আওয়ামী লীগ জাতীয় সম্মেলন: নেতৃত্ব নির্বাচনে কাউন্সিলররা মতামত দেয়ার সুযোগ পাবেন?

আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনের মঞ্চ ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনের মঞ্চ

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে আজ দলটির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কাউন্সিলর এবারের সম্মেলনে যোগ দেবেন। কিন্তু দলের নীতি বা নেতৃত্ব নির্বাচন কিংবা দলের যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে মতামত দেয়ার কোনো সুযোগ কি কাউন্সিলররা পাবে ?

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দেয়া ভাষণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন "এই সম্মেলন সফল হোক। আপনারা আপনাদের নেতা নির্বাচন করবেন। সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এ সংগঠনকে শক্তিশালী করা ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি"

কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহানগরের নেতা নির্বাচনে কাউন্সিলরদের তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি।

বরং নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা বরাবরের মতো নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব শেখ হাসিনার হাতেই তুলে দিলে তিনিই চূড়ান্ত নেতৃত্ব নির্ধারণ করেছেন। এর আগে দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলনে এবং তারও আগে আওয়ামী লীগেরই গত কয়েকটি সম্মেলনেও দেখা গেছে একই চিত্র।

ঢাকায় সভানেত্রীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে কয়েকজন নেতাকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মতামত দেয়ার সুযোগ কতটা আছে?

জবাবে একজন বলেন অবশ্যই আছে। কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী নেতা নির্বাচন হয়ে থাকে।

খলিলুর রহমানে নামে আরেকজন বলেন কাউন্সিলরদের মতামতই আগে নেয়া হয়। তারাই হাত তুলে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।

পংকজ দাস নামে একজন বলেন নেতা নির্বাচনে সবসময়েই কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতেই করা হয়।

হেমায়েত উদ্দিন বলেন প্রথমে তো কাউন্সিলরদের মতামত নেয়া হয়। তাদের হাতেই ক্ষমতা থাকে। তারাই সে ক্ষমতা হয়তো সভানেত্রীর কাছে অর্পণ করেন। তারপরই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

বিশ্লেষণ: যে কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে

যেভাবে জন্ম হয়েছিল আওয়ামী লীগের

দীর্ঘ ক্ষমতা কি আওয়ামী লীগকে বদলে দিচ্ছে?

শেখ হাসিনা যেভাবে আওয়ামী লীগের নেতা হলেন

ফিরে দেখা : ৬৮ বছরে আওয়ামী লীগের উত্থানপতন

ছবির কপিরাইট Getty Images
Image caption নেতৃত্ব নির্ধারণে ক্ষমতা থাকছে শেখ হাসিনার হাতেই

অর্থাৎ এটি পরিষ্কার যে দলের নেতাকর্মীরাও অনেকটা মেনেই নিয়েছেন যে সম্মেলনে দলীয় প্রধানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন বিশেষ করে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে| একই চিত্র ঢাকার বাইরের কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রেও। দক্ষিণাঞ্চলীয় বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুন নাহার মেরীও যোগ দেবেন এবারের কাউন্সিলে।

তিনি বলছেন তারাও জানেন যে একদিনের সম্মেলনে সবার কথা বলার সুযোগ দেয়া অসম্ভব।

"নেত্রীর কথা মতোই কাউন্সিল হবে। এতো বড়ো কাউন্সিল সেখানে তো সব মূল্যায়ন করা যাবেনা। ত্রি বার্ষিক কাউন্সিল-সেখানে সবাইকে তো কথা বলার সুযোগ দেয়া যাবেনা। নেত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত"।

আওয়ামী লীগের ৭৮ টি সাংগঠনিক জেলা থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কাউন্সিলর যোগ দিয়েছেন এবারের সম্মেলনে।

সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। জেলা ও উপজেলাগুলোতে প্রতিদিনই সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন করে কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার জন্য দলের তরুণ নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

দলটির গত সম্মেলনেও কয়েকজন নতুন নেতাকে জায়গা দেয়া হয়েছিলো। এবারেও নতুন করে কেউ আসেন কি-না কিংবা দলীয় প্রধানের পরিবার থেকে আর কেউ কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসবেন কি-না এসব নিয়ে আগ্রহ আছে দলীয় পরিমণ্ডলে। তবে এবারের কাউন্সিলের মাধ্যমে যে কমিটি গঠিত হবে তার নেতৃত্বেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিবে পরপর তিন দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। তাই দলটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার পদে থাকছেন কিনা কিংবা নতুন কেউ এলে তিনি কে হতে পারেন এসব নিয়েও সরগরম আলোচনা হচেছ কর্মীদের মধ্যে।

কিন্তু এর কোনো কিছুতেই কর্মী সমর্থক বা কাউন্সিলরদের কোনো ভূমিকা থাকবে কি-না বা তাদের মতামত দেয়ার সুযোগ মিলবে কি-না তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা চোখে পড়েনি সভানেত্রীর কার্যালয়ের বাইরে থাকা কর্মী সমর্থকদের মধ্যে।

রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেত্রী ও কাউন্সিলর মরজিনা পারভীন বলছেন তারা আশা করছেন কাউন্সিল থেকে ভবিষ্যৎ যোগ্য নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে সেটা ভোটই হোক আর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই হোক।

তিনি বলেন, "যদি একাধিক প্রার্থী থাকে তখন ভোটের মাধ্যমে হয়।আর যদি সবাই সমর্থন দেয় তাহলে হাত তোলার মাধ্যমেও হতে পারে। কিন্তু কেউ ছাড় না দিলে ভোটের মাধ্যমে। তবে যাই হবে কাউন্সিলরদের সমর্থন নিয়েই। তারা যা চাইবে তাই হবে"।

