বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে টেলিনরের উকিল নোটিশ: এর অর্থ কী?

  • আকবর হোসেন
  • বিবিসি বাংলা, ঢাকা
টেলিনর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টেলিনর গ্রুপের ব্যবসা আছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম অপারেটর গ্রামীণ ফোনের মূল কোম্পানি টেলিনর সালিশ চেয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বরাবর উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে বলে তথ্য দিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি একথা জানান।

বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ ফোনের কাছে বিভিন্ন কর বাবদ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা দাবির প্রেক্ষাপটে টেলিনর এই সালিশ চেয়েছে।

রাষ্ট্রপতিকে নোটিশ কি অস্বাভাবিক?

টেলিনর নরওয়ের টেলিকম কোম্পানি। এ কোম্পানির বড় অংশের মালিক নরওয়ের সরকার। গ্রামীণ ফোনের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক টেলিনর।

বাংলাদেশের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ চুক্তি থাকলেও নরওয়ের সাথে এ সংক্রান্ত কোন চুক্তি নেই।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ তানজিবুল আলম বলেন, সাধারণত এ ধরণের চুক্তির আওতায় সংশ্লিষ্ট দুটি দেশ পরস্পরকে নিশ্চয়তা দেয়, তাদের দেশের সরকার বা কোন কোম্পানি যদি চুক্তি সম্পাদনকারী দেশে বিনিয়োগ করে, তাহলে তাদের সাথে কোন বৈষম্য করা হবে না।

অর্থাৎ দেশীয় কোম্পানিকে যে দৃষ্টিতে দেখা হয়, চুক্তি সম্পাদনকারী দেশের কোম্পানিকেও একই দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হবে।

এ ধরণের চুক্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, চুক্তি সম্পাদনকারী দুটি দেশ এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না যার ফলে মনে করা হয় যে অপর দেশের বিনিয়োগকারীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

টেলিনর নরওয়ের কোম্পানি হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে তারা মালিকানা বজায় রাখে। সে ধরণের একটি কোম্পানি হচ্ছে সিঙ্গাপুরে টেলিনর এশিয়া।

সিঙ্গাপুরের কোম্পানি টেলিনর এশিয়া বাংলাদেশে গ্রামীণ ফোনের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিবুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সিঙ্গাপুরের সাথে বাংলাদেশের একটি বিনিয়োগ চুক্তি আছে।

"টেলিনরের বক্তব্য হচ্ছে, সরকার যে টাকা দাবি করেছে সে ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্যের সুযোগ না দিয়ে, কিংবা অন্য কোন উপায়ে মীমাংসার সুযোগ না দিয়ে আদায়ের যে পদ্ধতি নেয়া হয়েছে, সেটি তাদের ইনভেস্টমেন্ট বাজেয়াপ্তের শামিল," বলছিলেন তানজিবুল আলম।

টেলিনর মনে করছে, সরকার যে টাকা দাবি করেছে সে সম্পর্কে তাদের যে দ্বিমত আছে, সেটি প্রকাশ করার সুযোগ দিতে হবে, ফোরাম দিতে হবে।

মি: আলম বলেন, "কারো সম্পত্তি যখন বাজেয়াপ্ত করা হয়, তখন তাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়না। যেমন ধরুন - সরকার যদি বলে আপনার প্রপার্টি আমি একোয়ার করবো। তাহলে আপনি বলতে পারবেন না যে আমার প্রোপার্টি একোয়ার করা যাবে না। আপনি শুধু ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।"

যেহেতু সিঙ্গাপুরের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগ চুক্তি আছে এবং টেলিনর এশিয়া সিঙ্গাপুরে রেজিস্ট্রিকৃত কোম্পানি সেজন্য এই টাকার নিষ্পত্তি বাংলাদেশের ফোরামে হবে না।

এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশ্বব্যাংক স্বীকৃত একটি ফোরাম রয়েছে যারা নাম - ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস বা সংক্ষেপে বলা হয় ইকসিড।

যখন কোন বিদেশী বিনিয়োগকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের মতভেদ হয় তখন এই ফোরামে সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়। ইকসিড ফোরামের সদরদপ্তর ওয়াশিংটনে।

