ফজলে হাসান আবেদ: গ্রামবাংলার পালাবদলের স্বপ্নদ্রষ্টার প্রয়াণ

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ছবির কপিরাইট brac
Image caption ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ

ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ শুক্রবার রাতে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

ব্র্যাকের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ব্র্যাকের সমস্ত কর্মীকে এরই মধ্যে ইমেইলে এই খবর জানানো হয়েছে। তার মৃত্যুতে সংস্থার হাজার হাজার কর্মীসহ বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ব্র্যাক হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র বিমোচনে কাজ করে এটি।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ গত বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। তিনি গত অগাস্টে ব্র্যাকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে এরপর তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ার এমেরিটাস হিসেবে ছিলেন।

ব্র্যাকের এক বিবৃতিতে বলা হয়, "এই মুহূর্তে, কোনো সমবেদনা বা সান্ত্বনার ভাষাই তাঁকে হারানোর কষ্ট কমাতে পারবে না। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে শান্ত থাকা ও এগিয়ে যাবার শিক্ষাই তিনি সবসময় আমাদের দিয়েছেন। জীবনভর যে সাহস আর ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি আমরা তাঁর মাঝে দেখেছি, সেই শক্তি নিয়েই আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান জানাব।"

ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রবিবার, ২২শে ডিসেম্বর সকাল সাড়ে দশটা থেকে দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। দুপুর সাড়ে বারোটায় আর্মি স্টেডিয়ামেই তাঁর জানাজার নামাজ সম্পন্ন হবে। জানাজার পর ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

যেভাবে শুরু

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।

সিলেটের শাল্লায় যুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি জনপদের মানুষজনের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিতে কাজ শুরু করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিটি বা ব্র্যাকের।

ছবির কপিরাইট Elisabetta Villa
Image caption ২০১৬ সালে রোমে টাইম ম্যাগাজিনের সহকারী ম্যানেজিং এডিটর রানা ফরুহারের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

তবে ১৯৭৩ সালে যখন পুরোদস্তুর উন্নয়ন সংস্থা হিসাবে ব্র্যাক কার্যক্রম শুরু করে, তখন তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বাংলাদেশ রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট কমিটি।' তবে সংক্ষিপ্ত নাম ব্র্যাকই থাকে।

রীতিমত বর্ণিল কর্মজীবন ছিল স্যার ফজলে হাসান আবেদের। তার প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ক্রমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থায় পরিণত হয়।

ক্ষুদ্র ঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বাল্যবিবাহ রোধসহ সহ নানা খাতে কাজ করেছেন তিনি।

তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী ও শিশুদের জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তারে কাজ শুরু করাকে স্যার ফজলে হাসান আবেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী।

"সিলেটের শাল্লায় দেখেছি কিভাবে তিনি একটি দোচালা ঘরে হারিকেনের আলোতে একনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। দেখেছি যারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না - যাদের মধ্যে মেয়ে-শিশু বেশি - তাদের গাছতলায় বসে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন।

পরবর্তীতে সরকার এ ব্যাপারে সহায়ক নীতিমালা গ্রহণ করেছে, এক পর্যায়ে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে স্বীকৃতিও দিয়েছে এবং এ নিয়ে আইন প্রণয়ন করেছে।"

ছবির কপিরাইট BRAC
Image caption স্যার ফজলে হাসান আবেদ: ১৯৩৬-২০১৯

১৯৩৬ সালে বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেল অয়েলে কয়েক বছর কাজ করেন।

এরপর ১৯৭২ সালে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে তিনি শুরু করেন ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কর্মসূচী। পরবর্তীতে ত্রাণ দিয়ে সহায়তার বদলে দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করে তোলার নতুন কাজে হাত দেন তিনি, যা পরে পরিণত হয়েছে আজকের ব্র্যাকে।

গ্রামীণ সমাজের রূপান্তর

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেকজন সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই সংস্থাটি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