অর্থাৎ কাউন্সিল বলতে আসলে এখন শুধু নতুন কমিটি ঘোষণাই মূল বিষয়। তাও সেখানে প্রতিযোগিতা না থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় প্রধান। কিন্তু দলীয় প্রধানে অনানুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া কারও পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রার্থিতা ঘোষণা সম্ভব কি-না এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজী হননি দলটির একজন নেতাকর্মীও।

এমনকি কাউন্সিলের নেতা নির্বাচনের বাইরেও দলের নীতি আদর্শ কিংবা দলের যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে সেক্ষেত্রে ভুল ত্রুটি বা নীতিগত কোনো বিষয়ে কাউন্সিলরদের আলোচনার সুযোগ সাম্প্রতিক কালের দলের কাউন্সিলে দেখা যায়নি। অথচ সম্মেলনের মাধ্যমেই দলীয় নীতি পরিবর্তনের উদাহরণ আছে আওয়ামী লীগেরই। ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' পরিবর্তন করে রাখা হয় 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ' করা হয়।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ফজলে হাসান আবেদ: গ্রামবাংলার পালাবদলের স্বপ্নদ্রষ্টা

২০১৯ সালের ভালো সংবাদ ছিল কোনগুলো

ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ ৩১শে জানুয়ারি

রাষ্ট্রপতিকে টেলিনরের উকিল নোটিশ: এর অর্থ কী?

Image caption কাজী জাফর উল্লাহ

আবার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দলে ভাঙন দেখা দেয় যার জের ধরে মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তবে স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানই হয়ে উঠেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল নিয়ামক।

৭৫ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে বাকশাল করা হলেও তা নিয়ে দলের কাঠামোতে কোনো আলোচনা বা মতামত গ্রহণ করা হয়নি। আবার এখন দল ও সরকার পরিচালনায় দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে দলটির নেতাকর্মী বা কাউন্সিলরদেরও কাছ তার কোনো বিকল্প নেই এটি পরিষ্কার।

সে কারণেই সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড নিয়ে এসব বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ কতটা কাউন্সিলরদের থাকবে তাও বিবেচনার বিষয় বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামীম রেজা।

"আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়াম লীগের আজ যে রূপান্তর সেটা কিন্তু অনেক তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে হয়েছে। দলটি তার অর্থনৈতিক দর্শনেও পরিবর্তন এনেছে। কিছু মৌলিক দর্শনে পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সেটা এখন আর আগের মতো দেখা যায়না। কাউন্সিলররা তো নয়ই আরও উপরের নেতারাও খুব যে আগ্রহী তা বলা যায়না। প্রশ্ন হতে পারে যে তারা সুযোগ পাচ্ছেননা নাকি তারা বলতে চাননা"।

তবে এটিও সত্যি যে মাঝে মধ্যে দু একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও দেখা যায়। কেন্দ্র বা অধিকাংশ জেলা ইউনিটে কথিত সমঝোতার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সভাপতি বা নেতারা নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দিলেও এবারে চট্টগ্রামে কাউন্সিলরদের ভোটের মাধ্যমেও নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে। তবে কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের ভূমিকা রাখার সুযোগ কিংবা তাদের মতামতের প্রতিফলন না হওয়ার যে অভিযোগ সেটি আমলে নিতে রাজী নন দলটির নেতারা।

দলের সভাপতিমন্ডলীর একজন সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বিবিসিকে বলছেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনেই তার দল নেতৃত্ব নির্বাচন করে।

"এটা কিন্তু আমাদের গণতন্ত্রেরই অংশ। আমরা এক সাথে বসি। আলোচনা করে সভানেত্রীকে দায়িত্ব দেই। সারাদেশ সাড়ে ছয় হাজার কাউন্সিলর উপস্থিত থাকেন। তাদের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন ও মতামত তুলে ধরেন আমাদের কাছে"।

ছবির কপিরাইট BBC BANGLA
Image caption ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামীম রেজা

কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল ত্রুটি বা নীতি নিয়ে দলের প্রতিনিধিদের কথা বলার সুযোগ হয় কাউন্সিলে ?

জবাবে কাজী জাফর উল্লাহ বলেন , "অনেক সুযোগ থাকে। তৃণমূল কাউন্সিলরদের ওখানেই সুযোগ হয় নেত্রীর সামনে নির্ভয়ে মতামত দেয়ার। সভানেত্রী বেশি গুরুত্ব দেন ইউনিয়ন ও উপজেলা নেতাদেরই"।

তবে কাউন্সিলরদের কথা বলা বা মতামত দেয়ার যত সুযোগের কথাই দলটির নেতারা বলুননা কেন এবারের কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় সভানেত্রীই যে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন তা ইতোমধ্যেই এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

"তিনি আমাদের সভাপতি। তিনি দলের তৃণমূল পর্যন্ত সবাইকে চিনেন। কাকে কোন পদে রাখতে হবে তিনি জানেন। সাধারণ সম্পাদক পদেও তিনি যা ইচ্ছা করবেন তাই হবে। তিনি পরিবর্তন চাইলে পরিবর্তন হবে"।

মিস্টার কাদেরের এ বক্তব্যে এটিই পরিষ্কার যে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তত কাউন্সিলরদের ভূমিকা রাখার সুযোগ হবে না এবারের কাউন্সিলে। এখন দেখার বিষয় হবে সরকারের কর্মকাণ্ড বা নীতিগত কোনো বিষয় নিয়ে কাউন্সিলের মতামত রাখতে কাউন্সিলরা উদ্যোগী হন কিনা এবং হলে সেটিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিভাবে গ্রহণ করে।