বাংলাদেশ এবং সিঙ্গাপুর উভয় দেশ এই ফোরামের সদস্য।

তানজিবুল আলম বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ যদি কারো সাথে চুক্তি করে তাহলে সেটি করতে হয় রাষ্ট্রপতির নামে।

"স্টেট লেভেলে যখন কোন লিগ্যাল অ্যাকশন শুরু হবে তখন সেটা প্রেসিডেন্টকেই প্রতিপক্ষ করা হয়," বলছিলেন মি: আলম।

এই লিগ্যাল নোটিশে একটি সময় নির্ধারণ করে দেয়া আছে। সে সময়ের মধ্যে যদি টেলিনর এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে তারা বিষয়টিকে ইকসিড ফোরামে নিয়ে যাবে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

মোবাইল ফোন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে।

সরকার কি এটা মানতে বাধ্য?

আইনজীবী তানজিবুল আলম বলছেন, সরকার ইচ্ছে করলে এই ইকসিড ফোরামে অংশ নাও দিতে পারে। যেহেতু একটি দেশের সরকার সার্বভৌম, সেজন্য অন্য কোন ফোরাম সরকারকে কোন কিছু করতে বাধ্য করতে পারেনা।

বাংলাদেশ সরকার যদি ইকসিড ফোরামে অংশ না নেয় তাহলে ইকসিড তাদের নিয়ম অনুসরণ করে অভিযোগটি নিষ্পত্তি করতে পারবে। আর যদি সরকার অংশ নেয় তাহলে ইকসিড উভয়পক্ষকে শুনে একটি সিদ্ধান্ত দেবে।

মি. আলম বলেন, "ইকসিডের সিদ্ধান্ত যদি সরকারের বিপক্ষে যায়, তাহলেও সরকার সেটি মানতে বাধ্য নয়। কিন্তু আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে ইকসিডের সিদ্ধান্ত কোন সরকার মানতে অস্বীকার করে না।"

এর কারণ হচ্ছে,যেসব দেশ ইকসিড কনভেনশনে সাক্ষর করে সংস্থাটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারা যদি সে ফোরামের সিদ্ধান্ত না মানে তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে সে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

বাংলাদেশের অতীত কী বলে?

ইকসিড ফোরামে জয়-পরাজয়ের রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের।

১৯৯০'র দশকের মাঝামাঝি ইটালির কোম্পানি সাইপেম-এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক বিরোধ হয়েছিল। সাইপেম কোম্পানি তখন বাংলাদেশে গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ করেছে।

সাইপেম প্রায় সাড়ে ১২ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল।

কিন্তু সাইপেম-এর দাবি করা অর্থ বাংলাদেশ সরকার দিতে অস্বীকৃত জানালে ইটালিয়ান সে কোম্পানি বিষয়টিকে ইকসিড ফোরামে নিয়ে যায়।

২০০৪ সালে সাইপেম কোম্পানি ইকসিড-এর দ্বারস্থ হয় এবং ২০০৯ সালে ইকসিড ফোরাম এ রায় ঘোষণা করে।

ইকসিড ফোরাম সাড়ে ছয় মিলিয়ন ডলার পাওনার পক্ষে রায় দিয়েছে।

ফলে সাইপেম কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার।

অন্যদিকে আমেরিকান তেল কোম্পানি শেভরনের সাথে ইকসিড ফোরামে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশ সরকার।

শেভরন বাংলাদেশ সরকারের কাছে ২৪০ মিলিয়ন ডলার দাবি করে ২০০৬ সালে ইকসিড ফোরামের দ্বারস্থ হয়েছিল।

২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এর শুনানি হয় নেদারল্যান্ডস-এর দ্য হেগ, ওয়াশিংটন এবং লন্ডনে। ২০১০ সালে শেভরনের দাবি বাতিল করে দেয় ইকসিড ফোরাম।

ইকসিডে যাচ্ছে টেলিনর এবং বাংলাদেশের আদালতে মামলা করেছিল গ্রামীন ফোন।

দুটো আলাদা বিষয় বলে বলে উল্লেখ করে তানজিবুল আলম বলেন, বাংলাদেশের আদালতে গ্রামীন ফোন মামলা করলেও ইকসিড ফোরামে যেতে টেলিনরের কোন সমস্যা নেই।