্ছেন তার পরিমাণ খুবই সামান্য।

"সরকার থেকে দেয় তিন মাসে ২১শ টাকা। মাসে ৭শ। আমারতো প্রতিদিনই খরচ আছে তিন/চারশো টাকা। আমার এখন বেঁচে থাকাটাই কষ্ট।"

ছবির কপিরাইট বিবিসি বাংলা
Image caption প্রতিবন্ধীদের সরকারি সহায়তা অপ্রতুল।

কেন এই সামাজিক অবহেলা?

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা 'অ্যাকশন অন ডিজ্যাবিলিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট'।

বাংলাদেশে সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর শফিকুল ইসলাম বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে নানারকম কুসংস্কার চালু আছে।

এগুলোর কারণেই মূলতঃ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষেরা অবহেলার শিকার হন। এমনকি তাদের পরিবারকেও দোষারোপ করা হয়।

এটা হঠাৎ করে পরিবর্তন হবে না। তবে এটাও সত্য পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নত হচ্ছে।

মি. ইসলাম বলছেন, এজন্য সামাজিকভাবে যেমন সচেতনতা বাড়াতে হবে। তেমনি রাষ্ট্রকেও আরো সচেতন হতে হবে।

"প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের অগ্রযাত্রায় যে ধরণের সহায়তা দরকার সেটা তো সব জায়গায় দিতে পারছে না। প্রতিবন্ধীদের বড় রকমের অভিগম্যতার সমস্যা আছে। সব জায়গায় তারা যেতে পারেন না। আমাদের দেশের সিস্টেমে যানবাহন, রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, হাসপাতাল কোনটাই প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়।"

"এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অনকূলে নেই। আইনে আছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী বান্ধব পরিবেশ, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের বড় রকম ঘাটতি আছে।"

সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৭ লাখ। যদিও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের হিসেবে এই সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি।

বিপুল সংখ্যক এসব প্রতিবন্ধীর জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সেবাকেন্দ্র যেমন নেই। তেমনি সরকারি সহায়তাও খুবই সামান্য।

দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতার পরিমান মাত্র ৭শ টাকা।

মি. ইসলাম বলছেন, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষদের জন্য সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাজেট বাড়াতে হবে।

পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার কার্যক্রমও বৃদ্ধি করতে হবে।

আর এ কাজে সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষেরই উদ্যোগ জরুরি।

আরো খবর:

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় মাদক পরীক্ষার চিন্তা কেন?

কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে কি প্লাস্টিক তৈরি হতে পারে

পার্বত্য চুক্তির ২২ বছর: সংঘাত থামছে না কেন

সম্পর্কিত বিষয়