"সমস্যা সমাধানে তাঁর কাজ করার পদ্ধতি ছিল একেবারেই আলাদা। প্রথম দিকে ছিল পুনর্বাসনের কাজ, পরে তিনি শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর জন্য কাজ করলেন।"

"এরপর নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কাজের সুযোগ সৃষ্টির পর ব্র্যাক যখন দাঁড়িয়ে গেছে, তখন তিনি ভবিষ্যতের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দক্ষতা তৈরির কাজ শুরু করলেন।

ছবির কপিরাইট Paula Bronstein
Image caption আফগানিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশে বিস্তৃত ব্র্যাকের কার্যক্রম।

"এভাবে এক এক করে কাজের পরিধি বেড়েছে, এবং ক্রমে কাজের গণ্ডি বাড়ার সাথে সাথে সমাজে তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।"

বড় উদ্যোগের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য আশির দশকের শেষের দিকে ব্র্যাক আড়ং প্রতিষ্ঠা করে।

এর মাধ্যমে দেশজ নকশা ও কাপড়, দেশীয় রুপা-তামা-কাঠ-পুঁতির গয়না নতুন করে প্রচলন হয়।

নাগরিক সমাজে দেশীয় সিল্ক এবং রুপার গয়না নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলার কাজটি করেন স্যার ফজলে হাসান।

এরপর একে একে ব্র্যাক ব্যাংক, ব্র্যাক ডেইরী এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তিনি ব্র্যাককে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাবার কথা প্রথম ভাবেন ২০০০ সালের পরে - বলছিলেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ।

"২০০০ সালে দিকে তিনি একবার ক্যালিফোর্নিয়া গিয়েছিলেন, অ্যাপলের স্টিভ জবসের সঙ্গে ডিনারের সময় জবস তাকে বলেছিলেন, তোমার মডেলটা এত ভালো, তুমি বাংলাদেশের বাইরে কেন কাজ করছো না? তখন উনি প্রথম ভাবলেন যে দেশের বাইরে কাজ করা দরকার।"

ছবির কপিরাইট Allison Joyce
Image caption বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখে ব্র্যাক

"আর ২০০২ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থার তৎকালীন প্রধান আফগানিস্তানে ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে তাদের কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য পৃথিবীর সব দেশের প্রতিনিধিদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তখন ঘর ভর্তি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের কেউ সাড়া দেননি।

"শুধু স্যার ফজলে হাসান আবেদ হাত তুলে বলেছিলেন, আমি যেতে পারি।"

এই মূহুর্তে ব্র্যাকের কর্মী সংখ্যা বাংলাদেশেই এক লক্ষের ওপরে, এবং বিশ্বের ১১টি দেশে এই মূহুর্তে কাজ করছে এই সংস্থাটি।

দারিদ্র বিমোচনে ব্র্যাকের মডেল বিশ্বের অনেক দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।

ছবির কপিরাইট STRDEL
Image caption ২০১২ সালে ঢাকায় নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুস এবং তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটনের সঙ্গে।

কিন্তু ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন একজন 'ফ্যামিলি ম্যান' - ব্যাখ্যা করছেন মিঃ সালেহ, যিনি সম্পর্কে স্যার ফজলে হাসান আবেদের জামাতা।

"তিনি ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সেটা কেবল নিজের একক পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, পরিবারের দূরবর্তী সদস্যরাও একই মনোযোগ পেত। অত্যন্ত ধৈর্যশীল শ্রোতা ছিলেন।"

"শিল্প-সাহিত্যের চর্চা তার প্রিয় কাজের একটি ছিল। আর রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন খুব।"

কর্মজীবনে দারিদ্র্য বিমোচন, বিশেষত নারী ও শিশুদের জীবন-মান উন্নয়নে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের জন্য জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু পুরষ্কার পেয়েছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।

পেয়েছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পদক থেকে শুরু করে, যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডসের সম্মানসূচক 'নাইটহুড' উপাধিসহ বহু পুরষ্কার।

সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী পেয়েছেন অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

সম্পর্কিত বিষয়